আস-সুন্নাহর ‘মেধাবী’ প্রকল্প, জবি শিক্ষার্থীদের আবাসনে স্বস্তি ফিরল কিছুটা

০৪ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৬ PM
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন লোগো

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন লোগো © টিডিসি ফটো

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীদের অন্যতম সমস্যা আবাসন সংকট। রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত দেশের অন্যতম প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কয়েক হাজার হলেও দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত আবাসিক সুবিধার অভাব তাদের নিত্যসঙ্গী। অনেক শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়ে পুরান ঢাকার অস্বাস্থ্যকর ও ব্যয়বহুল মেসে থাকতে হয়, আবার অনেকেই প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে যাতায়াত করে ক্লাসে অংশ নেন। 

এ বাস্তবতায় ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মাধ্যমে শুরু হয় ‘মেধাবী’ প্রকল্প। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে প্রকল্পটি। বর্তমানে প্রায় ৬৪৫ থেকে ৬৭০ জন শিক্ষার্থী এই সুবিধার আওতায় রয়েছেন।আবাসনের পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন, নৈতিক শিক্ষা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ক্যারিয়ার প্রস্তুতির ব্যবস্থা রয়েছে।

আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ‘মেধাবী’ প্রকল্পে আবাসনের সুযোগ পেতে শিক্ষার্থীদের আবেদন, বাছাই এবং সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। ফলে এখানে এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে উঠেছে। ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রায় ৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ বহন করছে ফাউন্ডেশন নিজেই। শিক্ষার্থীরা সামর্থ্য অনুযায়ী বাকি অংশ প্রদান করে।

প্রকল্পটির সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো দক্ষতা উন্নয়নকেন্দ্রিক কার্যক্রম। সাধারণ আবাসনের বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত করতে এখানে নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা, IELTS প্রস্তুতি, ICT প্রশিক্ষণ, Artificial Intelligence (AI) বিষয়ক কোর্স, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেশন, বিসিএস প্রস্তুতি কার্যক্রম, সেলফ লিডারশিপ প্রোগ্রাম, মাইন্ড ট্রেনিং সেশন, পাবলিক স্পিকিং ও প্রেজেন্টেশন স্কিল উন্নয়ন কর্মশালা। সম্প্রতি ‘Medhabi BCS Preparation Program’-এ ৪১০ জন আবেদনকারীর মধ্য থেকে প্রাথমিক বাছাইয়ের ভিত্তিতে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ভাইভা নেওয়া হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে করপোরেট ব্যক্তিত্ব, গবেষক, শিক্ষাবিদ, আন্তর্জাতিক বক্তা ও পেশাজীবীদের অংশগ্রহণে সেমিনার আয়োজন করা হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নেতৃত্ব বিকাশ, ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রের চাহিদা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, যোগাযোগ দক্ষতা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশের মতো বিষয়ে বিশেষ সেশন পরিচালনা করা হয়।

মেধাবী প্রকল্পের অবকাঠামোগত সুবিধাও শিক্ষার্থীদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। এখানে রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রায় ২০০ কম্পিউটারসমৃদ্ধ আধুনিক ল্যাব, যেখানে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন ও ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন। ডিজিটাল ক্লাসরুম, প্রশস্ত লাইব্রেরি, অধ্যয়ন কক্ষ, অডিটোরিয়াম, সেমিনার স্পেস এবং দলগত শিক্ষার জন্য পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে। লাইব্রেরিতে একসঙ্গে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী এবং ক্লাসরুমে ৩৫০ শিক্ষার্থী পাঠ গ্রহণ করতে পারেন। পুরো ভবনজুড়ে রয়েছে আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা; ১২৮টি সিসিটিভি ক্যামেরা, মেটাল ডিটেক্টর এবং ২৪ ঘণ্টা নিরাপত্তাকর্মী দায়িত্ব পালন করেন। 

শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে রয়েছে দুটি লিফট, জেনারেটর ব্যাকআপ, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, ঠান্ডা ও গরম পানির সুবিধা, স্টেশনারি সেবা এবং সুপরিকল্পিত আবাসিক পরিবেশ।

স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের বিষয়টিও প্রকল্পে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীর জন্য কেন্দ্রীয় কিচেনে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার প্রস্তুত করা হয়। আধুনিক রান্নাঘর, খাবার সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং নির্ধারিত খাদ্য ব্যবস্থাপনার কারণে শিক্ষার্থীদের বাজার করা, রান্না করা কিংবা মেস ব্যবস্থাপনার ঝামেলায় পড়তে হয় না। ফলে তারা অধিক সময় পড়াশোনা ও আত্মউন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করতে পারেন। নিরাপদ পানির জন্য স্থাপন করা হয়েছে বড় ধারণ ক্ষমতার ট্যাংক এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা হয় নিয়মিতভাবে।

শুধু একাডেমিক বা ক্যারিয়ার উন্নয়ন নয়, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশেও গুরুত্ব দেওয়া হয় এখানে। নিয়মিত কোরআন শিক্ষা, দাওয়াহ ক্লাস, ইসলামি আলোচনা, জুমার বিশেষ সেশন এবং দ্বীনি শিক্ষার আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ ও আত্মশুদ্ধির চর্চা বাড়াচ্ছে। সকালে কোরআন শিক্ষা, সাপ্তাহিক শিক্ষামূলক আলোচনা এবং বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক সেশন শিক্ষার্থীদের জন্য একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেছে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন, আধুনিক শিক্ষা ও নৈতিকতার সমন্বিত পরিবেশ তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

