প্রতীকী ছবি © সংগৃহীত
চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ঝুলন্ত অবস্থায় এক কলেজছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া একাধিক চিঠিতে পারিবারিক নির্যাতন ও মানসিক চাপের বর্ণনা পাওয়া গেছে। পুলিশ মরদেহ ময়নাতদন্তে পাঠিয়ে চিঠিগুলোর সূত্র ধরে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে।
ওই কলেজছাত্রীর নাম আতিয়া ইবনাত চৌধুরী জয়িতা (১৯)। তিনি সাতকানিয়া সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির মানবিক বিভাগের ছাত্রী ছিলেন।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) বিকেল ৫টার দিকে উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর বাজালিয়া গ্রামে একটি গাছের সঙ্গে গলায় ফাঁস লাগানো মরদেহ ঝুলতে দেখা যায়। পরে রাত ১০টার দিকে সাতকানিয়া থানা পুলিশের একটি টিম থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সুদীপ্ত রেজার উপস্থিতিতে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জয়িতার মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়।
রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে থানা থেকে জয়িতার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
খবর পেয়ে শনিবার রাতে সাতকানিয়া সার্কেলের (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং জয়িতার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন। পরে জয়িতার শয়ন কক্ষের একটি ব্যাগ ও সার্টিফিকেটের ফাইল থেকে মা-বাবার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখা একাধিক চিঠি উদ্ধার করা হয়। চিঠিগুলো দেখে ধারণা করা হচ্ছে, সেগুলো বেশ কিছুদিন আগে লিখেছিল জয়িতা। তবে সম্প্রতি লেখা কিছু চিঠিও সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়।
জয়িতা উত্তর বাজালিয়া গ্রামের আবু বোরহান মো. জাহাঙ্গীর চৌধুরীর মেয়ে। তার মায়ের নাম জান্নাতুল ফেরদৌসী। ২০১৮ সালে তার মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়। তখন জয়িতা চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। এর পর থেকে তিনি লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ এলাকায় তার মায়ের সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। ২০২৪ সালে তিনি এসএসসি পাস করেন। তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে তার বাবা তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসেন। সেখানে তার সৎমা সাকিলা সুলতানা পুষ্প ও এক শিশু সৎবোনসহ একসঙ্গে থাকতেন তিনি।
শয়ন কক্ষ থেকে উদ্ধার চিঠিগুলোতে জয়িতা লিখেন, ‘আমার মা-বাবার বিচ্ছেদের কিছুদিন পর থেকে আমার মায়ের আমার প্রতি অসন্তুষ্টি দেখা দেয়। এর মধ্যে প্রধান হলো অশ্লীল গালাগালি ও মারধর। ঘরের অধিকাংশ কাজ সেরে বসে থাকলেও অসন্তুষ্টি। কোনো ছোটখাটো দোষেই বাবাকে নিয়ে। পরপুরুষ নিয়ে আমার নামে খারাপ কথা বলে এবং আমাকে গালাগালি করে। উঠতে বসতে শুধু অশ্লীল কথা। বাবাকে যদি যখন এসবের কথা বলি বাবা বিশ্বাস করে না। বান্ধবীদের বললে তারা বিশ্বাস করে। কেননা এসব কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তার জন্য মায়ের যেসব অশ্লীল গালিগালাজ আমি ২ বছর ধরে রেকর্ডিং করতে থাকি।’
তিনি আরও লিখেন, ‘রেকর্ডিংয়ের ব্যাপারে জানতে পারলে মেমোরি কার্ড নিয়ে ফেলে এবং আমার ভাই ও মা মোবাইল ভেঙে ফেলে। তারপর থেকে এসব অশ্লীল গালিগালাজ আমি রেকর্ডিংয়ের বদলে খাতায় লিখতে থাকি। তখন মা সবাইকে জানিয়ে দেয় আমি ছেলেদের সঙ্গে কথা বলছি তাই মোবাইল ভেঙেছে। অবশেষে একদিন লুকাতে না পারা খাতাগুলো পায় এবং পুড়িয়ে ফেলে। এ ছাড়াও গালিগালাজ ও মারধর করে। তার প্রত্যেক গালিগালাজ ছিল ধর্মবিরোধী।’
জয়িতা লিখেন, ‘একদিন সকালে অসুস্থ বোধ করায় উঠতে না চাওয়ায় আমাকে জোর করে ইচ্ছামত কাজ করায়। আমাকে বলে আমি মায়ের কামাই খাচ্ছি। মায়ের স্বামীর ভাগ খুঁজছি। সেই সাথে সে বাবাকে দিয়ে ধর্ষণের হুমকিও দেয়। এসব কথা আমি জনগণকে বলে দিবে বললে, আমি হুমকি দিচ্ছি বলে আমাকে মারতে থাকে। কোনোদিন তার বদনাম করতে দেখিনি। তবে সে যে আমার সাথে এমন করে তা বান্ধবীদের বলি ও সে তা আচঁ করতে পারে এবং অপবাদ দেয় প্রেম করি। সেটা পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজন সবাইকে বলে। আমি যদি প্রেম করতাম তাহলে আইনের সাহায্য তো চাইতাম না।’
অপর একটি চিঠিতে বাবার কাছে কেন যাচ্ছি না শিরোনামে জয়িতা লিখেন, ‘মা আমার বাবাকে আমার নামে যা বলে তা বাবা শুনে। তবে আমি কিছু বলতে চাইলে কখনো কখনো মারধর করে কিছু বলতে দেয় না। বাবাকে একবার আমি লজ্জা ভেঙে এসব বলেছিলাম। বাবা বলে মায়ের অভিশাপ নিচ্ছিস। মায়ের কথা ধরে বাবা আমাকে মারে, তবে তা ব্যাপার না। বাবা তো এমনিই খারাপ।’
এ ছাড়াও জয়িতা একাধিক পৃষ্ঠায় সংক্ষিপ্ত আকারে কিছু কথা লিখে গেছেন। পৃষ্ঠাগুলো দেখে মনে হয়েছে ওই লেখাগুলো তিনি সম্প্রতি সময়ে লিখেছেন। প্রতিটি পৃষ্ঠায় আলাদাভাবে তিনি লিখেন, ‘পৃথিবী আমার জন্য নিরাপদ নই। আমার থেকে চুরি করে কিছু খেতে হবে না। আমি মোবাইল নিলে বকা দিতে হবে না। আমার ভাগের খাবারগুলো তোমরা খাও। আমার ধর্ম পবিত্র, তোমাদের ধর্ম অপবিত্র। আমার টাকাগুলো তোমাদের রুহতে থাক। আমি কাউকে ভুলে যায় না। আমাকে বাঁচতে দাও। আমার বিড়াল কষ্ট পাবে, বাঁচবে না, তো আমিও মরব। সৃষ্টিকর্তা আমার পাশে থাকুন, আমাকে ক্ষমা করুন।’
জয়িতার বাবা আবু বোরহান মো. জাহাঙ্গীর চৌধুরী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি আসরের নামাজ পড়তে গিয়েছিলাম। এরপর আমার স্ত্রীর ফোন পেয়ে বাড়িতে এসে দেখি আমার মেয়ে মেঝেতে পড়ে আছে। করে তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে মৃত ঘোষণা করেন। আমার মেয়ে দীর্ঘদিন তার মায়ের সাথে ছিল। কয়েক মাস আগে তাকে আমি নিয়ে এসেছি। সে এখানে থেকে পড়ালেখা এবং কোচিং করত। কিন্তু হঠাৎ করে কেন আত্মহত্যা করেছে, কিছুই বলতে পারছি না। তবে আমার সংসারে কিছুটা অভাব-অনটন ছিল।’
জয়িতার সৎমা সাকিলা সুলতানা পুষ্প বলেন, ‘জয়িতা সকালে কোচিং এ যাওয়ার জন্য পুরানগড় এলাকার এক বান্ধবীকে কল দিয়েছিল। কিন্তু কোচিং এ আর যায়নি। তবে সকাল থেকে সে রুমে ছিল। হঠাৎ করে আমি তাকে ডাকতে গিয়ে দেখি সে রুমের একটি গাছের সঙ্গে ঝুলছে। পরে আমি তাকে নামিয়ে তার বাবাকে কল দিলে তিনি বাড়িতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এরপর প্রতিবেশীরা এসে জড়ো হন।’
শনিবার রাত ৯টার দিলে জয়িতার মা জান্নাতুল ফেরদৌসী লোহাগাড়া থেকে উত্তর বাজালিয়া গ্রামে এসে মেয়ের মরদেহ দেখে ভেঙে পড়েন। এ সময় তিনি আর্তনাদ করে তার সাবেক স্বামী ও জয়িতার সৎমাকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করতে থাকেন। এ ছাড়া তিনি তার মেয়ের মৃত্যুর জন্য তাদের দায়ী করেন।
সাতকানিয়া সার্কেলের (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি আত্মহত্যা। ভিকটিমের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। তার শয়ন কক্ষ থেকে উদ্ধার করা চিঠিগুলো কখন লেখা হয়েছে, এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনার মূল রহস্য বেরিয়ে আসবে।