মোবাইলের স্ক্রিনে বন্দী শৈশব, মাঠভরা বিকেল এখন স্মৃতি, হারিয়ে যাচ্ছে খেলাধুলা

শিশুদের শৈশবের খেলা।

শিশুদের শৈশবের খেলা। © টিডিসি সম্পাদিত

একটা সময় ছিল, বিকেল নামলেই যেন পুরো পাড়া নতুন করে জেগে উঠত শিশু-কিশোরদের আনন্দ চিৎকার আর খেলাধুলায়। স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজতেই বই-খাতা ছুঁড়ে রেখে এক দৌড়ে মাঠে যেত শিশুরা। গ্রামের খোলা মাঠ, বাড়ির উঠান, পুকুরপাড় কিংবা পাড়ার সরু গলি—সবখানেই ছড়িয়ে পড়ত হাসি, চিৎকার আর দৌড়ঝাঁপের উচ্ছ্বাস।

সেই বিকেলগুলো ছিল শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর ঠিকানা। আজ সেই মাঠগুলো অনেকটাই নীরব। শিশুদের দৌড়ঝাঁপের জায়গা দখল করে নিয়েছে মোবাইলের স্ক্রিন। যেন মোবাইলের ছোট্ট স্ক্রিনের মধ্যেই আটকে গেছে শিশুদের শৈশব।
 
প্রযুক্তির এই সময়ে শিশু-কিশোরদের অবসর মানেই এখন মোবাইল গেম, ভিডিও আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে দেখা হওয়ার বদলে দেখা হয় ভার্চ্যুয়াল গেমে। এক সময় যে হাতে মার্বেল, লাটিম কিংবা ঘুড়ির সুতা থাকত, আজ সেই হাতেই স্মার্টফোন। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, আর ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে শৈশবের নির্মল আনন্দও।
 
গোল্লাছুট: এক দৌড়ে ছুঁয়ে ফেলার আনন্দ
গোল্লাছুট ছিল বিকেলের সবচেয়ে প্রাণবন্ত খেলা। কয়েকজন বন্ধু হাত ধরে গোল তৈরি করত, তারপর শুরু হতো দৌড় আর কৌশলের লড়াই। প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দিয়ে নির্দিষ্ট সীমানা ছুঁয়ে ফিরে আসার সেই মুহূর্তে যেন জিতে যেত পুরো পৃথিবী। এই খেলায় ছিল গতি, সাহস, দলগত সমন্বয় আর বন্ধুত্বের অপূর্ব মেলবন্ধন।
 
দাঁড়িয়াবান্ধা: কৌশল আর ক্ষিপ্রতার লড়াই
মাটিতে দাগ কেটে বানানো ছোট ছোট ঘর। সেই ঘরের ভেতর দিয়ে প্রতিপক্ষকে এড়িয়ে যাওয়ার উত্তেজনা ছিল দাঁড়িয়াবান্ধার প্রাণ। কে কখন ফাঁক গলে পার হয়ে যাবে, আর কে ধরা পড়বে-এই টানটান মুহূর্তগুলোই বিকেলকে করে তুলত রোমাঞ্চে ভরা।

বরফ-পানি: ছুঁলেই জমে যাওয়া শৈশব
বরফ-পানি ছিল পাড়ার সবচেয়ে প্রাণখোলা দৌড়ঝাঁপের খেলা। একজন “বরফ” হতো, আর যার গায়ে হাত লাগত সে সেখানেই স্থির হয়ে বরফ হয়ে যেত। অন্য বন্ধু এসে ছুঁয়ে দিলে সে আবার “পানি” হয়ে দৌড়াতে পারত। একজন আরেকজনকে বাঁচানোর এই খেলায় ছিল বন্ধুত্ব, সহযোগিতা আর অফুরন্ত হাসি।

কানামাছি: চোখ বাঁধা, হাসি খোলা 
একজনের চোখ কাপড় দিয়ে বাঁধা, আর বাকিরা চারপাশে দৌড়াচ্ছে। শুধু শব্দ শুনে কাউকে ধরে ফেলার চেষ্টা। ধরা পড়লেই হাসির রোল পড়ে যেত। কানামাছি ছিল এমন একটি খেলা, যেখানে চোখ বন্ধ থাকলেও আনন্দের কোনো সীমা ছিল না।
 
বউচি: এক নিঃশ্বাসের সাহস 
বউচি খেলায় সাহসই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। এক নিঃশ্বাসে প্রতিপক্ষের এলাকায় ঢুকে কাউকে ছুঁয়ে নিজের দলে ফিরে আসার সেই রোমাঞ্চ আজও অনেকের স্মৃতিতে জীবন্ত। এই খেলায় শ্বাস, গতি আর বুদ্ধির সমন্বয় ছিল অসাধারণ।
 
কুমির-ডাঙা: ভয় আর আনন্দের মিশেল 
মাটির এক অংশ ডাঙা, অন্য অংশ পানি। মাঝখানে কুমির। সবাই কুমিরকে ফাঁকি দিয়ে ডাঙা বদলানোর চেষ্টা করছে। কখন যে কুমিরের হাতে ধরা পড়তে হবে, সেই শঙ্কা আর আনন্দ মিলিয়েই জমে উঠত খেলাটি।
 
মার্বেল: ছোট্ট কাঁচের গোলায় বড় সুখ
রঙিন কাঁচের ছোট ছোট মার্বেল ছিল অনেকের শৈশবের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। মাটিতে গর্ত করে নিখুঁত নিশানায় মার্বেল ঢোকানোর চেষ্টা চলত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। জিতে নেওয়া মার্বেলগুলো যত্ন করে পকেটে ভরে রাখার আনন্দ ছিল অন্যরকম।
 
লাটিম: ঘুরতে ঘুরতে কেটে যেত বিকেল
দড়ি পেঁচিয়ে লাটিম ঘোরানো ছিল এক ধরনের শিল্প। কার লাটিম সবচেয়ে বেশি সময় ঘুরবে, তা নিয়ে চলত বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা। মাটিতে ঘুরতে থাকা লাটিম যেন শৈশবের বিকেলকেও ঘুরিয়ে নিয়ে যেত।
 
ডাংগুলি: সামান্য উপকরণে অফুরন্ত আনন্দ 
একটি ছোট কাঠি আর একটি বড় কাঠি- এই দুইটুকুই ছিল ডাংগুলির সম্বল। ছোট কাঠিটিকে যত দূরে পাঠানো যেত, তত বেশি উচ্ছ্বাস। খেলনার অভাব কখনোই আনন্দের অভাব হতে দেয়নি।
 
ঘুড়ি ওড়ানো: আকাশজুড়ে শৈশবের স্বপ্ন
শরতের নীল আকাশে রঙিন ঘুড়ির মেলা ছিল এক অন্যরকম উৎসব। নিজের ঘুড়িকে সবচেয়ে উঁচুতে তুলে দেওয়া কিংবা অন্যের ঘুড়ির সুতা কেটে দেওয়ার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলেও ঘরে ফিরতে মন চাইত না।

এছাড়াও কুত-কুত, সাতচারা, সাত পদ, ফুল টুক্কা ছিল অধিক জনপ্রিয়।

আজকের শিশু-কিশোরদের বড় একটি অংশ ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল গেমে ডুবে থাকে। পাবজি, ফ্রি ফায়ার, মোবাইল লিজেন্ডসসহ নানা অনলাইন গেম তাদের অবসরের প্রধান সঙ্গী হয়ে উঠেছে। বাস্তবের মাঠের পরিবর্তে ভার্চ্যুয়াল জগতই এখন তাদের খেলাধুলার নতুন ঠিকানা।
 
এর প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘ সময় মোবাইলের পর্দার সামনে কাটানোর ফলে শিশুদের শারীরিক সক্রিয়তা কমছে, চোখের সমস্যা ও ঘুমের ব্যাঘাত বাড়ছে, মনোযোগের ঘাটতি এবং গেমের প্রতি আসক্তির ঝুঁকিও বাড়ছে। একই সঙ্গে কমে যাচ্ছে বন্ধুত্ব, দলবদ্ধভাবে কাজ করার অভ্যাস, ধৈর্য, সহমর্মিতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে বেড়ে ওঠার সুযোগ।
 
শিশু বিকাশ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা মার্কিন মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক পিটার গ্রে মনে করেন, অবাধ খেলাধুলা শিশুদের মানসিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাঁর গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের মুক্ত খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়ার সঙ্গে উদ্বেগ, হতাশা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার প্রবণতাও বেড়েছে। 

শৈশবের খেলাগুলো শুধু বিনোদন ছিল না, এগুলো ছিল জীবন শেখার প্রথম পাঠশালা। গোল্লাছুট শিখিয়েছে দলবদ্ধতা, দাঁড়িয়াবান্ধা শিখিয়েছে কৌশল, কানামাছি শিখিয়েছে বিশ্বাস, আর মার্বেল-লাঠিম শিখিয়েছে ধৈর্য ও মনোযোগ। প্রযুক্তি আমাদের জীবনের অংশ, কিন্তু প্রযুক্তির ভিড়ে যদি মাঠভরা বিকেল হারিয়ে যায়, তাহলে হারিয়ে যাবে একটি প্রজন্মের শৈশবের সবচেয়ে নির্মল স্মৃতিও।

শাবিপ্রবিতে নারী শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্ত, বহিরাগতকে আটক করে …
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মাউশি ও সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অতী…
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ট্রেনে কাটা পড়ে অজ্ঞাত যুবকের মৃত্যু 
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিএসএফের গুলিতে মৃত্যু, ৪০ ঘণ্টা পর আশাদুলের মরদেহ হস্তান্তর
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৯ মাসের শিশুকে নিথর দেখে স্বজনের ছোটাছুটি-আর্তনাদ, পিআইসিইউ…
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
 ১২০০ পিস ইয়াবাসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ
  • ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
X
UPTO
100%
MERIT BASED
SCHOLARSHIP
ADMISSION OPEN FOR
FALL 2026
Application Deadline Wednesday, 16 Sept 2026
Apply Now

Admission Test Schedule

  • Test Date: Friday, 18 Sept 2026
  • Written Exam: 10:00 – 11:00 AM
  • Oral Viva: 11:30 AM onwards

Programs Offered

  • BBA
  • Economics
  • Agriculture
  • English
  • CSE
  • EEE
  • Civil
  • Mechanical
  • Tourism & Hospitality
01810030041-9