চিকিৎসা সুবিধার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ উদ্যোগ। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন ও আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশনের সমঝোতার ফলে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে বিশেষ ছাড়ে চিকিৎসা সুবিধা পান। পাশাপাশি হলে প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থাও চালু রয়েছে।

যাতায়াত সুবিধাও ‘মেধাবী’ প্রকল্পের অন্যতম শক্তি। প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত বাসে শিক্ষার্থীদরা হল থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিয়ে যায় এবং ক্লাস শেষে আবার ফিরিয়ে আনে। ফলে শিক্ষার্থীদের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমেছে। বিশেষ করে পুরান ঢাকার যানজটপূর্ণ বাস্তবতায় এই পরিবহন সুবিধা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকটের বাস্তবতায় ‘মেধাবী’ প্রকল্প শুধু একটি আবাসন উদ্যোগ নয়; বরং শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের একটি সমন্বিত মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, নিরাপদ আবাসন, স্বাস্থ্যকর খাবার, চিকিৎসা সুবিধা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নৈতিক শিক্ষা এবং ক্যারিয়ার প্রস্তুতির সমন্বয়ে এখানকার শিক্ষার্থীরা অন্যদের তুলনায় অতিরিক্ত কিছু সুযোগ পাচ্ছেন। 

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আবাসিক হলগুলোর নির্মাণকাজ এখনো চলমান থাকলেও এরই মধ্যে ‘মেধাবী’ প্রকল্প অনেক শিক্ষার্থীর কাছে আবাসনের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে কারণেই অনেকের মতে, আবাসন সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য এটি শুধু একটি থাকার জায়গা নয়, বরং স্বপ্নবুনন, দক্ষতা অর্জন এবং আত্মগঠনের এক অনন্য ঠিকানা।

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. শফিক ইসলাম বলেন, এখানে এসে অগোছালো জীবনটা শৃঙ্খলায় এসেছে। আগে পড়াশোনার পাশাপাশি দৈনন্দিন নানা বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে হতো। এখন নিয়মতান্ত্রিক পরিবেশে থেকে নিজের উন্নয়ন ও পড়াশোনায় বেশি মনোযোগ দিতে পারছি। বিভিন্ন স্কিল ডেভেলপমেন্ট কোর্সে অংশ নেওয়ার সুযোগ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখবে বলে আমি মনে করি।

ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিব হাসান বলেন, মেধাবী প্রকল্পে সুযোগ পাওয়া আমার জীবনের অন্যতম বড় সৌভাগ্য। এখানে আমরা শুধু থাকার জায়গা পাই না; বরং আধুনিক শিক্ষা, নৈতিকতা ও দ্বীনি পরিবেশের সমন্বয় দেখতে পাই। খাবারের মান, শিক্ষকদের আন্তরিকতা এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আমাদের প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে। আমি চাই, এ ধরনের উদ্যোগ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও ছড়িয়ে পড়ুক।

ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী ওমর ঢালী মনে করেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের আবাসন সংকটের মধ্যে আস-সুন্নাহ হল শিক্ষার্থীদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। এখানে ইংরেজি, কম্পিউটার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং কোরআন শিক্ষার মতো কোর্সগুলো আমাদের দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে আমরা একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতাও অর্জন করতে পারছি।

আইন বিভাগের শিক্ষার্থী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশে থাকার সুযোগ পাওয়া সত্যিই প্রশান্তিদায়ক। এখানে দ্বীনের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি কম্পিউটার ও IELTS কোর্সে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সহপাঠীদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার সংস্কৃতি আমাকে মানসিকভাবে অনেক স্বস্তি দেয়।

একই বিভাগের শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম বলেন, আস-সুন্নাহ হলে এসে মনে হয়েছে আমি যেন একটি পরিবারের অংশ হয়ে গেছি। এখানকার শৃঙ্খলা, ভ্রাতৃত্ববোধ, ইসলামী পরিবেশ এবং পড়াশোনার অনুকূল আবহ সত্যিই প্রশংসনীয়। আমি বিশ্বাস করি, এখান থেকে অর্জিত শিক্ষা, নৈতিকতা ও দক্ষতা ভবিষ্যতে সমাজে ইতিবাচক অবদান রাখতে সাহায্য করবে।

শিক্ষার্থীদের এসব অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট হয়, মেধাবী’ প্রকল্প শুধু আবাসনের ব্যবস্থা নয়; বরং এটি এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলেছে যেখানে একজন শিক্ষার্থী একসঙ্গে একাডেমিক শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, নৈতিক চর্চা এবং ব্যক্তিত্ব বিকাশের সুযোগ পাচ্ছেন। সে কারণেই অনেকের কাছে এটি শুধুমাত্র একটি হল নয়, বরং স্বপ্ন, শৃঙ্খলা ও আত্মগঠনের এক অনন্য ঠিকানা।

বেওয়ারিশ কুকুর-বিড়ালের আতঙ্কে যশোরবাসী
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
আবারও কমেছে সোনা-রুপার দাম
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
১১ জেলায় ৮০ কিমি বেগে ঝড়ের আভাস
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
নেইমারের পর অবসরের ইঙ্গিত দিলেন আরও এক তারকা ফুটবলার
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
শুধু ‘প্রশিক্ষণ তত্ত্ব’ প্রয়োগ করে শিক্ষার মানোন্নয়ন হবে কি?
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
এআই চিপের চাহিদায় উড়ছে স্যামসাং, দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১৮ গুণ …
  • ০৬ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence