১৯৭৯ সালে ‘জিয়াউর রহমানের হাতে ধানের শীষ’ তুলে দেওয়া নিয়ে যা জানা গেল

১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৬ PM , আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:২৮ PM
১৯৭৯ সাল নীলফামারীর ডোমার বহুমুখী হাইস্কুল মাঠে জিয়াউর রহমান। পহেলা বৈশাখে সন্তোষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (ডানে)

১৯৭৯ সাল নীলফামারীর ডোমার বহুমুখী হাইস্কুল মাঠে জিয়াউর রহমান। পহেলা বৈশাখে সন্তোষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (ডানে) © টিডিসি সম্পাদিত

বাংলা নববর্ষের প্রথমদিন পহেলা বৈশাখে টাঙ্গাইলের সন্তোষে মজলুম মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মাজার জিয়ারত শেষে মাজার চত্বরে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, “১৯৭৯ সালের নির্বাচনের সময় মওলানা ভাসানী জিয়াউর রহমানকে বলেছিলেন, তোমার হাতে আমি ধানের শীষ তুলে দিলাম”। বিএনপি চেয়ারম্যানের এই বক্তব্যের পরই রাজনৈতিক অঙ্গণে বিতর্ক তৈরি শুরু হয়, বিতর্ক এখনও চলছে। 

অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যকে তথ্যগত ভুল হিসেবে দেখছেন। এ প্রেক্ষিতে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস মওলানা ভাসানী পরিবারের সদস্য (মওলানা ভাসানীর নাতি) আজাদ খান ভাসানী, কয়েকজন বিএনপি ও ন্যাপ নেতার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে। তবে আজাদ খান ভাসানী ছাড়া অন্য নেতারা নিজেদের নাম না ব্যবহারে শর্ত আরোপ করেন। 

এসব নেতাদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর তার প্রধান রাজনৈতিক সহচর মশিউর রহমান যাদু মিয়া নিজেদের দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’ বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে তুলে দেন। আর এটা ঘটেছিল মওলানা ভাসানীর নির্দেশিত পথেই। মৃত্যুর আগে টাঙ্গাইলের সন্তোষে ভাসানীর সঙ্গে শেষ সাক্ষাতে যাদু মিয়াকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তার অবর্তমানে যেন অনুসারীরা রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে যেন একটি বৃহৎ নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে। সেই নতুন রাজনৈতিক দলটি তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে কেন্দ্র করে হতে পারে। কারণ জেনারেল জিয়া একজন সৎ ও ভালো মানুষ।  

আজাদ খান ভাসানী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সম্পর্কে আমি ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়েছি। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এই বিষয়ে বিস্তারিত বলব। আমার ফেসবুক ওয়ালে এ বিষয়ে বিভিন্ন বক্তব্য আছে। 

আজাদ খান ভাসানীর ফেসবুক ওয়ালে গিয়ে বিএনপির জন্ম ইতিহাস সম্পর্কে একটি দীর্ঘ লেখা পাওয়া যায়। লেখাটি শাহ আজিজ নামের একজন লেখকের। মশিউর রহমান যাদু মিয়ার এলাকা ডিমলা তারও ঠিকানা। লেখাটিতে শাহ আজিজ লিখেছেন-নীলফামারীর ডোমার বহুমুখী হাইস্কুল মাঠে জিয়া-যাদু এক বিশাল জনসভায় বক্তৃতা করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন ডোমার বিএনপি নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল জব্বার। সভায় উপস্থিত ছিলেন নীলফামারী জেলার তৎকালীন সভাপতি আহসান আহমেদ, জেলা যুবদলের সভাপতি আলমগীর সরকার, ডোমার যুবদলের সভাপতি মুসাব্বের হোসেন মানু, ডোমার ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাংবাদিক সালেম সুলেরি প্রমুখ। 

রাষ্ট্রপতি জিয়া এই সভায় বলেন, আপনাদের সন্তান যাদু মিয়া ধানের শীষ আমাদের উপহার দেওয়ায় তাকে ধন্যবাদ। কৃষি প্রধান বাংলাদেশের প্রিয় প্রতীক ধানের শীষ। মাওলানা ভাসানীর রানিংমেট যাদু মিয়া আজ আমাদের পলিটিক্যাল গাইড।

