সংরক্ষিত নারী আসন
ছাত্রদল নেত্রী নওরিনের মনোনয়ন সংগ্রহ © টিডিসি ফটো
জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সর্বকনিষ্ঠ প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসম্পাদক জান্নাতুল নওরীন উর্মি। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে তিনি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।
মনোনয়নপত্র সংগ্রহের পর প্রতিক্রিয়ায় নওরীন বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনকে কেবল একটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা হিসেবে নয়, বরং নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি বাস্তবধর্মী সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে মোট ৩৫০টি আসনের মধ্যে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে। ফলে সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব প্রায় ২০ শতাংশ। অথচ বিশ্বে গড় প্রতিনিধিত্ব আরও বেশি। এই বাস্তবতায় সংরক্ষিত আসন নারীদের জন্য একটি প্রয়োজনীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে।’
তিনি আরও বলেন, দেশের সামাজিক কাঠামোতে সাধারণ আসনে নির্বাচন করতে যে রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সাংগঠনিক শক্তি প্রয়োজন, তা তৃণমূলের অনেক নারীর নাগালের বাইরে। এ কারণে সংরক্ষিত আসন নারীদের সংসদীয় রাজনীতি, নীতি নির্ধারণ এবং নেতৃত্ব বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ‘এই প্রেক্ষাপটে সংরক্ষিত আসন নারীদের সংসদীয় রাজনীতি, নীতি নির্ধারণ এবং নেতৃত্ব বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে,’ যোগ করেন তিনি।
নওরীন জানান, দীর্ঘ একযুগ বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় থেকে তিনি মাঠপর্যায়ে মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। ছাত্রদলের চারটি কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাজনীতি এবং দুটি ক্ষেত্রে সক্রিয় সম্পাদক ও এজিএস হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় নারীদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছেন যে সংসদে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব ছাড়া তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন।
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ একযুগ বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় থেকে তিনি মাঠপর্যায়ে মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। ছাত্রদলের চারটি কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাজনীতি ও দুটিতে সক্রিয় সম্পাদক ও এজিএস হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে নারীদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি সংসদে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব ছাড়া তাদের অধিকার, নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন,’ বলেন তিনি।
আন্তর্জাতিক উদাহরণ টেনে তিনি আরও বলেন, ‘মেক্সিকোতে পারিটি আইন কার্যকর হওয়ার পর মাতৃমৃত্যু কমেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর অংশগ্রহণ বাড়লে অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। অথচ বাংলাদেশে এখনো মাতৃমৃত্যু ও নারীর প্রতি সহিংসতার হার উদ্বেগজনক।’
সংসদে নির্বাচিত হলে নারী, শিশু, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং স্বরাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটিগুলোতে সক্রিয়ভাবে কাজ করার ইচ্ছার কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি নারী অধিকার ও সমঅধিকার নিশ্চিত করতে প্রাইভেট মেম্বার বিল উত্থাপন এবং জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়নে ভূমিকা রাখার প্রত্যাশার কথাও উল্লেখ করেন নওরীন।
তিনি বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব সংসদে নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। তরুণদের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত করতে তাদের অংশগ্রহণ জরুরি।’ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে তরুণ ও নারী নেতৃত্বকে সামনে আনার উদ্যোগের প্রতিও তিনি আস্থা প্রকাশ করেন।
তার রাজনৈতিক জীবনের পেছনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে নওরীন জানান, তার পথচলা সহজ ছিল না। ২০২০ সালের ১ মার্চ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী থাকাকালে তিনি হামলার শিকার হন। ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় বলে তিনি জানান। পরীক্ষা শেষে হলে ফেরার পথে ছাত্রলীগের একদল সন্ত্রাসী তাকে মারধর করে গুরুতর আহত করে। দীর্ঘদিন তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। পরবর্তীতে তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন।
ঘটনাটি সে সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে গুরুত্ব পায়। পরবর্তীতে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও তার চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তবে তিনি এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি এবং সেই নির্যাতনের চিহ্ন বহন করছেন বলে জানা যায়।
এ ঘটনার পর তার পরিবার মামলা দায়ের করলেও প্রত্যাশিত সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তে তাকে বহিষ্কার করা হয়, ফলে তিনি আর কখনও ক্যাম্পাসে ফিরতে পারেননি।
সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এখন জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে নিজের অবস্থান তৈরি করতে চান উর্মি। তার মতে, সংরক্ষিত নারী আসন কোনো চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়, বরং মূলধারার নেতৃত্বে পৌঁছানোর একটি সোপান। তিনি বলেন, সমতা প্রতিষ্ঠার আগে ন্যায্যতার সুযোগ তৈরি করা জরুরি এবং এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা দরকার যেখানে নারী, তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সমানভাবে অংশ নিতে পারে।
এর আগে একই দিন বেলা ১১টা থেকে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করতে মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু হয়। মনোনয়ন ফরম বিক্রির উদ্বোধন করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।
এ বিষয়ে রিজভী জানান, আওয়ামী লীগের শাসনামলে যারা নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তাদের মধ্য থেকেই সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থী বেছে নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, বিরোধী দলে থাকার কারণে বিএনপির নারী নেত্রীরা কারাবরণসহ নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাই মনোনয়ন বোর্ড সবদিক বিবেচনা করে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে জুলাই আন্দোলনে ভূমিকা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় সংসদে কার্যকরভাবে কথা বলার সক্ষমতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে বলেও জানান রিজভী।