মাস্টার্স পাস কেরানিকে একদম ভিসির দায়িত্ব!

ঢাবি অধ্যাপক
কামরুল হাসান মামুন

আমাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় শের-এ বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন রেজিস্ট্রারকে উপাচার্যের দায়িত্ব দিয়ে প্রমাণ করলো যে, যতদিন বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে ততদিন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ভবিষ্যত নাই।

একজন রেজিস্ট্রারকে রাজধানীর একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব দিয়ে আমাদের মন্ত্রণালয় প্রমান করেছে তারা আসলে বিশ্ববিদ্যালয় কি সেই জিনিসটাই ধারণ করতে পারে না। পারবে কীভাবে? সত্যিকারের বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা অধ্যাপক হন তাদের ন্যূনতম যোগ্যতা হলো পিএইচডি প্লাস পোস্ট-ডকই না অনেক মাস্টার্স ও পিএইচডি ছাত্রছাত্রী supervise করার অভিজ্ঞতা (অর্থাৎ গবেষণার অভিজ্ঞতা)! এর আগে আমি এও বলেছি বাংলাদেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরাও ‘‘বিশ্ববিদ্যালয় কি’’ তা তাদের ধারণাতে ধারণ করার জন্য যেই প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা দরকার সেটি নেই। কারণ যারা তাদের নিয়োগ দেয় তাদেরই যদি ধারণা না থাকে তারা কিভাবে সঠিক মানুষকে খুঁজে পাবে?

আর আলোচ্য ক্ষেত্রে মাস্টার্স একজন কেরানীকে একদম ভিসির দায়িত্ব? আমি যতটুকু জানি ওখানে একজন প্রো-উপাচার্য আছেন এবং আছেন একজন কোষাধ্যক্ষ। দুজনেই অধ্যাপক এবং দুজনেরই পিএইচডি আছে। দায়িত্ব যদি দিতেই হয় এই দুজনের একজনকে দিতে পারতো। অথবা কোন ফ্যাকাল্টির ডিনকে দিতে পারতো। এটাই ছিল স্বাভাবিক। মন্ত্রণালয় কি করল? তাদের স্বগোত্রীয় একজন কাইন্ড অফ আমলাকে উপাচার্যের দায়িত্ব দিল এবং একই সাথে চরম কান্ডজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছে। এটার কোন ক্ষমা হয় না।

আমার কথা হলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং উপ-মন্ত্রীর দায় কতটুকু? তারাও কিন্তু এই অক্ষমতার দায় এড়াতে পারবে না। এইজন্যই বলি এই দেশটা আসলে রসাতলে যাচ্ছে। অযোগ্যরাই সব জায়গায় নেতৃত্ব দিচ্ছে আর যোগ্যরা চরম অবহেলার শিকার হচ্ছে।

আমি আমার ক্ষুদ্র জীবনে এমনও দেখেছি কেবল পিএইচডি করে দেশে ফিরে এসেছে। হয়ত বছর খানেক ক্লাস নিয়েছে অমনি তাকে কোন এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য বা উপউপাচার্য বানিয়ে দিয়েছে। কেন? কারণ ক্ষমতাসীন দলের সাথে অংকটা মিলে গেছে। এখানে দেশ বা ছাত্রছাত্রীরা উপকৃত হবে কিনা সেইদিকে কিন্তু বিন্দুমাত্র নজর নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একজন শিক্ষক পিএইচডি করে আসলে তার সেই লব্ধ অতিরিক্ত জ্ঞান ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বিতরণ করে তার জ্ঞানকে প্রজ্ঞায় পরিণত করবে। সময়ের সাথে অভিজ্ঞ হবে। কিন্তু এরাতো সেই সময় পায়নি। বিদেশ থেকে পিএইচডি শেষে এসেই বিশাল দায়িত্ব। সেতো শিক্ষকই হতে পারার সময় পেল না বা তাকে সেই সময় দেওয়া হলো না। একেতো দেশে পাইকারি হারে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হচ্ছে। আর একই সাথে সেইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে যেনতেন মানুষদের ভিসি প্রোভিসি বানানো হচ্ছে।

বেশ কিছুদিন ধরে একটি সংবাদ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে দেখছি যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রো-উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ও স্বজনপ্রীতির নানা অভিযোগ ইউজিসি তদন্ত করবে। এই উদ্যেশে আমাদের ইউজিসি তাদের ডেকেছেনও। কিন্তু উনাদের কেউই তদন্তে সারা দিয়ে শুনানিতে আসেননি। ভাবা যায় একটি খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ। তারপরও তারা স্বপদে সদর্পে আছেন। লজ্জা সরম কি দেশ থেকে উঠে গেল? এরা ছাত্রছাত্রী ও সহকর্মীদের সামনে মুখ দেখায় কিভাবে?

আসলে আমাদের মন্ত্রণালয় এখন তাদেরকেই ভিসি বা প্রোভিসি হিসাবে নিয়োগ দেন যাদের চামড়া মোটা। যাদের লজ্জা সরম বলতে কিচ্ছু নেই। কারণ তারাই সবচেয়ে প্রমাণিত আজ্ঞাবহ মানুষ হয়। এদের দিয়ে যেকোন স্বার্থ হাসিল করানো যায়। এরা সরকার বা মন্ত্রণালয়ের আজ্ঞাবহ হতে এক পায়ে সর্বদা খাড়া থাকে। এই হলো বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের হালচাল। [ফেসবুক থেকে]

পড়ুন: দুই সেমিস্টার এক করে পরীক্ষা নেওয়ার চিন্তা ঢাবির

লেখক: অধ্যাপক, পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