১৬ কোটি মানুষের ৪৮ কোটি ফ্রি মাস্ক চাই

১৬ কোটি মানুষের ৪৮ কোটি ফ্রি মাস্ক চাই
  © ফাইল ছবি

মহামারি নিয়ন্ত্রণে একই কৌশল সব দেশের জন্য কার্যকর নয়। যে কৌশল আমেরিকা-ইউরোপের জন্য প্রযোজ্য, বাংলাদেশের জন্য তার ফল হতে পারে উল্টো। সুতরাং করোনা মহামারি মোকাবিলায় আমাদের দেশের জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় কি হতে পারে তা নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি সে অনুযায়ী কার্যকরি ব্যবস্থা নেয়া জরুরী।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য অবকাঠামো, কালচার, শিক্ষার হার, রোগব্যাধি সম্পর্কে সচেতনতা, আইন মেনে চলার প্রবনতা ও মানুষের সার্বিক আচরণ ইত্যাদি বিষয় আমলে নিতে হবে। করোনার ভয়াবহ পরিস্থির মাঝেও দেশের অধিকাংশ মানুষের স্বাস্থ্যবিধি এবং চলাচলে নিষেধাজ্ঞা না মানার প্রবণতা প্রমাণ করে দেশের মানুষ স্বাস্থ্য সম্পর্কে মারাত্মক অসচেতন। একইসাথে আইন বা সরকারি কোন নির্দেশনা মানতে উদাসীন।

আমার মতে, করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রনে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকরী পন্থা হবে তিন স্তর বিশিষ্ট উন্নত কাপড়ের মাস্ক সকলের জন্য ফ্রিতে বিতরণ করা। সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্কে দেশে বহুলভাবে ব্যবহৃত হলেও এ ধরনের মাস্কগুলো নিম্নমানের এবং করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে খুব একটা কার্যকরি নয়। কাপড়ের মাস্ক তার তুলনায় অনেক বেশী কার্যকর এবং আরামদায়ক। কাপড়ের মাস্কের অন্য সুবিধা হল এটি ধুয়ে এবং শুকিয়ে বারবার ব্যবহার করা যায়।

ড. মো. আজিজুর রহমান

গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। দেশে রয়েছে চার হাজারেরও বেশী গার্মেন্টস কারখানা। সুতরাং ১৬ কোটি মানুষের জন্য ৩২ কোটি মাস্ক (সকলের জন্য তিনটি করে) দ্রুত তৈরি এবং বিতরণ করা খুব কঠিন কাজ নয়। একজনের তিনটি কাপড়ের মাস্ক থাকলে সেগুলো প্রতিদিন নিয়মিত ধুয়ে পরিষ্কার করে পরতে সুবিধা হবে। নোংরা মাস্ক ব্যবহার হিতে বিপরীত হতে পারে। ফ্রিতে মাস্ক পেলে সবাই তা পরতে উৎসাহিত হবে এবং মাস্ক না পরলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া সহজ এবং মানবিক হবে।

ফলে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কল-কারখানা, শপিং মল, বাজার-ঘাট সব চালু করে দেয়া যাবে। শুধু নিশ্চিত করতে হবে সকল মানুষ যাতে বাসা থেকে বের হলে অবশ্যই মাস্ক যথাযথভাবে পরে বের হয়। মাস্ক না পরলে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে। পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি যেমন- শারীরিক দূরত্ব ও ঘন ঘন হাত ধোয়া। পর্যটন কেন্দ্র, সামজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বাজারগুলোতে জনসমাগম নিয়ন্ত্রন করতে হবে। অনলাইনে পণ্য ক্রয় এবং হোম ডেলিভারি বাড়াতে হবে।

দেশের ১৬ কোটি মানুষের জন্য ৪৮ কোটি উন্নতমানের মাস্ক তৈরি ও বিতরণ এতে খরচ হবে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা (ত্রিশ টাকা করে দাম ধরে)। ব্যবসায়ী সংগঠন ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের (ডিসিসিআই) হিসাব অনুযায়ী একদিন হরতাল বা বড় ধরনের দুর্যোগের কারণে কলকারখানা ও দোকান বন্ধ থাকায় দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হয় সামগ্রিক অর্থনীতি। তার মানে একদিন যে আর্থিক ক্ষতি হয় তার কম টাকাতেই সম্ভব করোনার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ।

করোনা নিয়ন্ত্রণে আসলে শুধু আর্থিক ক্ষতি থেকে দেশ রক্ষা পাবে তা নয়। এক বছরের বেশী সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে দেশের শিক্ষার যে সার্বিক ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে উঠতে অনেক বেগ পেতে হবে।

বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ি দেশের প্রায় ৪০ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ থাকায় এর উপর নির্ভরশীল প্রায় দশ লাখ শিক্ষক-কর্মচারি মানবেতর জীবনযাপন করছেন। স্কুল-কলেজের অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। শিক্ষায় বৈষম্য তৈরি হয়েছে। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকলে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর চাপ কমবে। স্বাস্থ্য খাতের একটা বড় অংশ এখন খরচ হচ্ছে করোনা টেস্ট এবং চিকিৎসায়। করোনা রোগীর চাপ সামলাতে না পেরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখন ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

গত কয়েকদিনে করোনা শনাক্ত ও মৃত্যুর হার সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এ অবস্থা উত্তরণে সরকার চলমান ঢিলেঢালা লকডাউনের শেষ হওয়ার পর পুনরায় ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের কঠোর লকডাউনের ঘোষণা দিয়েছে। এ সময়ে জরুরি সেবা ছাড়া সবধরনের সরকারি-বেসরকারি অফিস, আদালত, শিল্পকারখানা, মার্কেট-দোকানপাট, যানবাহনসহ সবকিছু বন্ধ রাখার চিন্তা করা হয়েছে। এর ফলে এক সপ্তাহে দেশের কি পরিমাণ ক্ষতি হবে তা অনুমেয়।

তবে, এক সপ্তাহের লকডাউনের পরও অবস্থার উন্নতি না হলে হয়তো সরকার বাধ্য হবে এর সময়সীমা বাড়াতে। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমানিত যে করোনার ভয়াবহ পরিস্থিতি সামলাতে লকডাউন বেশ কার্যকর (ল্যানসেট, ই-ক্লিনিক্যাল মেডিসিন, ২০২০)। কিন্তু, এক সপ্তাহের লকডাউন তেমন কোন কাজে আসবে না কারণ, ল্যানসেট ই-ক্লিনিক্যাল মেডিসিনে প্রকাশিত একটি গবেষণাসহ আরও কয়েকটি গবেষণা বলছে কঠোর লকডাউনের সুফল পেতে ১৪ থেকে ১৮ দিন পর্যন্ত লেগে যাবে।

সুতরাং, বর্তমান পরিস্থিতিতে কমপক্ষে ১৪ দিনের একটি কঠোর লকডাউনের বিকল্প নেই। এর পাশাপাশি দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভাইরাস প্রতিরোধী তিন স্তর বিশিষ্ট উন্নতমানের মাস্ক তৈরি শুরু করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে এবং লকডাউনের সুফল পাওয়ার পরপরই শুরু করতে হবে ফ্রি মাস্ক বিতরণ, ব্যবহার ও অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মানার উপর কঠোর নজরদারি। এর ফলে দেশ ভবিষ্যতে আরও লকডাউনের হাত থেকে বাঁচবে। বাঁচবে দেশের মানুষ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অর্থনীতি।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