বেকারত্ব, চাকরির বয়সসীমা ও রাষ্ট্রের করণীয়

০৩ আগস্ট ২০১৮, ০৯:১১ AM

বাংলাদেশে দিন দিন বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এখনি রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, ভবিষ্যতে এর ফল কত ভয়াবহ হবে সেই বিষয়টি আজ আমাদের ভেবে দেখা দরকার। দেশের কর্মক্ষম অংশ হলো যুবশক্তি। যুবশক্তিকে আমরা যদি কর্মশক্তি বা কর্মী মনে করি, তাহলে কর্মশক্তি অসাড়, অবশ রেখে রাষ্ট্রের উন্নয়ন কি সম্ভব। উত্তরটা নিঃসন্দেহে ‘না’ সূচক-ই হবে। উত্তর যদি না-সূচকই হয়, তাহলে এমন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আমরা ভাবছি না কেন?

বর্তমান বাংলাদেশে আড়াই কোটি বেকার আছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে কেউ কেউ বলছেন দেশে প্রকৃত বেকারের সংখ্যা সাড়ে ৪ কোটি। আড়াই কোটি হোক আর সাড়ে ৪ কোটিই হোক- সংখ্যাটা কোটির ওপরে। কোটি মানুষের তরুণশ্রম যে-জাতি যথার্থভাবে কাজে লাগাতে পারে না, সে-জাতির চেয়ে হতভাগা পৃথিবীতে কি আর কেউ আছে?

বাংলাদেশে বর্তমানে অবকাঠামোগত যে উন্নত হয়েছে, সেই তুলনায় অনেক বেশি পিছিয়ে আছে বেকার যুবকের কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি না করে। কথাটা শোনাতে একটু খারাপ লাগলেও এটাই এখনকার বাস্তব সত্য। উন্নয়ন বলতে যারা শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বোঝে তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, মানবসম্পদের উন্নয়ন না ঘটিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন যতই করা হোক না কেন- কিছুতেই এই উন্নয়ন টেকসই হবে না। টেকসই উন্নয়ন করতে হলে মানবসম্পদের ক্ষেত্রেও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। না-হলে সবকিছুই একদিন বালির বাঁধের মতো ভেঙেচুরে যাবে। বাংলাদেশ সম্প্রতি স্বল্পোন্নত দেশের স্ট্যাটাস থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে, সামনেই আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হব। কিন্তু উন্নত দেশের স্ট্যাস্টাস পেতে হলে অবশ্যই আমাদের প্রয়োজন হবে দক্ষ জনশক্তি। বেকারত্বের বোঝা ঘাড়ে চেপে থাকলে উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখা বৃথা। মুখে মুখে বললেই একটি দেশ উন্নত করা যায় না, যদি সে-দেশের শ্রমশক্তি কাজে লাগানো না যায়। আমরা আমাদের শ্রমশক্তি ব্যবহার না করে, দিন দিন তার অপচয় করছি। মূল্যবান মানবসম্পদ কাজে লাগানোর পরিবর্তে যারা অবহেলায় অপচয় করে তারা কি সহজেই তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারে?

বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা কেন দিন দিন বাড়ছে সে বিষয়ে আমার কিছু ব্যক্তিগত মতামত আছে। আমি মনে করি, ৩টি কারণ বেকার সৃষ্টির জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। কারণগুলো হলো : ১. বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি ২. চাকরির বয়সসীমা নির্ধারণ এবং ৩. পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না থাকা। এগুলোর বাইরে আরও কিছু কারণ রয়েছে; কিন্তু সেই কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সেগুলো মূলত উপরিউক্ত ৩টি কারণেরই উপজাত মাত্র।
বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের বয়স হ্রাস করে দিচ্ছে। ধরা যাক, একটি শিশু ছয় বছরে স্কুলে ভর্তি হলো। সে যেদিন এসএসসি পাস করবে তখন তার বয়স হবে ১৬ বছর। দু-বছর উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার পর সে পা দেবে ১৮-তে। চার বছর অনার্স পড়লে ২২-এ গিয়ে ঠেকবে তার বয়ঃক্রম। এরপর এক বছর মাস্টার্স পড়লে ২৩ হবে তার শিক্ষাকাল। একজন শিক্ষার্থীর এই ২৩ বছরের সঙ্গে যোগ করতে হবে ফলাফল প্রকাশের আরও দুই বছর সময়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজটের কথাটাও ভাবতে হবে। তাহলে হিসাব করে দেখা যাচ্ছে ২৭-২৮ বছরের আগে কেউ-ই তার বিদ্যায়তনিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারছে না। ৩০ বছর চাকরিতে ঢোকার বয়সসীমা হওয়ার ফলে অনেকেই নির্ধারিত সময়ে চাকরিতে ঢুকতে পারছে না। ফলে বেকারত্ব বাড়ছে, বেকারত্বের হতাশা থেকে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে মাদকাসক্তের সংখ্যাও, সংঘটিত হচ্ছে নানারকম সামাজিক অপরাধ।

বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত একটি গরিব দেশই আছে। এদেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ কর্মসংস্থানের অভাব আজ থেকে নয়, বহুকাল আগে থেকেই লক্ষণীয়। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষির বাইরে তেমন কোনো বৃহৎ কর্মক্ষেত্র নেই। কৃষির পরে পোশাক শিল্পের কথা বাদ দিলে এদেশে তো কর্মক্ষেত্রও খুঁজে পাওয়া দায়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয় প্রতিবছর যে সংখ্যক শিক্ষিত তরুণ-তরুণী বের হয় তাদের সবার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। এই যখন আমাদের সার্বিক পরিস্থিতি তখন নতুন করে সবকিছু বিন্যাস করা ছাড়া আর তো কোনো উপায় দেখি না।

আমরা যদি বিশ্বের কিছু দেশের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা পর্যালোচনা করি তাহলে দেখব- ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ৪০ বছর, কাতার ৩৫ বছর, নরওয়ে ৩৫ বছর, ফ্রান্স ৪০ বছর, শ্রীলংকা ৪৫ বছর, ইন্দোনেশিয়া ৪৫ বছর, সুইডেন ৪৭ বছর, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ওমান, কুয়েত ৫৫ বছর, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় ৫৯ বছর (সূত্র : উইকিপিডিয়া)। আমি যতগুলো রাষ্ট্রের তালিকা উপরে দিলাম তারা হয়তো আমাদের চেয়ে উন্নত, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাও ভালো; কিন্তু একটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার যে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা নির্ধারণের সঙ্গে সরকারি বা বেসরকারি অর্থের অপচয় হয় না। যোগ্যতার ভিত্তিতে যে কোনো মানুষের চাকরি পাওয়াই তার নাগরিক অধিকার। এটা শুধু নাগরিক অধিকারই নয়- সাংবিধানিক অধিকারও বটে। বাংলাদেশ সংবিধানের ২৯(১) অনুচ্ছেদে বলা আছে- চাকরি লাভের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক সমতা লাভ করবে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি সাংবিধানিক এই নিয়ম সর্বক্ষেত্রে রক্ষিত হচ্ছে না। বাংলাদেশে নার্সদের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৬ বছর, চিকিৎসকদের বয়সও দুই বছর বাড়ানো হয়েছে বিশেষ যুক্তি প্রদর্শন করে। এক দেশে দুই নীতি- কখনোই চলতে পারে না। সেক্ষেত্রে আমরা যদি সবার জন্য সমতাভিত্তিক নীতি গ্রহণ করি, তাহলে কারও মনেই কোনো ক্ষোভ থাকার কথা নয়।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে, বেড়েছে মাথাপিছু আয় ও নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র। শুধু বয়সের কারণে আমাদের কর্মক্ষম ছেলেমেয়েরা বেকার হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে- এমনটি কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। নিশ্চয়ই কোটি কোটি বেকারের জন্য আমাদের নতুন পথের সন্ধান বের করতে হবে। যুবশক্তি কর্মহীন থাকলে রাষ্ট্র স্থবির ও অচল হয়ে পড়বে। রাষ্ট্রযন্ত্রের যেখানে-সেখানে দেখা দেবে যান্ত্রিক ত্রুটি। কর্মক্ষম ছেলে-মেয়েদের কর্মসংস্থান করে আগামী দিনের বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসন্ন। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের উচিত হবে আগামী নির্বাচনের ইশতেহারে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ করা। ফলে লাখ লাখ তরুণ-তরুণী বেকারত্বের হাত থেকে রক্ষা পাবে। বিদেশে মেধা পাচার বন্ধ হবে এবং গড়ে উঠবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা। একটি দেশ গঠন করে সে-দেশের মেধাবী সন্তানরা। মেধাবীদের মস্তিষ্ক প্রসূত চিন্তাকেই রূপ দেয় শ্রমিক-সমাজ। সমাজ থেকে পরিকল্পনা প্রণয়নকারীকে নির্বাসনে রেখে শুধু শ্রমিক দিয়ে উন্নত দেশ গড়ে তোলা সম্ভব হয়।

