মৃত্যুঞ্জয়ী নারী সুবর্ণা

নারীকে বলা হয় দশভূজা, সকল বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য শক্তি রয়েছে নারীদের মাঝে। এমনই এক নারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সুবর্ণা মজুমদার।

সুবর্ণার জন্ম বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলায়। কৃষক বাবা আর গৃহিণী মায়ের সংসারে চার বোনের মধ্যে সুবর্ণা দ্বিতীয়। ছোটোবেলা থেকেই সুবর্ণার পড়ালেখার প্রতি ছিলো প্রচণ্ড আগ্রহ। স্বপ্ন ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার। কিন্তু টানাপোড়েন এর সংসারে বাবা পড়ালেখার খরচ চালাতে না পেরে নবম শ্রেণিতে থাকতেই সুবর্ণাকে বিয়ে দেয় একই উপজেলার কালশিরা গ্রামে অনার্স পড়ুয়া আশিস কুমার মন্ডল এর সাথে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিয়ে মানেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সকল স্বপ্নের সমাপ্তি। কিন্তু সুবর্ণা তার স্বপ্নকে হারিয়ে যেতে দেননি। বিয়ের পরে সংসার সামলিয়েই চালিয়ে যেতে থাকেন পড়ালেখা। পড়ালেখার প্রতি সুবর্ণার ভালোবাসা দেখে সুবর্ণার পাশে দাড়ান তার স্বামী এবং শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা। নিজের প্রচেষ্টা এবং স্বামীর সহায়তায় এসএসসিতে উত্তীর্ণ হন গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে এবং এইচএসসি তে পান ৪.৭৫। স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখতে তখন বাকি কেবল একটি পদক্ষেপ। পারিপার্শ্বিক অবস্থা মিলিয়ে সুবর্ণার পক্ষে সম্ভব ছিলো না বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিং করা, তবে সুবর্ণা থেমে থাকেন নি।

স্বামীর উৎসাহে ঘরে বসেই নিতে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং সফলতাও লাভ করেন। ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে বশেমুরবিপ্রবিতে ভর্তির সুযোগ পান সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে সুবর্ণার দিনগুলো কাটছিলো স্বপ্নের মতোই, ভেবেছিলেন হয়তো তার লড়াইয়ের অবসান ঘটেছে। কিন্তু স্রষ্টার ইচ্ছে ছিলো অন্যরকম। তিনি সুবর্ণার জন্য অপেক্ষা করিয়ে রেখেছিলেন আারো বড় লড়াইকে।

১৯-০২-২০১৭, দিনটি ছিল রবিবার। অন্যদিনের মত সেদিনও সদ্য ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া সুবর্ণা তার গ্রামের বাড়ি বাগেরহাটের চিতলমারী থেকে এসে ভার্সিটির মেইন গেটের সামনে নামে। ক্লাসের দেরি হয়ে যাওয়ায় তাড়াতাড়ি রাস্তা পার হতে যায়, হঠাৎ করেই তার চিৎকারে নিস্তব্ধ হয়ে যায় চারপাশ। আশেপাশের লোকজন এসে দেখতে পায় তার থেতলে যাওয়া নিথর দেহ।

তৎক্ষনাৎ তাকে নিয়ে যাওয়া হয় গোপালগঞ্জের সদর হাসপাতলে। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান রোগীর বাঁচার সম্ভবনা খুব কম। কিন্তু সুবর্ণা তো হেরে যাওয়ার জন্য জন্মগ্রহণ করেন নি। সুবর্ণাকে বাচাঁতে পাশে দাঁড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। উন্নত চিকিৎসার জন্য ভার্সিটির তত্ত্বাবধানে তাৎক্ষণিকভাবে এয়ার এম্বুলেন্সে সুবর্ণাকে ঢাকা নেয়া হয়। দীর্ঘ ৭(সাত) দিন ICUতে থেকে ১৫ (পনের) দিনের মাথায় জ্ঞান ফেরে সুবর্ণার। প্রায় তিন মাস হাসপাতালে চিকিৎসাকালীন অবস্থায় দুইবার মাথার এবং তিনবার পায়ের সার্জারী হয় সুবর্ণার। আর এই চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিন।

চিকিৎসাশেষে প্রায় ছয়মাস পরে পুনরায় ক্লাসে যোগদান করেন সুবর্ণা। ততদিনে শেষ হয়েছে প্রথম সেমিস্টার। দ্বিতীয় সেমিস্টারেরও চলে গিয়েছে বেশ কয়েক মাস। সবাই ভেবেছিলো সুবর্ণা হয়তো এক বছর ড্রপ দিবেন কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে সুবর্ণা যোগ দিলেন দ্বিতীয় সেমিস্টারের ক্লাসেই। শিক্ষকদের সহায়তা আর নিজের অদম্য মানসিক শক্তির জোরে প্রথম বর্ষ প্রথম সেমিস্টার এবং দ্বিতীয় বর্ষ প্রথম সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা দিলেন একইসাথে এবং দুটিতেই করলেন ভালো ফলাফল।

নিজের লড়াই এবং স্বপ্ন সম্পর্কে সুবর্ণা বলেন, ‘জীবনে ছোটো থেকে লড়াই করতে করতেই বড় হয়েছি, স্রষ্টা মুখোমুখি করিয়েছিলেন মৃত্যুরও, সকলের ভালবাসায় ফিরে এসেছি মৃত্যুর মুখ থেকে। এক্ষেত্রে দুজন ব্যক্তির কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। একজন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিন এবং আরেকজন হলেন আমার স্বামী। একজন আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে আমায় নতুন জীবন দিয়েছিন আর আরেকজন দিয়েছেন আমার ভালোভাবে বেচেঁ থাকার মানসিক শক্তি। আমার স্বমী আমার জীবনে না আসলে হয়তো এতদূর আসাই সম্ভব হতো না। অসুস্থতার মুহুর্তগুলোতেও সর্বদা এমনভাবে পাশে থেকেছেন যে হতাশা আমাকে স্পর্শই করতে পারেনি, আমার স্বামীই আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।’

মৃত্যুঞ্জয়ী এই শিক্ষার্থী স্বপ্ন দেখেন শিক্ষক হওয়ার। শহরের কোলাহল তার পছন্দ নয় তিনি চান শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করে নিজ উপজেলায় কোনো একটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাকি জীবন অতিবাহিত করতে। একটু সহযোগিতা পেলেই নারীরা যে সকল বাধা বিপত্তি অতিক্রম করতে পারে তারই এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ সুবর্ণা। মৃত্যুন্জয়ী সুবর্ণা তার স্বপ্নকেও জয় করে একদিন হয়ে উঠবেন দেশসেরা শিক্ষক, তার শিক্ষায় তৈরি হবে আরো অসংখ্য হার না মানা সুবর্ণা এমনটাই প্রত্যাশা সকলের

দেশে পোঁছেছে ৫৫ হাজার পোস্টাল ব্যালট 
  • ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
সংঘর্ষে জামায়াত নেতা নিহত, ঝিনাইগাতীতে থমথমে পরিস্থিতি
  • ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
ইরানে হামলার হুমকি; ডলারের দরপতনে রেকর্ড দাম স্বর্ণের
  • ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
নেতার ইগো ও ষড়যন্ত্রে চার দশক পর বিএনপি ছাড়লেন মাহাবুব মা…
  • ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
জনবল নিয়োগ দেবে নগদ লিমিটেড, আবেদন শেষ ৫ ফেব্রুয়ারি
  • ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স অপেক্ষমাণ রেখে ফেরি ছেড়ে দেওয়ার …
  • ২৯ জানুয়ারি ২০২৬