বিদেশে গেলেই ভাগ্য পরিবর্তন হবে, এটি একটি ভুল ধারণা

বিদেশে গেলেই ভাগ্য পরিবর্তন হবে, এটি একটি ভুল ধারণা
আমিনুল ইসলাম।

জানি না, কি করে আমাদের সমাজে এই ধারণা তৈরি হয়েছে। তবে অনুমান করতে পারি গ্রাম এলাকায় যারা একটু ভালো অবস্থায় আছে, তাদের হয়ত পরিবারের কেউ না কেউ বিদেশে থাকে। এই জন্য হয়ত এই ধারণা তৈরি হয়েছে। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে বিদেশে চলে আসলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে?

কাল এক মেয়ের সাথে কথা বলছিলাম। এই মেয়ের কথা শুনতে আমার একদম ভালো লাগেনি। বলতেই হচ্ছে মোটেই ভালো লাগেনি। আমি তাকে জিজ্ঞে করেছি তুমি বিদেশে কেন আসতে চাও?

দেশে আমার কোন পিছুটান নেই। মেয়েটির বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই। তাই হয়ত তার মনে হয়েছে দেশে আর পিছুটান নেই। বিদেশে গিয়ে সেটেল হওয়াই ভালো।

এটি একান্ত'ই তার নিজস্ব ধারণা। আমার এই নিয়ে কোন আপত্তি নেই। গত পরশু পত্রিকায় পড়লাম ১৪ বছরের এক মেয়ের বয়েস ২৫ বছর দেখিয়ে বিদেশে পাঠানো হয়েছিলো।

মেয়েটির ভাগ্য কি পরিবর্তন হয়েছিলো? না, মেয়েটিকে দেশে ফিরতে হয়েছে মৃত লাশ হয়ে। আচ্ছা, কারো কাছে কি কোন ধারণা আছে বিদেশে গিয়ে কতো ভাগ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করেছে?

একটা সময় হয়ত কিছুটা হলেও সম্ভব ছিল। কিন্তু বর্তমানে কি এটা সত্যিই সম্ভব? মধ্যপ্রাচ্যের কথা ধরা যাক। মধ্য প্রাচ্যে তো বাংলাদেশের লাখ লাখ শ্রমিক কাজ করে। আমার ইচ্ছে আছে জীবনের কোন একটা সময় এই শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই শ্রমিকদের যদি জিজ্ঞেস করা হয় আপনারা কি আপনাদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পেরেছেন? কতো ভাগ আসলে বলবে হ্যাঁ, পেরেছি। আমরা খুব সুখি!

আমার তো ধারণা উত্তরটা হবে এমন না, নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারিনি। দিন রাত কাজ করে, খেয়ে-না খেয়ে, ছোট্ট একটা গুদাম ঘরে থেকে দেশে পরিবারের জন্য টাকা পাঠাই। পরিবারের ভাগ্য কিছুটা পরিবর্তন হয়ত হয়েছে।

কিন্তু নিজের ভাগ্য? এই শ্রমিকদের শারীরিক-মানসিক অবস্থা কেমন; এই নিয়ে কি কেউ কখনো চিন্তা করেছে? এই কষ্ট যদি দেশে করার সুযোগ থাকতো, তাহলে হয়ত উত্তর গুলো ভিন্ন হতো।

এবার আসা যাক ইউরোপ-আমেরিকায় থাকা বাংলাদেশিদের প্রসঙ্গে। আমি আমার অনেক লেখায় বলেছি এবং বলতেই থাকবো আমরা যারা ইউরোপ-আমেরিকায় থাকছি দূর থেকেই কেবল মনে হয় আমাদের জীবন অনেক রঙিন।

ইউরোপ-আমেরিকায় কি লাখ লাখ, কোটি কোটি টাকা রোজগার করা যায়? আপনারা যারা ইউরোপ-আমেরিকায় আছেন, বুকে হাত রেখে বলতে পারবেন আপনারা একেক জন হোটেল, রেস্টুরেন্ট কিংবা ভালো ভালো চাকরি করে বিরাট বড়োলোক হয়ে গিয়েছেন! এটা কি আদৌ সম্ভব?

