১০ অক্টোবর শহীদ জেহাদ দিবস
নাজির উদ্দিন আহমেদ জেহাদ © সংগৃহীত
দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় সেদিন রাজধানীর পল্টনে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তৎকালীন ছাত্রদল নেতা নাজির উদ্দিন আহমেদ জেহাদ। তার মৃত্যু সামরিক স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি সঞ্চার করে। জেহাদের লাশ সামনে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হন। গড়ে ওঠে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য।
তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসু নেতাদের সক্রিয় ভূমিকা এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর সম্মিলিত আন্দোলন ক্রমে দেশব্যাপী গণপ্রতিরোধে রূপ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন, পেশাজীবীদের প্রতিবাদ এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগে বাধ্য হন সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। অবসান ঘটে তার প্রায় নয় বছরের স্বৈর শাসনের।
১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর। রাজধানীর পল্টন এলাকায় স্বৈরাচারী হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিলেন গণতন্ত্রকামী মানুষ। সেই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ছাত্রদল নেতা নাজির উদ্দিন আহমেদ জেহাদ। তার মৃত্যু কেবল একজন তরুণের জীবনাবসান ছিল না; এটি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নতুন গতি সঞ্চার করে। জেহাদের আত্মত্যাগের পর বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ জোরদার হয়। সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতৃত্বে আন্দোলন বিস্তৃত হতে থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে রাজপথে। রাজনৈতিক দলগুলোর যুগপৎ আন্দোলন, ছাত্রসমাজের প্রতিরোধ এবং পেশাজীবীদের সক্রিয়তা মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত পতন ঘটে প্রায় নয় বছরের সামরিক স্বৈরশাসনের।
শহীদ জেহাদ দিবসকে সামনে রেখে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সেই ইতিহাস আজও স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
রাজপথে জেহাদের আত্মত্যাগ
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার সন্তান নাজির উদ্দিন আহমেদ জেহাদ ছিলেন সরকারি আকবর আলী কলেজ শাখা ছাত্রদলের তৎকালীন সভাপতি। ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর এরশাদ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোটের কর্মসূচিতে অংশ নিতে তিনি সহকর্মীদের নিয়ে ঢাকায় আসেন।
সেদিন সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি ও বিরোধী দলের সমাবেশ ঘিরে রাজধানীতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পল্টন এলাকায় পুলিশের লাঠিপেটা ও গুলির ঘটনায় জেহাদ গুলিবিদ্ধ হন। পরে তার মৃত্যু হয়। ওই দিনের সহিংসতায় আরও কয়েকজন প্রাণ হারান এবং অনেকে আহত হন।
জেহাদের মৃত্যুতে ছাত্রসমাজের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তার আত্মত্যাগকে কেন্দ্র করে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ জোরদার হয়। ১০ অক্টোবরের ঘটনাকে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
অপরাজেয় বাংলায় সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য
জেহাদের মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিয়ে আসার পর অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা সমবেত হন। সেখানেই গড়ে ওঠে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য। তৎকালীন ডাকসুর সহসভাপতি আমানউল্লাহ আমানসহ ছাত্রনেতারা এই ঐক্য গঠন ও আন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১০ অক্টোবর শহীদ জেহাদের মরদেহ সামনে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠনের সময় সাধারণ ছাত্রদের উপস্থিতিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্রনেতারা দেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করার শপথও নেন। এক বাক্যের সেই শপথের নেতৃত্ব ও শপথ বাক্য পাঠ করান ডাকসুর তৎকালীন সহসভাপতি আমান। শপথটি ছিল- ‘‘যতদিন পর্যন্ত আমরা দেশকে স্বৈরাচারের কবল থেকে মুক্ত করতে না পারব, স্বৈরাচারের পতন না হওয়া পর্যন্ত ততদিন আমরা ঘরে ফিরে যাব না।”
শপথের সময় নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের সঙ্গে যুক্ত উল্লেখযোগ্য ছাত্রনেতাদের মধ্যে ছিলেন- আমানউল্লাহ আমান (তৎকালীন ডাকসুর সহ-সভাপতি), খায়রুল কবির খোকন (তৎকালীন ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক) ও হাবিবুর রহমান হাবিব (তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি)।
এছাড়া ছিলেন, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল-বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতা। নাজমুল হক প্রধান-জাসদ ছাত্রলীগের নেতা, শফী আহমেদ-জাসদ ছাত্রলীগের নেতা, জাহাঙ্গীর সাত্তার টিংকু-বাকশাল ছাত্রলীগের নেতা, জহিরউদ্দিন স্বপন-ছাত্র মৈত্রীর নেতা, নূর আহমেদ বকুল-ছাত্র মৈত্রীর নেতা ও নাজিমউদ্দিন আলম-ছাত্রদলনেতা।
সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের লক্ষ্য ছিল স্বৈরাচার এরশাদের শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ছাত্রসংগঠনগুলোর পারস্পরিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য তৈরি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। মিছিল, সমাবেশ, ধর্মঘট ও প্রতিবাদ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ছাত্রসমাজ আন্দোলনের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।
ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্য
এরশাদবিরোধী আন্দোলন অবশ্য ১০ অক্টোবরেই শুরু হয়নি। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক আইন জারির মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই তার শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিল। ১৯৮৩ ও ১৯৮৪ সালের ছাত্র আন্দোলন, বিভিন্ন সময়ে পুলিশের দমন-পীড়ন এবং ১৯৮৭ সালের নূর হোসেনের আত্মত্যাগ আন্দোলনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।
১৯৯০ সালে এসে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন আটদলীয় জোট এবং বামপন্থী দলগুলোর পাঁচদলীয় জোট পৃথক রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেও এরশাদের পদত্যাগের দাবিতে কাছাকাছি আসে।
১০ অক্টোবরের ঘটনার পর সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের তৎপরতা এই রাজনৈতিক ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করে। ছাত্রসমাজের আন্দোলনের পাশাপাশি শ্রমিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী ও অন্যান্য পেশাজীবীরাও প্রতিবাদে অংশ নেন। সরকারবিরোধী কর্মসূচি ক্রমে দেশব্যাপী রাজনৈতিক সংকটের রূপ নেয়।
ডা. মিলনের মৃত্যু ও পতনের চূড়ান্ত পর্যায়
আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গুলিতে নিহত হন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের নেতা ডা. শামসুল আলম খান মিলন। তার মৃত্যুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর ঐক্যবদ্ধভাবে চূড়ান্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার চাপ বাড়ে।
১৯ নভেম্বর তিনটি রাজনৈতিক জোট গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটি যৌথ রূপরেখা ঘোষণা করেছিল। এর মূল বিষয় ছিল এরশাদের পদত্যাগ, নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অবাধ নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর।
অবশেষে গণআন্দোলনের মুখে ৪ ডিসেম্বর এরশাদ ক্ষমতা ছাড়ার ঘোষণা দেন। ৬ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন এবং বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ তৈরি হয়। এর মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে এরশাদের প্রায় নয় বছরের শাসনের।
গণতন্ত্রের ইতিহাসে জেহাদের তাৎপর্য
শহীদ জেহাদ দিবস প্রতিবছর ১০ অক্টোবর পালিত হয়। দিনটি শুধু একজন ছাত্রনেতার আত্মত্যাগ স্মরণ করার উপলক্ষ নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রসমাজের ঐক্য, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ইতিহাসও স্মরণ করিয়ে দেয়।
জেহাদের মৃত্যুর পর সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের বিকাশ, ডাকসু নেতৃত্বের সক্রিয়তা, রাজনৈতিক জোটগুলোর সমন্বিত আন্দোলন এবং ডা. মিলনের আত্মত্যাগ—সব মিলিয়েই ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান চূড়ান্ত রূপ পায়। এই ইতিহাসের শিক্ষা হলো, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং জনগণের ভোটাধিকার ও মৌলিক অধিকার রক্ষা করা অপরিহার্য।
শহীদ জেহাদের আত্মত্যাগ তাই বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে রয়েছে।