নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তাদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান © সংগৃহীত
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের (সিপিএস) উদ্যোগে রোহিঙ্গা গণহত্যার নবম বার্ষিকী উপলক্ষে ‘আমাদের ছাড়া আমাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নয়: প্রত্যাবাসনের পথে রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বর’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) আয়োজিত ওয়েবিনারে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষাবিদ, কূটনীতিক, গবেষক ও রোহিঙ্গা অধিকারকর্মীরা অংশ নেন। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার প্রেক্ষাপট স্মরণ করে এ আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক ড. এম জসিম উদ্দিন উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান রোহিঙ্গাদের অর্থবহ অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব নয়। তিনি সম্ভাব্য প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার জন্য পাঁচটি মূলনীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন—রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়া, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা, পছন্দের ভিত্তিতে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের সুযোগ তৈরি করা, বিশ্বাসযোগ্য যাচাই ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১৩ লাখের বেশি শরণার্থীর দায়িত্ব পালনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী আরাকান আর্মির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সংলাপসহ ট্র্যাক ওয়ান ও ট্র্যাক টু কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
২০১৭ সালের নভেম্বরে সম্পাদিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তিটির সমালোচনা করে অধ্যাপক জসিম বলেন, এই চুক্তির ধারাগুলো রোহিঙ্গাদের আত্মপরিচয়, নাগরিকত্বসহ অন্যান্য মানবিক অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের তিনজন আলোচক সংকটের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরেন। রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী ও মানবাধিকার রক্ষাকর্মী মোহাম্মদ তোফায়েল বলেন, নির্বাসনে জন্ম নেওয়া একটি প্রজন্ম এখন বেড়ে উঠছে। তিনি উল্লেখ করেন, মানবিক সহায়তা প্রয়োজনীয় হলেও এটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিকল্প হতে পারে না।
ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা-এর প্রেসিডেন্ট প্যানেলের প্রথম সদস্য সৈয়দ উল্লাহ ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের সমালোচনা করে বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যথাযথ পরামর্শ ছাড়াই এসব নথি তৈরি করা হয়েছিল। তিনি বলেন, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যাচাই প্রক্রিয়া এবং তথাকথিত মডেল ভিলেজে পুনর্বাসনের বর্তমান ব্যবস্থা সংকটের সমাধান করবে না; বরং রোহিঙ্গাদের সীমাবদ্ধ অবস্থানকে আরও দীর্ঘায়িত করতে পারে।
সাংবাদিক ও গবেষক আদিল সাখাওয়াত বলেন, রাখাইনের কর্তৃপক্ষ এখনও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পরিচয় অস্বীকার করে চলেছে। তিনি ২০২৪ সালে বুথিডংয়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য এখনও অনুকূল নয়।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির রোহিঙ্গাদের ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠনকে একটি সম্মিলিত বার্তা তৈরি করতে হবে, যাতে তাদের অভিন্ন অবস্থান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা যায়। তিনি আরও বলেন, বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রভাব টেকসই সমাধানের পথ তৈরিতে কাজে লাগানো যেতে পারে। অধ্যাপক আমেনা মহসিন সংকটের মূল কারণ হিসেবে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় নীতিকে চিহ্নিত করেন। তিনি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা নারীদের নিজ মাতৃভূমির প্রতি দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের অনুভূতি এবং ডিজিটাল প্রজন্মের রোহিঙ্গা তরুণদের প্রয়োজনীয়তা পূরণের বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন।
অধ্যাপক ড. এম জসিম উদ্দিন পুনরায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন উদ্যোগগুলোর ব্যর্থতার কারণ তুলে ধরেন। তিনি রোহিঙ্গা নেতা মুহিব উল্লাহ হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আস্থায় না নেওয়ার বিষয়ে এটি একটি সতর্কবার্তা। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বর্তমানে বিদ্যমান নির্বাচিত রোহিঙ্গা সংস্থাগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর যথাযথ প্রতিনিধিত্ব করতে পারছে কি না। তিনি আরও বলেন, আলোচনার টেবিলে প্রকৃত রোহিঙ্গা প্রতিনিধিত্ব ছাড়া ন্যায়সংগত প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের সদস্য ড. আনাস আনসার ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুতি একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পরিণত হয়েছে, যার জন্য অব্যাহত আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
সমাপনী বক্তব্যে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক আলোচনায় রোহিঙ্গাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি রোহিঙ্গা তরুণদের শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন এবং কমিউনিটি গঠনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ও একাডেমিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।