© সংগৃহীত
একের পর এক নাশকতা ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে কোণঠাসা হয়ে চাপে দিশাহারা হেফাজতের শীর্ষস্থানীয় নেতারা নিজেদের গ্রেপ্তারের ঝুঁকি এড়াতে তড়িঘড়ি করে হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। গত রবিবার রাত ১১টার দিকে ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় সংগঠনের আমির জুনাইদ বাবুনগরী কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা দেন।
সেদিন ভিডিও বার্তায় বাবুনগরী বলেন, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতার পরামর্শে কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলো। আগামী দিনে আহ্বায়ক কমিটির মাধ্যমে হেফাজতের কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
কমিটি বিলুপ্তির তিন ঘন্টার মধ্যে সংগঠনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে মধ্যরাতেই আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে বাবুনগরীপক্ষ। রাত পৌনে ৩টার দিকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রথমে তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। যেখানে বিলুপ্ত কমিটির উপদেষ্টা মহিবুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে আহ্বায়ক কমিটিতে প্রথমে বিদায়ী আমির জুনাইদ বাবুনগরী ও বিদায়ী মহাসচিব নুরুল ইসলাম জিহাদীকে রাখা হয়। তিন সদস্যের কমিটিতে বর্তমান নেতারাই থাকায় সমঝোতার আলোচনায় প্রশ্ন উঠতে পারে ভেবে আবারও দুজনকে যুক্ত করা হয়। পরে রাত ৪টার সময় আরেকটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আহ্বায়ক কমিটিতে সদস্য হিসেবে সালাহউদ্দিন নানুপুরী ও অধ্যাপক মিজানুর রহমান চৌধুরীকে যুক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে পাঁচজনের আহ্বায়ক কমিটি।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দুই দফায় আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হলেও এই কমিটি নিয়ে হেফাজতের অনেকেই নাখোশ। কমিটি ভাঙায় ক্ষোভ-হতাশা সাধারণ কর্মীদের মধ্যেও। তবে নেতারা নতুন মেরুকরণের দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। আহ্বায়ক কমিটির মধ্যে অধ্যাপক মিজানুর রহমান ছাড়া অন্য চারজনই জুনাইদ বাবুনগরীর আত্মীয়। মহিবুল্লাহ বাবুনগরী তাঁর আপন মামা, নুরুল ইসলাম জিহাদী ফুফাতো ভাই ও সালাউদ্দিন নানুপুরী মেয়ের ভাশুর ও ভাগ্নে সম্পর্ক। জুনাইদ বাবুনগরীসহ চারজনের বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর পাশের উপজেলা ফটিকছড়িতে। শুরুতেই কমিটিতে আত্মীয়করণ করায় হেফাজতের নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই এই আহ্বায়ক কমিটিকে ‘ফটিকছড়ি কমিটি’ বলেও আখ্যায়িত করছেন।
আহ্বায়ক কমিটির নতুন এই তালিকা প্রকাশ হওয়ার পরে শফীপন্থী নেতারা বিভিন্নভাবে বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, সরকার ও প্রশাসনের চাপে থাকলেও জোনাইদ বাবুনগরীসহ রাজনৈতিক বলয়ের শক্তি হেফাজতের নিয়ন্ত্রণ কৌশলে ধরে রাখতে চাচ্ছে। এ কারণে তারা কমিটিতে নিজস্ব লোকজন রাখছে বলে অভিযোগ তুলেন তারা।
এদিকে, হেফাজতের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছে হেফাজতে ইসলামের সাবেক আমির আল্লামা আহমদ শফীর অনুসারীরা। নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার পর পাল্টা কমিটি গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন শফীপন্থিরা বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠনটি নেতৃত্ব নিয়ে নতুন সংকটে পড়তে যাচ্ছে বলে ধারনা করা হচ্ছে।
আল্লামা শফীর ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত হেফাজতের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মঈনুদ্দিন রুহি বলেন, মূল কমিটি বিলুপ্ত করে পাঁচ জনের যে আহ্বায়ক কমিটি করা হয়েছে তা প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। জুনায়েদ বাবুনগরী সাহেব তার আত্মীয়স্বজনকে নিয়ে যে কমিটি করেছেন তাকে হেফাজতের কমিটি না বলে পারিবারিক কমিটি বলাই ভালো। এই কমিটি দেশ, জাতি, আলেমসমাজ কিংবা হেফাজতে ইসলামের কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। তাই আমরা যোগ্য নেতৃত্বের সমন্বয়ে নতুন কমিটি করার চিন্তাভাবনা করছি।
এই কমিটিতে কারা থাকবেন জানতে চাইলে মাওলানা রুহী বলেন, আল্লামা শফী সাহেব তার ইন্তেকালের কয়েক মাস আগে ২০১ সদস্যের একটি কমিটি ঘোষণা করেছিলেন। ওই কমিটিতে আল্লামা শফী ও আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর নাম যথাক্রমে আমীর ও মহাসচিব হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছিল। বর্তমান আমীর জুনায়েদ বাবুনগরীর এই কমিটির ব্যাপারে সম্মতিও ছিল। প্রস্তাবিত কমিটিতে আল্লামা শফীসহ কয়েকজন ইতোমধ্যে ইন্তেকাল করেছেন। এরকম কয়েকজনের নাম সংযোজন বা বিয়োজন করে ওই কমিটিই বলবত্ রাখা হবে। কয়েকদিনের মধ্যেই এ ব্যাপারে মিডিয়ায় ঘোষণা আসবে।
এ ব্যাপারে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। তবে তার ব্যক্তিগত সহকারি বলেন, হেফাজতের সদ্য বিলুপ্ত কমিটি সম্মেলনের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছিল। তাই এর আগে যদি কমিটি হয়েও থাকে তার আর কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকে না।