সনজিতের বক্তব্য নিয়ে ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়নের পাল্টাপাল্টি বিবৃতি

সনজিতের বক্তব্য নিয়ে ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়নের পাল্টাপাল্টি বিবৃতি
ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন  © লোগো

দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধর্ষণের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে আয়োজিত এক সমাবেশে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাসের একটি বক্তব্যকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি বিবৃতি দিয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ।

রবিবার সনজিতের ওই বক্তব্যের প্রতিবাদে পরদিন সোমবার দেওয়া ছাত্র ইউনিয়নের বিবৃতির পর মঙ্গলবার পাল্টা বিবৃতি দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। সেখানে বলা হয়েছে, ‘সাম্প্রদায়িক-প্রতিক্রিয়াশীল, স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠীর কাছে ছাত্র ইউনিয়েনের বর্তমান নেতৃত্ব তাদের সংগঠনকে সেভাবে লজ্জাজনক ইজারা ও দখলদারিত্ব প্রদান করেছে, বিবৃতিই তারই প্রমাণ বহন করেন’।

এদিকে, আজ বুধবার ছাত্র ইউনিয়নের অপর এক বিবৃতিতে বলছে, ‘ভাষা আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ থেকে জন্ম নিয়ে দেশের গণমানুষের প্রত্যেকটি অধিকার আদায় ও স্বাধীনতার লড়াইয়ে নিজেদের সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করেছে ছাত্র ইউনিয়ন। জন্মলগ্ন থেকে এখনো সন্ত্রাস, মৌলবাদ, সাম্রাজ্যবাদসহ অন্যান্য জনবিরোধী চেতনাকে সবসময় প্রতিহত করে এসেছে ছাত্র ইউনিয়ন। এইসব জনবিরোধী চেতনা প্রতিহত করতে গিয়ে অসংখ্য নেতা-কর্মী বিলিয়ে দিয়েছেন তাদের সর্বোচ্চ সম্পদ নিজের জীবনকে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়,‘ সম্প্রতি সারাদেশে ধর্ষণ ও নারী নিপীড়নের মহামারীর মধ্যে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি সঞ্জিত চন্দ্র দাস যেই অমানবিক ও রুচিহীন বক্তব্য সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে দাঁড়িয়ে জনসমক্ষে দিয়েছেন দায়িত্বজ্ঞানের জায়গা থেকেই তার প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ একটি বিবৃতি দেয়। এর পরেই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় যে, যথারীতি বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতির বক্তব্যের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না করে উল্টো বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের প্রতি বিষোদ্গার করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা একটি বিবৃতি দিয়েছে। বলাই বাহুল্য, এর মধ্য দিয়ে তাদের রাজনৈতিক দৈন্য আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।’ 

এর আগে সোমবার ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি সংসদের সভাপতি সাখাওয়াত ফাহাদ ও সাধারণ সম্পাদক রাগীব নাঈমের যৌথ বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ‘রবিবারের সমাবেশে সনজিত চন্দ্র দাস বলেছেন, ‘স্বাধীনতা বিরোধী ছাড়া অন্য কোনো নারী যদি নির্যাতনের শিকার হয়.. তা প্রতিহত করবো’। তিনি এই বক্তব্যের মাধ্যমে ধর্ষণের বৈধতা দিয়েছেন। তাকে শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দেখতে চায় না।

ছাত্র ইউনিয়নের এই বিবৃতির প্রতিবাদে মঙ্গলবার ঢাবি ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম পান্থ স্বাক্ষরিত পাল্টা বিবৃতিতে বলা হয়, হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতেই সনজিতের বক্তব্যকে রঙ মাখিয়ে প্রচারণা চালিয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন। এর মাধ্যমে তারা ধর্ষকদের পক্ষে তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে।

