আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকিরে © সংগৃহীত
‘যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাও করে, আমরা সেটাই করব’—বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের এই মন্তব্য ঘিরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। সমালোচনার মুখে পুলিশের পক্ষ থেকে এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তবে তার জবাবদিহি ও পদত্যাগের দাবিও তুলছেন কেউ কেউ।
সোমবার দুপুরে আইজিপি বক্তব্য দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সন্ধ্যায় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, “আইজিপি ক্রসফায়ার শব্দটিকে আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে উল্লেখ করেছেন।” বিজ্ঞপ্তিতে আরও দাবি করা হয়, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি উল্লেখ করেননি।
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বছরের পর বছর তীব্র সমালোচনা করেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়েছে।
এরপরও পুলিশের মহাপরিদর্শকের ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে মন্তব্যে নানা প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিনিধি ও পুলিশের সাবেক কর্মকর্তারা। মানবাধিকারকর্মীদের কেউ কেউ বলছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে থেকে এমন বক্তব্য দিয়ে আইজিপি নৈতিকতার মানদণ্ড লঙ্ঘন করেছেন।
পুলিশের সাবেক একজন কর্মকর্তা মনে করেন, বাহিনীর সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল পদে থেকে ক্রসফায়ারের কথা বলার অর্থই হলো আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে নেওয়া। এদিকে, বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারাও আইজিপির এমন বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
কী বলেছিলেন আইজিপি?
সোমবার দুপুরে পুরান ঢাকার চকবাজারে কমিউনিটি ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা চালুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আইজিপি আলী হোসেন ফকির। কথাপ্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কে আসবে, আপা কবে আসবে, কী হবে, ওইটা আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেখার বিষয় না।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের দায়িত্ব আইন-সংবিধান অনুযায়ী যখন যেখানে যা প্রয়োগ করা দরকার, সেটাই আমরা করব। যেখানে ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাও করে, আমরা সেটাই করব।”
একই সঙ্গে পুলিশকে যেভাবে সমালোচনা করা হয়, তা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন আইজিপি। তাঁর এই বক্তব্যের পরই ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
বাংলাদেশে ক্রসফায়ার নিয়ে বিতর্কের ইতিহাস
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে সমালোচনা নতুন নয়। বিশেষ করে ২০০৪ সালে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব নামে পুলিশের বিশেষ ইউনিট গঠনের পর থেকে এ ধরনের অভিযোগ প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে আসতে শুরু করে।
২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে তীব্র সমালোচনা হয়। ওই ঘটনায় একসঙ্গে সাতজনকে হত্যা করে শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনার জন্য র্যাবকে দায়ী করা হয়।
পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে বেশ কিছু ‘ক্রসফায়ারের’ ঘটনা দেশে ও বিদেশে বাংলাদেশের সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিকভাবেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাব ও এর ছয়জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল শেখ হাসিনার সরকারও।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো বরাবরই আইন ও সংবিধান পরিপন্থী এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে মনে করে। এমন প্রেক্ষাপটে পুলিশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে এ ধরনের মন্তব্যে নিন্দা ও উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
টিআইবি বলছে, অতীতের অপরাধ থেকে পুলিশ কী শিক্ষা নিয়েছে?
অতীতের বিভিন্ন ঘটনার কথা উল্লেখ করে টিআইবি টেকনাফের একরামুল হক, মেজর সিনহা হত্যা এবং নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেছে। সংস্থাটি বলছে, “এ ধরনের হাজারো অভিজ্ঞতার পর পুলিশের পেশাগত শুদ্ধিসহ রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশার পটভূমিতে পুলিশ প্রধান আবার ক্রসফায়ারের সম্ভাবনা সামনে আনছেন। অতীতের অপরাধ থেকে পুলিশ কী শিক্ষা নিয়েছে—এর উত্তর তাকেই দিতে হবে।”
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ সংক্রান্ত বক্তব্য প্রত্যাহার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছে আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “আইজিপি একই বক্তব্যে আইন ও সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের কথা বলেছেন, আবার সরকারের অনুমতি পেলে ক্রসফায়ার করার কথাও বলেছেন—এই দুই অবস্থান সাংঘর্ষিক। কোনো সরকারের অনুমতি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধ করতে পারে না। পুলিশের ব্যর্থতার দায় ক্রসফায়ারের দিকে নেওয়ার চেষ্টা’
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন মনে করেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির জন্য পুলিশের যে ব্যর্থতার দায় রয়েছে, সেটি এখন ক্রসফায়ারের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তার ভাষায়, “দেশে আইনশৃঙ্খলা অবনতি হওয়া মানে পুলিশের ব্যর্থতার যে দায়, সেই দায়টা এখন ক্রসফায়ারের দিকে নিয়ে যাওয়ার যে চেষ্টা, সেটি আইনের চরম বরখেলাপ।”