মওলানা ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর রাজধানী ঢাকার পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়) মারা যান।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী নিজের গড়া আওয়ামী মুসলিম লীগ ত্যাগ করে গঠন করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। কৃষক-শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন এই দলের প্রতীক হিসেবে সরল, জনবান্ধব ও কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে প্রিয় ধানের শীষকে বেছে নেন। কৃষকের সোনালী ফসল, বাংলার চিরচেনা ধানের শীষ-এটাই হয়ে ওঠে ভাসানীর ন্যাপের নির্বাচনী প্রতীক। কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তি ও অধিকারের প্রতীক হিসেবে ভাসানী এই প্রতীকটি বেছে নিয়েছিলেন।

১৯৬৭ সালে ন্যাপ বিভক্তির পর ভাসানীর নেতৃত্বাধীন অংশ ধানের শীষ প্রতীক ধরে রাখে। ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে এই প্রতীক নিয়ে লড়াই করে। ১৯৫৭ সালে জন্মের পর থেকেই ধানের শীষকে প্রতীক ব্যবহার করত ন্যাপ।  

জিয়াউর রহমান ধানের শীষ পেলেন যেভাবে
১৯৭৬ সালে মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর ভাসানী ন্যাপের চেয়ারম্যান হন মশিয়ূর রহমান যাদু মিয়া। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে নীলফামারীর ডোমারের জনসভায় যাদু মিয়াই আনুষ্ঠানিকভাবে ভাসানী ন্যাপের ‘ধানের শীষ’ প্রতীক জিয়াউর রহমানের হাতে তুলে দেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুনের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়া সেই প্রতীকে জেতেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বিএনপি গঠনের পর ভাসানী ন্যাপের বড় অংশ যাদু মিয়ার নেতৃত্বে বিএনপিতে যোগ দেয়, আর এভাবেই ধানের শীষ বিএনপির প্রতীক হয়। ১৯৭৫ সালের শেষ দিকে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়া টাঙ্গাইলের সন্তোষে মওলানা ভাসানীর সঙ্গে দেখা করেন। তখন ভাসানী ধানের শীষের ছড়া দিয়ে জিয়াকে বরণ করেছিলেন; এটাকে অনেকে ‘রাজনৈতিক ইঙ্গিত’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। কিন্তু দলীয় প্রতীক আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর সেটা ছিল না।

বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীক প্রাপ্তির বর্ণনা টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের কিছুদিন আগে প্রয়াত হামিদুর হক মোহনের একটি লেখা থেকে পাওয়া যায়।  

তিনি লিখেছেন, ১৯৭৬ সাল আষাঢ় মাসের শেষ, শ্রাবণের শুরু। ঠিক এমনি একটি সময়ে ন্যাপ ভাসানীর মহাসচিব আমার প্রিয় নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়া হঠাৎ টাঙ্গাইলে আমার ভাড়া বাসায় হাজির। সঙ্গে তার দেহরক্ষী ঢাকার আলিম। সিরাজগঞ্জে ফারাক্কার উপর অনুষ্ঠিতব্য সেমিনার, আমি সেই সেমিনারে একজন বক্তা। আমাকে দ্রুত প্রস্তুত হতে বলে চলে গেলেন যাদু ভাই সন্তোষে হুজুর ভাসানীর সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে। আমি প্রস্তুত, রাত্রিযাপন করতে হবে সিরাজগঞ্জে। হঠাৎ যাদু ভাই ফিরে এসে বললেন মোহন তুই প্রস্তুত? আমি অবাক। এত দ্রুত ফিরে আসার কারণে। যাদু ভাইকে জিজ্ঞেস করাতে উত্তরে বললেন হুজুর ঘুমাচ্ছেন, শরীরটা ভালো নেই, চল সিরাজগঞ্জ থেকে ফেরার পথে হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করব।

