উপাচার্য ছাড়া চলছে ৩১ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় © ইউজিসি লোগো
১০ বছর আগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় রূপায়ণ এ কে এম শামসুজ্জোহা নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিয়েছিল সরকার। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষা কার্যক্রম শুরুই করতে পারেনি। ফলে নিয়োগ দেওয়া হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনিক শীর্ষ ‘উপাচার্য’ পদটি। একই দশা ২০২০ সালে অনুমোদন পাওয়া রাজধানী ঢাকার উত্তরায় অবস্থিত মাইক্রোল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নামে আরেকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের।
শুধু এই দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সরকারি অনুমোদন পাওয়া দেশের ১১২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৫টি এখনও শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। এই ৫টিসহ বর্তমানে দেশের ৩১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চলছে উপাচার্য ছাড়াই। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ উপ-উপাচার্য ও তারপরের পদ কোষাধ্যক্ষ নেই— এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা আরও বেশি। দেশের বিশ্ববিদ্যালগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ হালনাগাদ করা এক তালিকায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
সংস্থাটি বলছে, হালনাগাদ তালিকাটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা নিয়মিতভাবে আপডেট করা হয়। গত সপ্তাহে এই তালিকাটি প্রকাশ করা হয়। এর আগে সর্বশেষ ২০২৫ সালের অক্টোবরে এই তালিকাটি প্রকাশিত হয়েছিল।
ইউজিসির তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে অনুমোদিত ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ১১২টিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত করার মত পরিবেশ রয়েছে। বাকি চারটিতে (ইবাইস ইউনিভার্সিটি; দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা; আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি ও কুইন্স ইউনিভার্সিটি) শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
জানা যায়, সরকার আইন করে ১৯৯২ সাল থেকে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া শুরু হয়। বিগত প্রায় সাড়ে তিন দশকে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পেয়েছে ১১৬টি। শুরুতে গ্রহণযোগ্য ও শিক্ষানুরাগী উদ্যোক্তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে রাজনৈতিক বিবেচনা ও তদবিরের ভিত্তিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেওয়ার প্রবণতা শুরু হয়। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনুমোদন পাওয়া বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাদের অনেকে সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ— এই তিন পদে নিয়োগ দিতে একেকটি পদের বিপরীতে তিনজন অধ্যাপকের নামের প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। সেগুলোর ইউজিসির মাধ্যমে যাচাই করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবে রাষ্ট্রপতি একজনকে নিয়োগ দেন।
অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকরা সরকার কর্তৃক এই তিন পদে নিয়োগ না দিয়ে বছরের পর বছর নিজেদের পছন্দের লোকদের ভারপ্রাপ্ত হিসেবে এসব পদে নিয়োগ দিয়ে রাখেন। আবার প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কাউকে নিয়োগ দেননি, এ তালিকায় রয়েছে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়।
জানা যায়, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় ধরে উপাচার্যের পদটি শূন্য থাকায় একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে গত কয়েক বছর ধরে উপাচার্য নেই, আবার কোনোটিতে নিয়োগ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এখনো যোগদান করেননি। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখনও শিক্ষা কার্যক্রম শুরুই করতে পারেনি। ফলে সেখানে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার তো প্রশ্নই উঠে না।
ফলে শিক্ষা নিয়ে ব্যবসা করাই এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নানা সমস্যায় জর্জরিত বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা কিছু বিশ্ববিদ্যালয় একের পর এক অনিয়মে পরিচালিত হচ্ছে। নিয়ম না মানা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবিলম্বে লাগাম টানার পরামর্শ শিক্ষাবিদদের।
সর্বশেষ ইউজিসির তথ্যমতে উপাচার্য নেই এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক; পিপল’স ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ; এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ; বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ; সাউদার্ণ ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ; ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ; ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ; রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা; অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি; নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, খুলনা; ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; রাজশাহী সাইন্স এন্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি; ব্রহ্মপুত্র ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; আর.পি. সাহা বিশ্ববিদ্যালয় ও সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
তালিকায় আরও রয়েছে— বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, সৈয়দপুর; বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি, কাদিরাবাদ; বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি, কুমিল্লা; নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এন্ড টেকনোলজি, খুলনা; রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া; সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি; রূপায়ন এ. কে. এম শামসুজ্জোহা বিশ্ববিদ্যালয়; খুলনা খান বাহাদুর আহছানউল্লা বিশ্ববিদ্যালয়; ইউনিভার্সিটি অব স্কিল এনরিচমেন্ট এন্ড টেকনোলজি; মাইক্রোল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি; ডা. মমতাজ বেগম ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি; বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অফ সাইন্স এন্ড টেকনোলজি, খুলনা; লালন বিজ্ঞান ও কলা বিশ্ববিদ্যালয়; জাস্টিস আবু জাফর সিদ্দিকী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়।