তিনি বলেন, “সরকারের উচিত তাকে এই মুহূর্তে বাহিনীপ্রধান থেকে পদচ্যুত করা।” একই সঙ্গে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়ার কারণে আইজিপি আলী হোসেন ফকিরকে বিচারের আওতায় আনা সম্ভব বলেও মনে করেন নূর খান লিটন। আইন ও মানবাধিকারের মূল নীতির পরিপন্থী’
আইজিপির মন্তব্যে উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলেছে, “এ ধরনের বক্তব্য শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয়, বরং আইনের শাসন, সাংবিধানিক অধিকার ও মানবাধিকারের মূল নীতির পরিপন্থী। কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলেও তাকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করার অধিকার রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেই।”
অন্যদিকে, আইজিপির বক্তব্যের বিষয়ে ‘স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন’ ব্যাখ্যা দাবি করেছে এইচআরএসএস। সংস্থাটি বলেছে, “সরকার কি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে অনুমোদনযোগ্য মনে করে, নাকি এটি আইজিপির ব্যক্তিগত বক্তব্য—তা অবিলম্বে পরিষ্কার করতে হবে।”
এইচআরএসএস আরও বলেছে, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে বিরত রাখার বিষয়ে সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার অঙ্গীকার তারা প্রত্যাশা করছে। আইজিপির পদে থেকে এমন কথা বলার অর্থ ব্যর্থতার দায় মেনে নেওয়া’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে থেকে দায়িত্বশীলভাবে কথা বলা উচিত বলে মনে করেন সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা। তার মতে, যেসব সরকারের আইনি ভিত্তি থাকে না, তারা অনেক সময় এ ধরনের ব্যবস্থা অনুসরণ করে থাকে। ক্রসফায়ার এমন একটি বেআইনি ব্যবস্থা, যার কার্যকারিতার কোনো ভিত্তি আইনে নেই।
সাবেক এই আইজিপি বলেন, ‘আইজিপির পদে থেকে এমন কথা বলার অর্থ—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় মেনে নেওয়া।’
কেন পুলিশের সর্বোচ্চ পদে থেকে এমন কথা বলা যায় না, তা ব্যাখ্যা করে নুরুল হুদা বলেন, “কারণ এটা করলে আইনগতভাবে নির্বাচিত একটা সরকারের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়ে যায়।”
পুলিশের ব্যাখ্যা কী?
সোমবার দুপুরে ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে আইজিপির বক্তব্যের পর সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় পুলিশ সদর দপ্তর একটি ব্যাখ্যা দেয়। এতে বলা হয়, বিষয়টি স্পষ্ট করা এবং জনমনে বিভ্রান্তি নিরসনের লক্ষ্যেই পুলিশের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দায়িত্ব পালনের সময় পুলিশ সদস্যদের কখনো কখনো অপরাধী, সংঘবদ্ধ হামলাকারী কিংবা আইন অমান্যকারী ব্যক্তিদের সরাসরি প্রতিরোধ ও আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়। সরকারি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে পুলিশের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, “এসব হামলায় চারজন পুলিশ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৩৭০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। দেশের প্রচলিত আইন বিশেষ করে আত্মরক্ষার অধিকার, দণ্ডবিধি-১৮৬০, ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮ এবং পুলিশ অ্যাক্ট-১৮৬১-এ পুলিশের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা বলা রয়েছে।”
ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যায় পুলিশ সদর দপ্তর দাবি করে, “আইজিপি তাঁর বক্তব্যে মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে পুলিশের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।”
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, “তিনি এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের কঠোরতা বোঝাতে গিয়ে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি আক্ষরিক অর্থে উল্লেখ করেছেন। তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি প্রদানের লক্ষ্যে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি উল্লেখ করেননি।”
রাজনৈতিক দলগুলোর নিন্দা ও প্রতিবাদ
আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে মন্তব্যের পর এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের কয়েকটি রাজনৈতিক দল। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আইজিপির বক্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বলা হয়েছে, “আইজিপি তাঁর চাকরিবিধি লঙ্ঘন করেছেন।”
দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের এক বিবৃতিতে বলেন, “তার বক্তব্য দেশে ভয়ের সংস্কৃতিতে ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত দেয়। রাষ্ট্রকে আবারও নতুন সংকটের দিকে নিয়ে যাওয়ার চক্রান্তের নকশা।”
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আইজিপির অপসারণ দাবি করে বিবৃতি দিয়েছে। খেলাফত মজলিসও তার মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে।
খেলাফত মজলিসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বলা হয়েছে, “ক্রসফায়ার হুমকি কিংবা মব জাস্টিস উসকে দেওয়ার সংস্কৃতি সভ্য সমাজে চলতে পারে না।”
এক বিবৃতিতে দলটির আমির মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ ও মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, “বাংলাদেশে আইনি বা সাংবিধানিকভাবে ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কোনো বৈধতা নেই। কোনো নির্বাহী সিদ্ধান্ত বা সরকারি অনুমতি এই সাংবিধানিক অধিকারকে বাতিল বা স্থগিত করতে পারে না। সরকারের কোনো প্রশাসনিক অনুমোদনই বিচারবহির্ভূত হত্যাকে আইনি বৈধতা দিতে পারে না।”