ছাত্রলীগের ওই বিবৃতিতে বলা হয়, সনজিত চন্দ্র দাসের বক্তব্যকে হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে কুরুচিপূর্ণ ও উদ্দেশ্যমূলক রঙ মাখিয়ে যে প্রচারণা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের নামে প্রচারিত হয়েছে, তা ছাত্র ইউনিয়নের গৌরবজনক ঐতিহাসিকতার হতাশাজনক পরিণতি বলে আমরা মনে করি। আমরা উদ্বেগের সাথে আর মনে করি, সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল, স্বাধীনতা বিরোধী গোষ্ঠীর কাছে ছাত্র ইউনিয়নের বর্তমান নেতৃত্ব তাদের সংগঠনকে যেভাবে লজ্জাজনক ইজারা ও দখলদারিত্ব প্রমাণ করেছে সাম্প্রতিক বিবৃতি তারই প্রমাণ বহন করে।

এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই মিথ্যাচার ও বানোয়াট যৌথ বিবৃতিকে প্রত্যাখানপূর্বক মনে করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী ধর্ষিত হবার ঘটনায় আশ্চর্যজনকভাবে নীরব থেকে ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ ধর্ষকদের পক্ষে তাদের সাংগঠনিক অবস্থান প্রমাণ করেছে। পাশাপাশি ধর্ষকদের সাথে নিজেদের রাজনৈতিক মিত্রতাকে তারা ধর্ষিতার আর্তনাদের থেকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। যা এই সংগঠনের দেউলিয়াত্ব প্রমাণ করে। স্বাধীনতা বিরোধী, মৌলবাদী, ধর্মীয় উগ্র গোষ্ঠীর সমর্থক হয়ে পরিচালিত ছাত্র ইউনিয়নের এমন কর্মকাণ্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ কোনভাবেই মেনে নিবে না। 

আজকের ছাত্র ইউনিয়নের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ঠিক কোন প্রেক্ষিতে, ধর্ষণকে ‘মেগাসিরিয়াল’ বলা গ্রহণযোগ্য, সারাদেশে নুরুল হকের লোকজন ধর্ষণ ঘটিয়ে ছাত্রলীগের উপর পরিকল্পনা অনুযায়ী দোষ চাপাচ্ছে- এহেন হাস্যকর ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ কেন দেশজুড়ে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের সংকটকে খেলো করাতে ভূমিকা রাখছে না, তার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়ার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে উল্টো বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন 'হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে কুরুচিপূর্ণ ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে রঙ মাখিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা' করছে।

‘তাদের জ্ঞাতার্থে বলতে চাই, সঞ্জিত চন্দ্র দাসের হিংসাত্মক সেই বক্তব্য জনসমক্ষেই প্রদান করা হয়েছিল, এবং সংবাদমাধ্যমের মধ্যে দিয়েই তা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এখানে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নামে অপপ্রচারের অভিযোগ আনা নিতান্তই হাস্যকর ও অবান্তর। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে, দয়া করে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব না আওড়িয়ে বাস্তবতায় ফিরুন। দল-মত নির্বিশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যে 'স্বাধীনতা-বিরোধী ছাড়া যে-কোনো নারী নির্যাতনের শিকার হলে আমরা তা প্রতিহত করব' এহেন বক্তব্যকে ও তার বক্তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে তা বুঝতে ও স্বীকার করতে শিখুন।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘বিবৃতির শেষাংশে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ যেভাবে আর কিছু না পেয়ে ঈশপের গল্পের নেকড়ের মতো সিপিবির কাজের দায় আমাদের উপর দেওয়ার চেষ্টা করল তাকে হাস্যকর বললেও কম বলা হবে। অবশ্য যেই ছাত্র সংগঠনের প্রত্যেকটি কমিটি অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাদের ইচ্ছা অনুযায়ী নাজিল হয় তারা যে 'স্বাধীন ছাত্র গণসংগঠন' নামক ধারণাটি বুঝতে ব্যর্থ হবে এটাই স্বাভাবিক। সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়ন দুইটি আলাদা সংগঠন, একে অন্যের কাজের জন্য তারা দায়ী নয়। ভবিষ্যতে আমাদের মিত্রপ্রতিম সংগঠন সিপিবির বিষয়ে কোনো বক্তব্য থাকলে তা তাদেরকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে জানানোর আহ্বান রইল।’


মন্তব্য

এ বিভাগের আরো সংবাদ