আওয়ামী লীগ চিরদিনই জনবান্ধব দল। এই দল স্বাধীনতা দিয়েছে, উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে অবিচল পায়ে এখনও এগিয়ে যাচ্ছে। আশা করি বেকারত্ব দূর করার জন্যও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নতুন চমক সৃষ্টি করে লাখ লাখ যুবকের মনে আশার সঞ্চার করবে। বাংলাদেশে যে হারে শিক্ষিত বেকার বাড়ছে- এদের ঠিকমতো কাজে লাগানো সরকারেরই দায়িত্ব। দেশে নানারকম ভাতা প্রথা চালু আছে, আমাদের বেকারদের জন্য কোনো ভাতা নেই, বিশেষ কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। উপরন্তু চাকরি ফরম পূরণ করতে হলে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়। পকেটের টাকা খরচ করে গ্রাম থেকে শহরে এসে পরীক্ষা দিয়ে যেতে হয়। এটাও বেকারের জন্য আরেকটি সমস্যার বিষয়। বেকার সমস্যা সমাধানে নিম্নোক্ত প্রস্তাবগুলো ভেবে দেখা যেতে পারে- (ক) চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ন্যূনতম ৩২ থেকে ৩৫ বছর করা (সরকারি-বেসরকারি উভয়ক্ষেত্রে), (খ) নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্নকরণ, (গ) সকল নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের প্রাপ্ত নম্বরসহ মেধা তালিকা প্রকাশ, (ঘ) বেসরকারি চাকরির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ও শর্তমালা শিথিল করে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন, (ঙ) শূন্য পদে ধারাবাহিক নিয়োগ।

আমি আশা করছি, বাংলাদেশ সরকার ও সরকারের নীতিনির্ধারক মহল বিষয়গুলো ভেবে দেখবেন। রাজনীতি মানুষের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে করা উচিত। বর্তমান সরকারও দেশ ও জনতার স্বার্থে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আমাদের বেকার তরুণের হতাশ মুখের দিকে স্নেহশীল দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে তাদের কষ্টগুলো বুঝে সরকারের উচিত হবে বেকারত্ব দূরীকরণে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করা। অন্য সবার মতো আমারও প্রত্যাশা- বেকারমুক্ত বাংলাদেশ হোক কর্মক্ষম মানুষের জন্য উপযুক্ত কর্মস্থল।

লেখক : রাজনীতিবিদ ও কলামিস্ট

 

‘সাদ্দামের লগে কী করছস’ বলে বাগেরহাটের ডিসি-এসপিকে হুমকি
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে সংবিধানে যা যা বদলে যাবে, নতুন যুক্ত হ…
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
আজ কুষ্টিয়ায় যাচ্ছেন জামায়াত আমির
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীদের সাংবাদিকতায় প্রশিক্ষণ দিল কনকসাস
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
আ.লীগ নেতাকে ধরতে যাওয়া পুলিশের ওপর হামলা, ৩ এসআই আহত
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
রাস্তায় মরা ইঁদুর ফেলা নিয়ে দোকানী-শিক্ষার্থী সংঘর্ষ, আহত ৭
  • ২৬ জানুয়ারি ২০২৬