কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় © সংগৃহীত
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদিত বাজেটে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা উন্নয়নে আলাদা তহবিল রাখা হলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) কোনো স্বতন্ত্র গবেষণা বরাদ্দ পায়নি। সোমবার (২৯ জুন) সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের কনফারেন্স রুমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ফোরাম সিন্ডিকেটের ১১০তম সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সোলায়মান ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন।
বাজেট উপস্থাপনের পর সিন্ডিকেট সদস্যরা বিভিন্ন খাত নিয়ে মতামত দেন। পরে ৮৩ কোটি ২৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকার বাজেট সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করা হয়। একই সভায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সরকারি বরাদ্দের ভিত্তিতে ৮৬ কোটি ৪২ লাখ ৭৮ হাজার টাকার সংশোধিত বাজেটও অনুমোদন করা হয়।
অনুমোদিত বাজেটে গবেষণা খাতে কোনো স্বতন্ত্র বরাদ্দ রাখা হয়নি। বাজেটের ৬০ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেতন-ভাতা ও পেনশন, ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশ পণ্য ও সেবা বাবদ সহায়তা, শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ অন্যান্য অনুদান এবং ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ মূলধন অনুদান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের বাজেট সংক্রান্ত নথিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য গবেষণা খাতে কোনো নির্দিষ্ট বরাদ্দের তথ্য নেই। ফলে গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা, জার্নাল প্রকাশ, মাঠ গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অর্থায়ন সংকট বহাল থাকছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোলায়মান বলেন, গত কয়েকবছর ধরে গবেষণা খাতে বরাদ্দ দেওয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্দীপনা বেড়েছে। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও যদি বরাদ্দ দেওয়া হয় তাহলে গবেষণাপত্র প্রকাশে তাদের আগ্রহ চলমান থাকবে, নয়তো স্থবিরতা নেমে আসবে। আমরা ইউজিসির কাছে গবেষণা খাতে বরাদ্দ দেওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছি।
সম্প্রতি ইউজিসি ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কমিশনের জন্য ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে গবেষণা ও বিদেশি বৃত্তির জন্য ২৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার ২২৬ কোটি টাকা গবেষণা খাতে ব্যয় করা হবে। তবে এ অর্থ কেন্দ্রীয়ভাবে ইউজিসির অধীনে থাকবে এবং কোন বিশ্ববিদ্যালয় কত অর্থ পাবে, সে বিষয়ে পৃথক কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কুবির ৭৬ কোটি ১০ লাখ টাকার বাজেটে গবেষণায় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের ৩.৮৫ শতাংশ। আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫ এই খাতে বরাদ্দ ছিল ২ কোটি ৬১ লাখ টাকা। তবে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে কেন বরাদ্দ দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ের ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব দপ্তর।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব দপ্তরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. নাসির উদ্দিন বলেন, গবেষণা খাতে বিশ্ববিদ্যালয়কে আলাদা করে সরাসরি বরাদ্দ দেওয়া হয়নি; এটি কেন্দ্রীয়ভাবে ইউজিসির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, গবেষণা খাতে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বাজেট পায়নি, এটা বলা যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে সমন্বয় করে সরকার এই বাজেট দিয়েছে। ইউজিসি গবেষণা নীতিমালা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা নীতিমালাকে সমন্বয় করে এই অর্থ প্রদান করা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার নূরুল করীম চৌধুরী বলেন, ইউজিসির বাজেট কাঠামো অনুযায়ী এখন অনেক খাত কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বরাদ্দ আগের মতো সরাসরি আলাদা করে উল্লেখ না থাকলেও প্রকল্পভিত্তিকভাবে এবং নীতিমালার আলোকে অর্থ ছাড় দেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন ও অগ্রাধিকার বিবেচনা করেই এই অর্থ ব্যয় করা হবে।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতে প্রায় ৩ কোটি টাকা, পরিবহন খাতে ১ কোটি ৯১ লাখ টাকা এবং আউটসোর্সিং খাতে প্রায় ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ পেতে পারে। এসব অর্থ ইউজিসির নীতিমালা অনুযায়ী অনুমোদন ও চাহিদার ভিত্তিতে ছাড় করা হবে।
এ প্রসঙ্গে মো. নাসির উদ্দিন আরও বলেন, আউটসোর্সিং খাতেও 'দৈনিক ভিত্তিতে সাময়িক শ্রমিক নিয়োজিতকরণ নীতিমালা-২০২৫' অনুযায়ী ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে চাহিদা নির্ধারণ করে বরাদ্দ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।
পরিবহন খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যানবাহন খাতে এখনো টাকা অনুমোদন হয়নি। এটি অনুমোদন হলেই আমরা পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেয়ে যাব।
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জুবায়ের হাসান রাফাত বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পরিবেশ তৈরির কথা বলা হলেও পর্যাপ্ত অর্থায়ন ছাড়া তা সম্ভব নয়। গবেষণার জন্য আলাদা বরাদ্দ না থাকলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নিরুৎসাহিত হন।
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, র্যাংকিং, আন্তর্জাতিকীকরণ ও অ্যাকাডেমিক মানোন্নয়নের কথা বলা হয়, কিন্তু গবেষণাই যদি উপেক্ষিত থাকে তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় এগোবে কীভাবে?
শিক্ষাবিদদের মতে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণে গবেষণা অন্যতম প্রধান সূচক। অথচ বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট বাজেটের খুব সামান্য অংশ গবেষণায় ব্যয় হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
তবে ইউজিসির মতে, গবেষণা তহবিল কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনার মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বাড়ানো হবে। গবেষণার অর্থ সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে না থাকলেও নীতিমালা অনুযায়ী গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।