অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান © সংগৃহীত
বাংলাদেশের উন্নয়ন-আলোচনার কেন্দ্রীয় ইস্যুসমূহের মধ্যে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রসঙ্গটি অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ। মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদকে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, বৈশ্বিক শ্রমবাজারের প্রতিযোগিতা এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির বাস্তবতায় শিক্ষা নীতির চরিত্র বদলে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষা এখন আর শুধু সনদ অর্জনের প্রক্রিয়া নয়, বরং উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন ও নাগরিক সক্ষমতা তৈরির প্রধান উপায়। এই প্রেক্ষাপটে গত ৬ ফেব্রুয়ারি চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান কর্তৃক ঘোষিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ে যে বিস্তৃত প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে, তা নীতিগতভাবে একটি সমন্বিত সংস্কার কাঠামোর ইঙ্গিত বহন করে। এতে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা থেকে গবেষণা, ডিজিটাল রূপান্তর থেকেধর্মীয় ও মূল্যবোধ শিক্ষা—সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা রয়েছে।
বিএনপির ইশতেহারের একটি বিশেষ দিক হলো শিক্ষাকে ‘জীবনমুখী’ ও ‘কর্মমুখী’ করার সুস্পষ্ট ঘোষণা। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ—এটি বাস্তবজীবন ও শ্রমবাজারের সঙ্গে পর্যাপ্তভাবে সংযুক্ত নয়। এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা স্বনির্ভরতা ও কর্মসংস্থানের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। সিলেবাস এমনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে যাতে এসএসসি বা এইচএসসি পর্যায় পর্যন্ত পড়াশোনা করেও একজন শিক্ষার্থী বাস্তব দক্ষতা নিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে পারে। পাশাপাশি বাংলা-ইংরেজির সঙ্গে আরবি, জাপানিজ, কোরিয়ান, ইতালিয়ান, ম্যান্ডারিনসহ তৃতীয় ভাষা শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা বৈশ্বিক শ্রমবাজারমুখী মানবসম্পদ তৈরির কৌশল হিসেবে বিবেচিত।
প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নীতিগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গবেষণায় প্রমাণিত—প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার মান উন্নত না হলে পরবর্তী সব স্তরের অর্জন দুর্বল হয়ে পড়ে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, আকর্ষণীয় বেতন, সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি এবং মৌলিক মূল্যবোধ শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার প্রস্তাব শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি মজবুতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বজনীন সুযোগ এবং আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট (ইসিডি) নিশ্চিত করার অঙ্গীকার শিশুর জ্ঞানীয় ও সামাজিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব রাখবে।
শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের অঙ্গীকারকে একটি বড় নীতিগত প্রতিশ্রুতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে ৪–৬ শতাংশ ব্যয় প্রয়োজন, অথচ বাংলাদেশে এই হার ঐতিহাসিকভাবে কম। প্রস্তাবে উল্লেখ আছে, অতিরিক্ত বরাদ্দ কেবল অবকাঠামো নির্মাণে নয়, বরং শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, বিশেষ করে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে ব্যয় করা হবে। অতীতে অবকাঠামোকেন্দ্রিক ব্যয়ের কারণে মানোন্নয়ন সীমিত থাকার অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে এটি একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত।
ডিজিটাল শিক্ষা সম্প্রসারণে একাধিক উদ্যোগ—“ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব”, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ফ্রি ওয়াই-ফাই, পৃথক শিক্ষা টিভি চ্যানেল এবং এডু-আইডি—একটি প্রযুক্তিসমর্থ শিক্ষাব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। প্রতিটি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের জন্য ডিজিটাল পরিচয় চালু হলে শেখার অগ্রগতি, ঝরে পড়া এবং দক্ষতার ঘাটতি ট্র্যাক করা সহজ হবে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করে তিন বিষয়ের ওপর: মানসম্মত কনটেন্ট, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, এবং রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতার ওপর। তবে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে মানসম্মত কনটেন্ট, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতার ওপর। গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া এবং ব্যবহার দক্ষতা গড়ে তোলা ও হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
ইশতেহারে আনন্দময় শিক্ষা, দলগত কাজ, ব্যক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন, মননশীলতার বিকাশের জন্য ক্রীড়া ও সংস্কৃতি শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা শিক্ষার সামগ্রিকতা বাড়ানোর দিক নির্দেশ করে। এটি শিক্ষাকে কেবল পরীক্ষাকেন্দ্রিক না রেখে ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব, সামাজিকতা ও নৈতিকতা বিকাশের মাধ্যমে ‘সুনাগরিক’ তৈরির ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একইভাবে ‘ওয়ান চাইল্ড, ওয়ান ট্রি’ বা পোষ্য প্রাণী পালন এবং গ্রীষ্মের ছুটির কর্মমুখী ব্যবহার ইত্যাদি শিক্ষার্থীর মধ্যে দায়িত্ববোধ ও পরিবেশ সচেতনতা তৈরির সহায়ক হতে পারে। অবশ্য এসব কর্মসূচি বাস্তব প্রয়োগে প্রশাসনিক প্রস্তুতি প্রয়োজন হবে।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা, যৌথ গবেষণাগার, কর্পোরেট শিক্ষানবীশ আইন, ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপ সম্প্রসারণ, সিড ফান্ডিং ও ইনোভেশন গ্রান্টের প্রস্তাব উচ্চশিক্ষাকে অর্থনৈতিক উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াস নির্দেশ করে। বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ও শিল্পখাতের দুর্বল সংযোগ দূর করতে কাঠামোগত প্রণোদনার কথা বলা হয়েছে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন, গবেষণা তহবিল বণ্টনে স্বচ্ছতা, পেটেন্ট নীতি এবং বেসরকারি খাতের আস্থাভিত্তিক অংশগ্রহণের ওপর।
