নারী সংসদ সদস্য (এমপি) নুরুন্নিসা সিদ্দীকা © সংগৃহীত
জাতীয় সংসদে পুরুষদের জন্য অবৈতনিক বা বিনা মূল্যে শিক্ষার দাবি তোলায় তৈরি হওয়া আলোচনা-সমালোচনার পর এবার নিজের দাবির পক্ষে ব্যাখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নারী সংসদ সদস্য (এমপি) নুরুন্নিসা সিদ্দীকা। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে তিনি এই দাবির পেছনে নিজের দীর্ঘদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।
এর আগে বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৪তম দিনে বুধবার (২৪ জুন) ২০২৬-২৭ অর্থ-বছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা অংশ নিয়ে তিনি নারী শিক্ষার্থীদের মতো ছেলে শিক্ষার্থীদেরও শিক্ষা অবৈতনিক করার দাবি জানান।
ফেসবুক পোস্টে নুরুন্নিসা সিদ্দীকা লিখেন, ‘গতকাল (বৃহস্পতিবার) জাতীয় সংসদে আমার পাঁচ মিনিটের ভাষণ নিয়ে তুমুল আলোচনা-পর্যালোচনা হতে পারে। কিন্তু আমি এ বাস্তবতার সাক্ষী গত ১৬ বছর ধরে।’
নিজের দীর্ঘ সামাজিক কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, বিগত ২০ বছর ধরে তিনি নারীদের শিক্ষিত করার কাজ করছেন। প্রথমে মায়েদের শিক্ষা এবং পরবর্তীতে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। সেই স্কুলের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তিনি লিখেন, ‘আমার এ স্কুল থেকে শতশত ছাত্রছাত্রী এ পর্যন্ত বের হয়েছে। তারা মাত্র ১০-১২ জন এসএসসি বা তার চেয়ে উপরে গিয়েছে। অধিকাংশেরই তৃতীয় শ্রেণী পাস করার পর বাবা-মা মনে করে এদের আর পড়ালেখার দরকার নেই। ছেলেরা রোজগার করবে। আর ফাইভ-সিক্সে ওঠার পর মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। কার সাথে? সম্পূর্ণ অশিক্ষিত ভবঘুরে ছেলের সাথে।’
সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের পারিবারিক সংকটের পেছনে পুরুষ শিক্ষার অভাবকে দায়ী করে এই নারী এমপি লিখেন, ‘আমার স্কুলে যেসব গার্ডিয়ান আসেন, তারা তো সবাই সুবিধা বঞ্চিত শ্রেণীর। এখানে দেখা যায় মা চতুর্থ থেকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়া। কিন্তু বাবা অশিক্ষিত, অনেক সময় স্বাক্ষরও করতে জানে না। সৌভাগ্যবান দুই-একজন নারী যারা অশিক্ষিত স্বামীর ঘর করেও সুখে আছে, পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে সংসার চালায়। অধিকাংশেরই স্বামী আর এক নারী নিয়ে সংসার করছে। এখানে শুধু বাচ্চা প্রদান করতে আসে।’
ছেলেদের পড়াশোনা বাদ দিয়ে কাজে দেওয়ার কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক সংকটকে উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘এর কারণ কি? মেয়েদের মত ছেলেরাও যদি অবৈতনিক শিক্ষার সুযোগ পেত, তাহলে কষ্ট করে বাবা-মা তাদেরকে কিছুদিন পড়াতো। একই পরিবারে মেয়েটা পড়ছে অবৈতনিক আর ছেলেটাকে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে কাজে। কারণ লেখাপড়ার খরচ চালানোর সামর্থ বাবা-মায়ের নেই।’
কেবল ‘নারী শিক্ষা’ নিয়ে স্লোগান দেওয়ার সমালোচনা করে জামায়াতের এই সংসদ সদস্য লিখেন, “এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা আমাদের সমাজ, আমাদের সরকার বসে বসে দেখছে? সবাই তারস্বরে চিৎকার করছে ‘নারী শিক্ষা’, ‘নারী শিক্ষা’। কিন্তু পুরুষ শিক্ষিত না হলে সেই নারীকে মূল্যায়ন করবে কে? এ কথাটা কি একবারও মাথায় আসে না?”
এই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে নিজের ফেসবুক পোস্টে সরকারের কাছে দুটি সুনির্দিষ্ট দাবি জানান এমপি। ১. দশম শ্রেণী পর্যন্ত সকল ছেলে-মেয়ের জন্য সম্পূর্ণ অবৈতনিক শিক্ষা চালু করা হোক। ২. মেয়েদের পাশাপাশি ছেলেদের জন্যও শিক্ষাবৃত্তি বা উপবৃত্তি চালু করা হোক। পোস্টের শেষে তিনি এই লক্ষ্য অর্জনে একমত পোষণকারীদের একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।