বুঝতে পারলাম নিরাপদ জীবনের আশায় অনেকেই ইউরোপ আমেরিকায় যায় কিংবা আসতে চায়। কিংবা পরবর্তী প্রজন্ম যাতে নিরাপদে থাকতে পারে এই একটা আশা আসলে অনেকেরই আছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে বছরের পর বছর ইউরোপ-আমেরিকায় থাকা কিংবা এই সব দেশের নাগরিক হয়ে যাওয়া এই সব বাংলাদেশিরা কি বুকে হাত রেখে বলতে পারবে নিজ দেশ, বন্ধু-বান্ধব পরিবার, আত্মীয়-স্বজন রেখে বিদেশে এরা সুখি?

আমি জানি অনেকেই এসে বলবেন তাহলে আমি দেশে ফেরত যাচ্ছি না কেন? দেখুন আমার পরিবারে কেউ কোন দিন বিদেশে এসে আজীবন থাকেনি। আমিও থাকবো না।

আমার বোনের মেয়ে আমেরিকায় গিয়ে মাস্টার্স শেষ করে এক দিনও বেশি থাকেনি। এই করোনার সময়ও তাকে আমেরিকায় আঁটকে রাখা যায়নি। পাশ করার সঙ্গে সঙ্গে দেশের ফ্লাইট ধরেছে।

আমার ইমিডিয়েট বড় বোন, তার মেয়ে এবং তার জামাই তো আমার এই শহরেই থাকছিল শিক্ষা ছুটি নিয়ে। ছুটি শেষ হবার এক মাস আগেই এই করোনা কালে ওরা দেশে চলে গিয়েছে। ওদেরকেও আঁটকে রাখা যায়নি।

আমি নিজেও দেশে চলে আসবো। আমার একান্ত কিছু ব্যক্তিগত কারণে হয়ত আমাকে থাকতে হচ্ছে। যেটা কারো সঙ্গে ভাগাভাগি করতে চাইছি না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে কি বিদেশে আসা উচিত না? কেন উচিত হবে না। অবশ্যই উচিত হবে। আপনি কিছু সময়ের জন্য পড়তে কিংবা জ্ঞান অর্জন করতে আসতে পারেন। আপনার যদি দেশে কিছু করার না থাকে; কোথাও কিছু হচ্ছে না; কিংবা দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে, এই ধরনের কিছু হলে আপনি বিদেশে আসেন। সেটাও বৈধ উপায়ে, অনেক চিন্তার পর।

দেশে যদি কিছু করে খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকা যায়; তাহলে সেখানেই থাকুন। আমি জানি বাংলাদেশে হাজারো সমস্যা আছে।

বিশ্বাস করুন, পৃথিবীতে এমন দেশ পাবেন না, যেখানে সমস্যা নেই। সমস্যাগুলো বিদেশে আসার পর যত দিন যেতে থাকবে, তত প্রকট হতে থাকে। একটা সময় আর সম্ভব হয় না দেশে ফেরত যাবার। বিদেশে সেটেল হবার আশায় কিংবা নেশায় যেই মানুষ গুলো মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বছরের পর বছর অমানবিক পরিশ্রম করে বেড়াচ্ছে, বিশ্বাস করুন এদের ৮০ ভাগ কোন না কোন মানসিক সমস্যায় ভুগছে।

বুকে হাত দিয়ে কেউ এরা বলতে পারবে না এরা সুখি! আর এদের সবার কি কোটি কোটি টাকা? আচ্ছা, আপনারা যারা ইউরোপ-আমেরিকায় আছেন; আপনারা কি একটু দয়া করে বলবেন- আপনাদের আসলেই কোটি কোটি টাকা?

