অবন্তিকার মার কান্না যেন থামছেই না
বাবা-মা ও ভাইয়ের সঙ্গে অবন্তিকার এই ছবি এখন শুধুই স্মৃতি © সংগৃহীত
এক বছর আগে গত রোজার সময় অধ্যাপক স্বামীকে হারিয়েছেন। এবারের রোজায় ছেড়ে চলে গেল বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া পরম আদরের মেয়েও। এই শোক যেন হৃদয়ে আর ধারণ করতে পারছেন না শুক্রবার (১৫ মার্চ) রাতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যা করা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) আইন বিভাগে শিক্ষার্থী ফাইরুজ অবন্তিকার মা তাহমিনা শবনম। থামছেই না সন্তানহারা এই মায়ের কান্না।
অবন্তিকার বাবা মো. জামাল উদ্দিন ছিলেন কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। এছাড়া তিনি কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ ও কুমিল্লা সরকারি কলেজে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন। ২০২৩ সালের ১২ এপ্রিল তিনি মারা যান। এরপর ছেলে-মেয়েই ছিল তাহমিনা খানমের দুই চোখের আলো।
তাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা শহরের শাসনগাছা মহাজন বাড়ি এলাকায়। অবন্তিকার মা তাহমিনা শবনম কুমিল্লা পুলিশ লাইনস উচ্চবিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন। এছাড়া তিনি উপস্থাপনা করতেন। তার একমাত্র ছোটভাই জাবিদ জাওয়াদ এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবেন।
শনিবার (১৬ মার্চ) সকালে তাকে সান্ত্বনা দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের তিনজন শিক্ষকের নেতৃত্বে ৩৫ জন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের বাসে কুমিল্লায় আসেন। মা শবনম আহাজারি করে বলেন, কোথাও বিচার পায়নি আমার মেয়ে। কারণে-অকারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ২০২২ সাল থেকে আমার মেয়ের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। মেয়ে আমার বিচারক হতে চেয়েছিল, ওরা বাঁচতে দিলো না। আমার মেয়ের মৃত্যুর জন্য পুরো জবি প্রশাসনই দায়ী।
তিনি বলেন, জবি প্রশাসনের ডাকে আমি অসুস্থ স্বামী নিয়ে একাধিকবার প্রশাসনের কাছে গিয়েছিলাম, বিচার তো পাইনি উল্টো তারা (জবি প্রশাসন) আমাদের আরও মানসিকভাবে হয়রানি করেছে। কখনও থানায় জিডি ও মামলার হুমকি দেওয়া হতো মেয়েকে। তিনি বলেন, তার মেয়েকে সহপাঠী আম্মান সিদ্দিকী অনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছিল, এতে সে সাড়া দেয়নি। বিষয়টি সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলামকে জানিয়ে উল্টো ফল হয়। দ্বীন ইসলাম মেয়েকে নানাভাবে হয়রানি ও কটূক্তি করতো।
তাহমিনা শবনম বলেন, ২০২৩ সালের ১২ এপ্রিল রোজার সময় অধ্যাপক স্বামীকে হারালাম। কাল মেয়েকে হারালাম। কিন্তু ওরা আমার মেয়েকে বাঁচতে দিলো না। আমার মেয়ে সাহসী ছিল। তার বিমান বাহিনীতে চাকরি হয়েছিল, পায়ে ব্যথার কারণে নিয়ে আসি। বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ায় সে ভালো ছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিচার না পেয়ে মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
মেয়ের মৃত্যুর জন্য তিনি সহপাঠী আম্মান সিদ্দিকী ও সহকারী প্রক্টর দ্বীন ইসলাম ছাড়াও পুরো জবি প্রশাসন দায়ী করেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তারা কেন এক বছর ধরে বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখে আমার মেয়েকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিলো।
মেয়ের আত্মহত্যার শেষ সময়ের কথা জানিয়ে মা শবনম বলেন, শুক্রবার ইফতারের আগে ও পরে মেয়েকে খুব বিমর্ষ দেখাচ্ছিল, একসঙ্গে ইফতারও খাই। রাত সাড়ে ৯টার দিকে পাশের কক্ষে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। সে প্রায়ই দরজা বন্ধ করে রাখতো। কিছুক্ষণ পর ওর রুমে ফ্যানের শব্দ না পেয়ে ডাকাডাকি করি। কোনো সাড়া মেলেনি। পরে ছেলেকে বাসার নিচে পাঠাই, দারোয়ানকে নিয়ে মই দিয়ে পূর্ব পাশের জানালা খুলে দেখতে পাই, ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আছে মেয়ে। এরপর পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা পুলিশের একজন সদস্যসহ আমরা ওর নিথর দেহ নামাই। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
অবন্তিকার একমাত্র ছোটভাই জাবিদ জাওয়াদ অপুর্ব বলেন, আপুু ঢাকা থেকে আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব বিষয় সবার সঙ্গে শেয়ার করতেন। বাবা-মা শিক্ষক ছিলেন, তাই তারা চাইতেন বিষয়টি সহজেই সমাধান হোক। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে কোনো সহায়তা না করায় আমার বোনকে মরণের দিকে যেতে হয়েছে।