যাদু ভাইয়ের প্রাইভেটকারে ভুঞাপুর পৌঁছলাম। সেখান থেকে নৌপথে সিরাজগঞ্জ। সামান্য বিশ্রামের পর শুরু হল সেমিনার। সেমিনার শেষে দলীয় নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক আলোচনা শেষে রাত হয়ে গেল। সিরাজগঞ্জে রাত্রি যাপন করে পরের দিন সকালে লঞ্চ যোগে রওনা করলাম চারাবাড়ি ঘাটে। উদ্দেশ্য হুজুর ভাসানীর সাক্ষাৎ। লঞ্চের দিতলে বসে যাদু ভাই, আমি ও আলিম। তখনকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যাদু ভাই তার অভিজ্ঞতালব্ধ ও তীক্ষ্ণ দুরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রজ্ঞা দিয়ে আলোচনায় মগ্ন।

আমরা দুইজন শ্রোতা। আলোচনায় আগামী দিনে সরকার গঠনের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন এবং আলোচনায় সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা গঠনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করে মন্ত্রিসভায় কে কে থাকতে পারে তার একটা ধারণাও তিনি ব্যক্ত করলেন। সাড়ে ১১টা/১২টা নাগাদ চারাবাড়ি ঘাটে পৌঁছে গেলাম। ওখান থেকে ঘোড়াগাড়ি সহযোগে সন্তোষ হুজুরের হুজরাখানার সামনে হাজির হলাম। হুজরাখানার সামনে আসতেই টাঙ্গাইল জেলা ন্যাপ সভাপতি আব্দুর রহমান সাহেবের (পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের প্রথম মন্ত্রিসভায় ধর্মমন্ত্রী) সাক্ষাৎ পেলাম। তিনি হুজরাখানার বাইরে পায়চারি করছেন আর স্টার সিগারেট টানছেন। যাদু ভাইকে দেখে রহমান ভাই হচকিত হলেন। আমি রহমান ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম বাইরে কেন? হুজুর কি করছেন? উত্তরে রহমান ভাই বললেন, হুজুরের শরীরটা ভালো না তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় আছেন। আমি হুজরাখানায় প্রবেশ করে তাল পাতার পাখা দিয়ে হুজুরকে কিছুক্ষণ বাতাস করার পর হুজুর হঠাৎ চোখ মেলে তাকালেন।

আমাকে জিজ্ঞেস করলেন মোহন তুমি? উত্তরে বললাম হুজুর যাদু ভাই এসেছেন, হুজুর আস্তে ধীরে বলে উঠলেন মশিউর আসছে? আমি বললাম জী হুজুর।
হুজুর সঙ্গে সঙ্গে বললেন মশিউর আসছে? মশিউরকে ডাকো। যাদু ভাই হুজুররাখানার ভিতরে ঢুকলেন সঙ্গে রহমান ভাই। যাদু ভাই বসলেন হুজুরের হুজরাখানায় রক্ষিত জলচৌকিতে, রহমান ভাই মাঝখানে দাঁড়িয়ে, আমি তালপাতার পাখা দিয়ে হুজুরকে বাতাস করছি।

যাদু ভাই হুজুরকে কুশলাদি বিনিময় করতেই হুজুর ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন মশিউর আমার শরীরটা ভালো নেই। আমি কয়েকদিনের মধ্যেই ঢাকার পিজিতে ভর্তি হব, সামনে আমার হুক্কল এবাদ মিশনের সম্মেলন। এই সম্মেলনে আমি ফিরে আসতেও পারি, নাও আসতে পারি।

হয়তো এটাই আমার শেষ যাত্রা। হুজুর আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন। কথাগুলো এখনো আমার কানে ভাসে। হুজরাখানার ভিতর থমথমে পরিবেশ হুজুরের চোখে পানি। হঠাৎ জলচৌকি থেকে যাদু ভাই মওলানা ভাসানীকে জড়িয়ে ধরে শিশুর মত কান্না শুরু করলেন, আমাদের চোখেও পানি। সে এক বিয়োগান্ত দৃশ্য, আমি তার সাক্ষী এখনো বেঁচে আছি। হুজুর আবেগভরা কণ্ঠে বলতে লাগলেন মশিউর সারা জীবন তোমরা আমার সঙ্গে রাজনীতি করেছ, আমি যে তোমাদের কাউকে কিছু দিয়ে যেতে পারলাম না। তুমি যুবক বয়সে নিজ ক্ষমতায় নিজ যোগ্যতায় রংপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলে। নিজ যোগ্যতায় দুইবার পাকিস্তানের এমএনএ হয়েছিলে। সারা বাংলাদেশে অসংখ্য আমার কর্মী নেতারা ত্যাগ স্বীকার করে জেল জুলুম সহ্য করে নিঃস্ব হয়েছে। আমি তাদের কিছুই দিতে পারিনি।