দেখুন, ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে নিজের থাকার জন্য একটা এপার্টমেন্ট, একটা গাড়ি; এইসব এমনকি ভিক্ষুকেরও থাকে! দৈনিক লেবারের কাজ করা মানুষটারও থাকে। আমি কিন্তু কোন কাজকে ছোট করছি না। ব্যাপারটা বুঝানোর জন্য বলছি।

অফিসের ক্লিনার কিংবা সুইপার কিন্তু এখানে গাড়ি করেই কাজ করতে আসে। রাস্তায় ভায়োলিন বাজিয়ে ভিক্ষা করার মানুষটাও কিন্তু গাড়ি করেই ভিক্ষা করতে আসে! এদেরও থাকার একটা ছোট জায়গা আছে কিংবা এপার্টমেন্ট আছে।

এইসব দেশে এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। এখন আপনি যদি দেশে বসে ভাবেন ওরে বাবা, গাড়ি আছে, বাড়ি আছে; সে তো বিশাল বড়লোক! তাহলে তো ভুল হবে। এই মানুষটারই হয়ত ঢাকা শহরে একটা এপার্টমেন্ট কিনতে পুরো জীবন কাটিয়ে দিতে হবে! কারন এই পরিমাণ অর্থ হয়ত তার নেই। আর আস্ত একটা বাড়ি? সেটা আসলে দুই প্রজন্মেও সম্ভব হবে কিনা সন্দেহ!

অন্য সব কিছুর কথা বাদ দিলাম, ১৭ বছর বিদেশে থেকে পড়াশুনা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পরও যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে কিংবা বাসে উঠলে স্রেফ গাঁয়ের রঙের কারনা নানান সময়ে নানান সব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়; সেটা না হয় আর না'ই বললাম! বিশ্বাস করুন, এটাই বাস্তবতা।

এইসব দেশে আপনি খুব ছোটখাটো একটা চাকরি করলেও গাড়ি-বাড়ি কিনে ফেলতে পারবেন। ব্যাংক আপনাকে সেই সাহায্যটুকু করবে। এটা একটা ভালো দিক। তার মানে এই না, এই দেশের প্রেক্ষিতে আপনি ভালো আছেন! এই দেশে আপনি দরিদ্র'ই!

আর আমেরিকায়? আপনাদের কারো কি জানা আছে, শুধু মাত্র বাসা ভাড়া ঠিক সময়ে দিতে না পারার জন্য প্রতিদিন কতো মানুষ আমেরিকায় হোমলেস হচ্ছে?

কিছু করতে হবে না, স্রেফ ইউটিউবে গিয়ে আমেরিকান পোভার্টি লিখে সার্চ করুন; পেয়ে যাবেন উত্তরটা। আর আপনি ভাবছেন- আমেরিকায় গিয়ে ভাগ্য পরিবর্তন করে ফেলতে পারবেন! এতো সহজ নয় সব কিছু।

বিদেশে থাকা পাত্র মানেই কি ভালো? বিদেশের সিটিজেনশিপ আছে। ওয়াও! রঙিন জীবনের স্বপ্নে মেয়েটাকে দিয়ে দিলেন বিয়ে সিটিজেন কোন ছেলের কাছে। এই ছেলে বিদেশে কিভাবে তার অতীত জীবন কাটিয়েছে কিংবা কিভাবে বর্তমান জীবন কাটাচ্ছে; এর কোন খোঁজ কি নিয়েছেন?

বিদেশের জীবনও এতো সোজা না। অনেক কঠিন! এরপরও বিদেশে আসতে চাইলে আসুন। পড়াশুনা, জ্ঞান অর্জন কিংবা কাজের জন্য বিদেশে আসতে চাইলে আসুন।

শুধু মনে রাখতে হবে বিদেশ মানেই ভাগ্য পরিবর্তন নয়। নানান সব বাস্তব পরিস্থিতির মাঝ দিয়েই সবাইকে টিকে থাকতে হয়। দেখা যায় একটা জীবন পার হয়ে গিয়েছে কেবল এই টিকে থাকার লড়াই। এই ধারণাটা মাথায় নিয়েই আসুন। নইলে এসে যে ধাক্কটা খাবেন, সেটা হয়ত সহ্য করা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না!

দূর থেকে পাশের বাড়ির জানাল দিয়ে সবাইকে সুখি'ই মনে হয়। বাস্তব বুঝা যায়- কাছে গেলে।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