উচ্চশিক্ষার কাঠামোগত সংস্কারের অংশ হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক বিভাজন, ইউজিসির ক্ষমতায়ন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে করমুক্ত রাখা এবং আবাসন ও লাইব্রেরি সমস্যার সমাধানের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তবে গবেষণার নিম্নমান, আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকা এবং মেধাপাচারের মতো দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাও উল্লেখযোগ্য।
মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার যে বিস্তৃত কর্মসূচি, তা সম্ভবত ইশতেহারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে সাহসী অংশ। কওমি সনদের স্বীকৃতির পূর্ণ বাস্তবায়ন, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য আইটি ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের সুযোগ, এবং সরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার—এসব উদ্যোগ দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে মূলধারার শিক্ষা ও অর্থনীতিতে সম্পৃক্ত করার এক অভিনব প্রচেষ্টা। এটি শুধু শিক্ষাগত সংস্কার নয়, সামাজিক সম্প্রীতি ও জাতীয় উন্নয়নের একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। তবে পাঠ্যক্রমের ভারসাম্য, মান নিয়ন্ত্রণ এবং শিক্ষক প্রস্তুতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হবে।
সামাজিক অন্তর্ভুক্তির দিক থেকেও ইশতেহারে কিছু তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিশ্রুতি রয়েছে, যেমন—শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস, মিড-ডে মিল, দুর্গম অঞ্চলে বিশেষ অগ্রাধিকার ও বরাদ্দ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা, নারী শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অবৈতনিক শিক্ষা সম্প্রসারণ। এসব উদ্যোগ শিক্ষা ব্যবস্থায় সমতা আনতে সহায়ক হতে পারে। তবে ভর্তুকিভিত্তিক কর্মসূচিগুলোর আর্থিক টেকসইতা ও লক্ষ্যভিত্তিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত কর চ্যালেঞ্জ হবে।
শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি, আর্থিক সুবিধা উন্নয়ন এবং অবসরভাতা প্রাপ্যতা সহজীকরণের প্রতিশ্রুতি ইতিবাচক। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে মেধাবীদের শিক্ষকতায় আনা অপরিহার্য। তবে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা, পেশাগত উন্নয়ন কাঠামো এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত না হলে এই লক্ষ্য পূরণ কঠিন।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক বলে সমালোচিত। সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা, সমস্যা সমাধান দক্ষতা—এসব গুণ বিকাশে ঘাটতি রয়েছে। সে জায়গায় সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণধর্মী চিন্তার ওপর জোর দেওয়ার অঙ্গীকার ইতিবাচক দিক।
অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ‘শিক্ষা সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হবে। প্রচলিত শিক্ষা কারিকুলামে ব্যবহারিক এবং কারিগরি শিক্ষাকে প্রধান্য দিয়ে ঢেলে সাজানো হবে।শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নে দেশ ও প্রবাসের শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ‘বিশেষজ্ঞ কমিটি’ গঠনেরও প্রতিশ্রতি রয়েছে জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির নির্বাচনী ইশতে হার ২০২৬ এ।
সার্বিক মূল্যায়নে বলা যায়, শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ে িবিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত নীতিপ্রস্তাব একটি বিস্তৃত, বহুস্তরীয় এবং কাঠামোগত সংস্কার-উদ্দেশ্যসম্পন্ন রূপরেখা উপস্থান করে, যেখানে জীবনমুখী শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা, প্রাথমিক স্তরের ভিত্তি মজবুতকরণ, শিক্ষকের মর্যাদা, গবেষণা-উদ্ভাবন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার প্রশ্নকে সমন্বিতভাবে দেখা হয়েছে। নীতিগতভাবে এটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এক মানবসম্পদ-কেন্দ্রিক উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। তবে যেকোনো ইশতেহারভিত্তিক প্রতিশ্রুতির মতোই এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা, আর্থিক টেকসইতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, মান নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নীতিপ্রয়োগের ওপর। বিশেষ করে বাজেট বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার, শিক্ষক প্রশিক্ষণের গুণগত রূপান্তর, প্রযুক্তি উদ্যোগের ব্যবহারযোগ্যতা, কারিগরি শিক্ষার মান, গবেষণা তহবিলের স্বচ্ছতা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচির লক্ষ্যভিত্তিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা না গেলে ঘোষিত লক্ষ্যগুলো আংশিক থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে। ফলে এই নীতিপ্রস্তাবকে একটি সম্ভাবনাময় দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, এর সফলতা নির্ভর করবে সুপরিকল্পিত রোডম্যাপ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং ধারাবাহিক জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন ব্যবস্থার ওপর। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস বিএনপি সরকার গঠন করলে তার শিক্ষা বিষয়ক প্রতিশ্রতি বাস্তবায়ন করবে।
লেখক: ডিন, কলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি