শুয়ে-বসে আয়ের লোভ দেখিয়ে উধাও এমটিএফই © সংগৃহীত
পরিশ্রম ছাড়া ঘরে বসে বিনিয়োগ করে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে গ্রাহকের প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ গ্রুপ (এমটিএফই) নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ডেসটিনি-২০০০, ইউনি পে টু ইউ-এর মতো প্রতারক এমএলএম কোম্পানির তালিকায় নাম লেখাল এমটিএফই নামের আরেক প্রতিষ্ঠান। আয়ের লোভ দেখিয়ে এমটিএফই উধাও হলেও মূলহোতারা আছেন ওমরা হজে।
গত ৭ আগস্ট সিস্টেম আপগ্রেডের কথা বলে গ্রাহকদের টাকা উত্তোলন সেবা বন্ধ করে এমটিএফই। ফলে অনেকেই অপেক্ষায় ছিলেন যে সিস্টেম আপগ্রেড হওয়ার পর টাকা তুলবেন। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার (১৭ আগস্ট) রাতে হুট করে প্রায় সব গ্রাহকের ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্ট ঋণাত্মক দেখানো শুরু করে অ্যাপটি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের ব্যবসায় লোকসান হয়েছে। এজন্য উল্টো গ্রাহকদের কাছ থেকেই তারা টাকা পাবে।
জানা গেছে, কানাডিয়ান মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ কোম্পানি (এমটিএফই) বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করে ২০২১ সালে। তিন বছরে এমটিএফইতে শুধু বাংলাদেশ থেকেই ৪২ লাখ মানুষ যুক্ত হয়েছেন। প্রাথমিক অবস্থায় এমটিএফই অ্যাপে যুক্ত প্রত্যেকেই ৬১, ২০১, ৫০১, ৯০১ ও ২ হাজার ডলার ডিপোজিট করেন। বেশি টাকা আয় করতে কেউ কেউ ৫ হাজার ডলারের বেশিও ইনভেস্ট করেছেন। এভাবে কোম্পানিটি গ্রাহকদের কাছ থেকে ২ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিয়েছে।
ঢাকাসহ সারা দেশে কোম্পানিটির ৪ শতাধিক অফিস রয়েছে। এমটিএফই’র অ্যাপে এসব অফিসের ছবিসহ ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য দেয়া আছে। মূলত দুবাই থেকে মাসুদ আল ইসলাম নামের এক বাংলাদেশি এমটিএফই’র এশিয়া অঞ্চলের দেখভাল করেন। তিনিই এমটিএফই’র কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ করে বিভিন্ন গ্রুপগুলোতে ছড়িয়ে দিতেন। তার থেকে পাওয়া তথ্য অন্যান্য গ্রুপের সিইওরা তাদের মেম্বারদের জানাতেন। মেম্বাররা আবার তাদের সদস্যদের জানাতেন।
এমটিএফই’র বেশ কয়েকজন গ্রাহক জানান, অ্যাপটিতে কেউ ৫০০ ডলার বিনিয়োগ করলে প্রতিদিন তাকে প্রায় ১৩ ডলার লাভ দেওয়া হতো। তবে এত অল্প বিনিয়োগে তো বড় লাভ আসবে না। সেজন্য অনেকে ৫ হাজার, ১০ হাজার, এমনকি ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন। বিনিয়োগ যত বেশি, লাভও তত বেশি ছিল। এমনকি প্রতিমাসে বিনিয়োগের প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত লভ্যাংশ পেতেন গ্রাহকরা।
এমটিএফইতে শুধু বিনিয়োগের ওপর লাভই নয়, কাউকে বিনিয়োগ করাতে পারলে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন পাওয়া যেত। এমন করে কারও মাধ্যমে ১০০ জন গ্রাহক বিনিয়োগ করলে তার পদবি হতো ‘সিইও’। কমিশন আর নিজের বিনিয়োগের অর্থ মিলে ওই কথিত সিইও মাসে ১৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারত।
এমটিএফই’র ফাঁদে পড়ে শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও প্রতারিত হয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রতারিতদের মধ্যে বেশিরভাগই তরুণ এবং বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এ ছাড়া শিক্ষক, ডাক্তার, আইনজীবী এবং সাংবাদিকসহ অন্যান্য পেশার মানুষও রয়েছেন।
এমটিএফই অ্যাপে প্রায় শতকোটি টাকা খোয়ালেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি পেশার প্রায় দুই হাজার মানুষ। বিনিয়োগকারীরা জানায়, রাতারাতি কোটিপতি হওয়ায় আশায় কুমারখালীসহ কুষ্টিয়া জেলায় অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ প্রায় ৮ হাজার থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছিলেন এমটিএফই অ্যাপসে। গত শুক্রবার থেকে অ্যাপসটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এটি মাল্টিলেভেল মার্কেটিং ( এমএলএম) পদ্ধতিতে কার্যক্রম পরিচালনা করত। যা দেশের আইনে অবৈধ।
নওগাঁ সদর উপজেলার শৈলগাছী ইউনিয়নের ভুক্তভোগী আলামিন বলেন, একজন বলেছিলেন এমটিএফইতে বিনিয়োগ করলে দিগুণ আয় করা যাবে। পরে একটি এনজিও থেকে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করি। এখন ওই অ্যাপে আর প্রবেশ করা যাচ্ছে না। এখন এনজিওর টাকা কীভাবে পরিশোধ করব কিছুই বুঝতে পারছি না।
কিভাবে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে এমটিএফই?
একজন নাগরিক এমটিএফই এবং বাইনান্স নামের একটি অ্যাপ ডাউনলোড করে খুব সহজেই এমটিএফইতে রেজিস্ট্রেশন করতে পারতেন। রেজিস্ট্রেশনের পর তাদের নিজস্ব ওয়ালেটে ট্রেডের জন্য ডলার রাখতে হতো। ডলারের পরিমাণ অনুযায়ী তাদের প্রতিনিয়ত লাভ দেওয়ার প্রলোভনও দেওয়া হতো।
বিজ্ঞাপনে এমটিএফই বলতো, কেউ যদি ২৬ থেকে ৬০ ডলার বিনিয়োগ করেন, সেক্ষেত্রে তিনি প্রতিদিন ০.৩৯ ডলার থেকে ০.৬০ মার্কিন ডলার লাভ করতে পারবেন। একইভাবে ৬১ থেকে ২০০ ডলার বিনিয়োগে প্রতিদিন ০.৯৮ ডলার থেকে ২.০৫ ডলারের লাভ, ২০১ থেকে ৫০০ ডলার বিনিয়োগে প্রতিদিন ৪ থেকে ৫.০৯ ডলার পর্যন্ত লাভ, ৫০১ থেকে ৯০০ ডলার বিনিয়োগে প্রতিদিন ১০.৯৩ থেকে ১৪.৬৪ ডলার পর্যন্ত লাভ, ৯০১ থেকে ১৫০০ ডলার বিনিয়োগে ১৮-২৪.৪০ ডলার পর্যন্ত লাভ, ৩৫০১ থেকে ৫০০০ ডলার বিনিয়োগে ৮৫ থেকে ১২৫ ডলার পর্যন্ত এবং ৫০০১ ডলার থেকে ১০ হাজার পর্যন্ত বিনিয়োগে প্রতিদিন ১১০ থেকে ১৬০ ডলার পর্যন্ত লাভ হতে পারে বলে লোভ দেখানো হয়।