উপাচার্য প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহ © টিডিসি ফটো
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা আগামীকাল শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত একযোগে সারাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ বছর বিশ্ববিদ্যালয়টির ৪ লাখ ৫২ হাজার ৮৭৫টি আসনের বিপরীতে পরীক্ষায় অংশ নেবেন ৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৪৮ জন। সেই হিসেবে আসন প্রতি লড়ছেন প্রায় ২ জন শিক্ষার্থী।
আজ শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রাজধানীতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর কার্যালয়ে উপাচার্য প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহ এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানিয়েছেন।
প্রফেসর ড. এ এস এম আমানুল্লাহ বলেন, এবারের পরীক্ষা এমসিকিউ পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে। এই পরীক্ষায় মানবিক ইউনিটের জন্য প্রশ্নপত্রের A ও B সেট, বিজ্ঞান ইউনিটের জন্য C ও D সেট এবং ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটের জন্য E ও F সেট নির্ধারিত করা হয়েছে। পরীক্ষার্থীদের যথাসময়ে কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার আহবান জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, এ বছর ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য মোট ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৪৩২ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক আবেদন করেছিলেন। যার মধ্যে আবেদন নিশ্চয়ন করেছেন ৪ লাখ ৫৩ হাজার ১৪৮ জন। এছাড়াও ২৩ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রবেশপত্র ইস্যু করা হয়েছে মোট ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৫১৯ জন পরীক্ষার্থী।
তিনি জানান, শিক্ষামন্ত্রী কাল ভর্তি পরীক্ষা কেন্দ্র পরিদর্শনে যাবেন। ঢাকাসহ দেশের ৬৪ জেলায় কলেজভিত্তিক পরীক্ষা কেন্দ্র রয়েছে। ভর্তি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ডিসি ও এসপিদের চিঠি দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেছেন, শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান উপযোগী করে গড়ে তুলতে এবং উচ্চশিক্ষাকে শিল্পখাতের সঙ্গে যুক্ত করতে তার নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: সিসিটিভিতে নকল দেখে এসএসসি পরিক্ষার্থীকে বহিষ্কার, ৩ শিক্ষককে অব্যাহতি
এ সময় তিনি বলেন, টেকনিক্যাল এডুকেশনের দিকে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ চলছে। এ অংশ হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আঞ্চলিক কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে এবং চলতি মাসেই আরও দুটি আঞ্চলিক কেন্দ্র উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে—একটি ময়মনসিংহে এবং অন্যটি ফরিদপুরে। একইসঙ্গে গত বছর থেকেই ইংরেজি বিষয়কে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যেখানে সকল শিক্ষার্থীকে ইংরেজি পড়তে হবে। দ্বিতীয় বর্ষের ইংরেজি সিলেবাসও শিগগির আপলোড করা হবে এবং সেটিও বাধ্যতামূলকভাবে পড়তে হবে।
তিনি আরও জানান, আইসিটি শিক্ষাকেও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যে বিষয়েই পড়ুক না কেন, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষে তাদের আইসিটির একটি করে কোর্স সম্পন্ন করতে হবে। এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের চাকরির উপযোগী করে গড়ে তোলা। গত প্রায় দুই বছরে প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে, যার ফলে দীর্ঘদিনের সেশনজট প্রায় নিরসনের পথে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী জুনের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সেশনজট নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
উপাচার্য বলেন, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ উচ্চশিক্ষা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নির্ভরশীল। তাই এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে সুশাসন, জবাবদিহিতা ও সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। এ লক্ষ্য অর্জনে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
দেশে বেকারত্ব প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২৮ লাখ বেকারের হিসাব একটি প্রাথমিক অনুমান, তবে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এ সমস্যা সমাধানে সিলেবাস সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে এবং প্রাথমিক ধাপ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাতে ৬০ শতাংশ উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যার ফলে অনেক কলেজে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে। তবে শিক্ষক সংকট একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার কলেজগুলোতে ৬৫ থেকে ৭৫ হাজার শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। একইসঙ্গে সারাদেশে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার প্রিন্সিপাল ও ভাইস-প্রিন্সিপাল নিয়োগের প্রক্রিয়াও চলছে, যার লিখিত পরীক্ষা ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং দ্রুত ফল প্রকাশের কথা রয়েছে। আগামী দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে এসব নিয়োগ সম্পন্ন হলে শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়েছে এবং সেখানে পিছিয়ে থাকার বিষয়গুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ইউনিসেফ-এর সহযোগিতায় একটি ফিজিবিলিটি স্টাডি শুরু হয়েছে, যার মাধ্যমে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে দেশের প্রয়োজনীয় দক্ষতা, শিক্ষার্থীদের চাহিদা এবং শিল্পখাতের চাহিদা নিরূপণ করা হবে। এ স্টাডির ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে সিলেবাসে আরও পরিবর্তন আনা হতে পারে। এ উদ্যোগে সরকারের উচ্চপর্যায়, এমনকি প্রধানমন্ত্রীরও আগ্রহ রয়েছে বলে জানান তিনি।
উপাচার্য আরও বলেন, ইনকোর্স পরীক্ষায় আগে জবাবদিহিতা না থাকলেও এখন সেটি নিশ্চিত করা হয়েছে। আঞ্চলিক কেন্দ্র হয়ে খাতা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে, যাতে সঠিকভাবে মূল্যায়ন নিশ্চিত হয়।
তিনি জানান, ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী কার্যক্রম এগিয়ে চলছে এবং ২০২৬ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এর দৃশ্যমান ফল পাওয়া যাবে। ২০২৭ সালের মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গর্ব করার মতো অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার উন্নয়নের জন্য প্রতিটি কলেজে ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট ও প্ল্যানিং ক্লাব গঠন করা হচ্ছে। পাশাপাশি একটি মাল্টিল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যার অধীনে আগামী এক মাসের মধ্যে কলেজভিত্তিক থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব চালু করা হবে। এখানে শিক্ষার্থীরা কোরিয়ান, জাপানিজ, স্প্যানিশ বা আরবি ভাষা শিখতে পারবে। তিনি বলেন, বিশেষ করে আরবি ভাষা জানলে গালফ অঞ্চলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বেতন দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।