হঠাৎ হুজুর ভাসানী বলে উঠলেন মশিউর তুমি এখন বাংলাদেশের সবচাইতে সিনিয়ার ও যোগ্য নেতা। তোমার সমসাময়িক আর কেউ নেই। আমি দোয়া করে যাচ্ছি তোমাদের জন্য! আমার মৃত্যুর পরপরই তোমরা রাষ্ট্র ক্ষমতায় চলে যাবে! তবে এই ন্যাপ দিয়ে তা সম্ভব নয়!

সবাই মিলে একটি বড় দল করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন জিয়াউর রহমান ছেলেটা ভালো, সৎ, দেশপ্রেমিক পরিশ্রমী, ওর সঙ্গে মিলেমিশে একটা বড় দল গঠন করা। তুমি হবা ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী। তবে তোমার কাছে আমার কিছু চাওয়ার নেই। শুধু আমার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়টাকে দেখবে। এটাই আমার একমাত্র চাওয়া!

হুজরাখানার ভেতর শুরু হয়ে গেল আবারও কান্নার রোল, আবারও হুজুরের চোখে পানি। যাদু ভাই চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন হুজুর আপনি কি সত্যিই চলে যাচ্ছেন আমাদের রেখে? হুজুর কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। নীরব নিস্তব্ধ পরিবেশ। সকলের চোখেই পানি।

এর কয়েকদিন পর হুজুর চলে গেলেন পিজি হসপিটালে, ভর্তি হলেন। চিকিৎসা চলল। এর মধ্যেই সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান বীর উত্তম হসপিটালে হুজুরকে দেখতে এলেন। ভাসানী-জিয়ার একান্ত বৈঠক হয়ে গেল। সেই বৈঠকের বিষয়বস্তু আজও অজানা!

কথোপকথন কিন্তু বিস্ময়করভাবে সত্য, ডাক্তারদের শত নিষেধ সত্ত্বেও তা অগ্রাহ্য করে হসপিটাল থেকেই হুজুর ভাসানী ফারাক্কা লং মার্চের ঘোষণা দিলেন।
লংমার্চ শেষে আবার তিনি পিজি হসপিটাল এ ভর্তি হলেন। ঐ পিজি হসপিটালেই ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর আফ্রো এশিয়া ল্যাটিন আমেরিকার গণ মানুষের নেতা, শত ইতিহাস রচনাকারী শত ইতিহাসের সাক্ষী মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সমগ্র দেশবাসীকে কাঁদিয়ে কৃষক শ্রমিক কামার কুমার জেলে তাঁতি মেহনতি মানুষের নেতা বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা মহান এই নেতা বিদায় নিলেন এই পার্থিব জীবন থেকে।

আমি আগেই উল্লেখ করেছি হুজুর ভাসানী তাঁর মৃত্যুর আগে যাদু ভাইকে জিয়ার সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি বড় দল করার নির্দেশ প্রদানের কথা। এর পেছনে একটা কারণ ছিল।

জিয়াউর রহমান সেনা প্রধান থাকা অবস্থায় একাধিকবার সন্তোষে হুজুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এর মধ্যে দুইদিন আমি সন্তোষ উপস্থিত ছিলাম কিন্তু ওনাদের মধ্যে কি আলোচনা হয়েছে সেটা আমি বলতে পারব না। কারণ ওই সময় আমাকে ওখানে থাকতে দেওয়া হয়নি!

এরপর শুরু হয় যাদু ভাইয়ের হুজুর ভাসানীর নির্দেশিত পথে একটি বড় দল গঠনের প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ঢাকার ডেফোডিল হোটেলে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে যাদু ভাইকে চেয়ারম্যান ও এসএ বারী এটিকে মহাসচিব করে ন্যাপের নতুন কমিটি গঠিত হয়। ওই কাউন্সিলে গঠিত কমিটির আমি সদস্য ছিলাম।

এরপর শুরু হয় জিয়া-যাদু বৈঠকের পর বৈঠক! এর কিছুদিন বাদে ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসের শেষের দিকে বিচারপতি সায়েম স্বাস্থ্যগত কারণে জেনারেল জিয়ার নিকট রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব অর্পণ করে অবসরে চলে যান।

রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর জিয়া জনগণের মতামত গ্রহণের নিমিত্তে ১৯৭৭ সনের ৩০ মে দেশব্যাপী তাঁর পক্ষে-বিপক্ষে হা-না ভোট করে বিপুল জনসমর্থন লাভ করেন এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করার পর গঠন করেন মন্ত্রীর পদ মর্যাদায় একটি উপদেষ্টা পরিষদ।

এরপর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে যাদু ভাইয়ের উদ্যোগী ভূমিকায় প্রেসিডেন্ট জিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় যাদু ভাইয়ের নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের নেতৃত্বে জাগো দল, কাজী জাফরের নেতৃত্বে ইউনাইটেড পিপলস্ পার্টি, শাহ্ আজিজের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ, মওলানা মান্নানের নেতৃত্বে লেবার পার্টি ও রসরাজ মন্ডলের নেতৃত্বে তফসিলি সম্প্রদায় পার্টি নিয়ে গঠিত হয় ৬ দলীয় জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট। এখানে বলে রাখা ভালো সেই ফ্রন্ট সমগ্র বাংলাদেশের প্রত্যেক জেলায়ও গঠিত হয়, তার মধ্যে টাঙ্গাইল জেলায় এই ফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম ন্যাপ সভাপতি আব্দুর রহমান এবং আমি হামিদুল হক মোহন।

এরপর মওলানা ভাসানী নির্দেশিত, ন্যাপ চেয়ারম্যান ও ফ্রন্ট নেতা হিসেবে মশিউর রহমান যাদু মিয়া কর্তৃক প্রদেয় ধানের শীষ প্রতীক প্রেসিডেন্ট জিয়ার হাতে তুলে দেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া সাদরে ধানের শীষ প্রতীক গ্রহণ করেন এবং ধানের শীষ প্রতীক নিয়েই দ্বিতীয়বার ৭৮ সনে ৩ জুন ৬ দলীয় জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট এর পক্ষে ঘোষিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে, জিয়া প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে ভাইস প্রেসিডেন্ট, মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে সিনিয়র মিনিস্টার করে গঠন করেন ৪২ সদস্যের মন্ত্রী পরিষদ।

উল্লেখ্য, ঐ মন্ত্রিসভা গঠনের আগ দিয়ে ইউনাইটেড পিপলস পার্টির এক অংশকে নিয়ে বেরিয়ে যান কাজী জাফর আহমেদ। ইউনাইটেড পিপলস পার্টির বাকি অংশ থেকে যায় ক্যাপ্টেন হালিমের নেতৃত্বে প্রেসিডেন্ট জিয়ার মন্ত্রিসভায়।

নৌ-অবরোধ তুলে না নিলে পাকিস্তানে প্রতিনিধি পাঠাবে না ইরান
  • ১৯ এপ্রিল ২০২৬
নবজাতকের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে বিএমইউতে প্রশিক্ষকদের…
  • ১৯ এপ্রিল ২০২৬
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল পলিটেকনিক শিক্ষার্থীর
  • ১৯ এপ্রিল ২০২৬
অতীতের সরকারের দুর্নীতি-ভুল পলিসিতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখন …
  • ১৯ এপ্রিল ২০২৬
তিন মাস পর ফের নতুন কমিটি জবি শিবিরের
  • ১৯ এপ্রিল ২০২৬
ভাল নেই হাফেজে কোরআন হামিদুর, মস্তিষ্ক থেকে জটিলতা কিডনিতেও
  • ১৯ এপ্রিল ২০২৬