নিষ্ক্রিয় মোবাইল হিসাবের পেছনে গ্রাহকের ভয় ও অনাস্থা

০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৫৮ PM
 মো. সাকির হোসেন

মো. সাকির হোসেন © টিডিসি ছবি

মোবাইল আর্থিক সেবার সাফল্য বোঝাতে সাধারণত হিসাবের সংখ্যাটাই সামনে আনা হয়। দেশে এখন নিবন্ধিত হিসাব প্রায় সাড়ে চব্বিশ কোটি। সংখ্যাটা দেশের জনসংখ্যার চেয়ে বেশি। কিন্তু এর ৪০ শতাংশের মতো হিসাব সক্রিয়, অর্থাৎ সেগুলোতে গত তিন মাসে অন্তত একবার লেনদেন হয়েছে। বাকিগুলোতে এই সময়ে কোনো লেনদেন হয়নি। আবার হিসাবের সংখ্যা আর ব্যবহারকারীর সংখ্যাও এক নয়। একজন মানুষের দুই-তিনটি প্রতিষ্ঠানে বা দুটি মোবাইল নম্বরে হিসাব থাকতে পারে। ফলে আসলে কতজন মানুষ নিয়মিত লেনদেন করছেন, সেই সংখ্যা মোট হিসাবের চেয়ে অনেক কম হওয়ার কথা।

কেউ ওয়ালেট নিয়মিত ব্যবহার করেন, কেউ কিছুদিন পর ছেড়ে দেন। যাঁরা নিয়মিত ব্যবহার করেন, তাঁরা মূলত কাজের সুবিধার জন্যই করেন। রাত এগারোটায় মনে পড়ল কাল বিদ্যুতের বিল দেওয়ার শেষ দিন, ঘরে বসেই দিয়ে দেওয়া গেল। পাড়ার অনেক দোকানি প্রথমে ক্রেতাদের চাপে ডিজিটাল লেনদেন নিতে শুরু করেছিলেন। পরে দেখেছেন, সন্ধ্যায় নগদ টাকার হিসাব মেলানোর ঝামেলা কমেছে, ভাঙতির সমস্যাও নেই। এখন তাঁরা নিজেরাই ক্রেতাকে ওয়ালেটে দাম দিতে বলেন। চায়ের দোকানেও আজকাল কিউআর কোড ঝোলে। দশ টাকার চা খেয়েও অনেকে ফোনে দাম মেটান। অন্যদিকে যাঁর মাসে দুই-একটা লেনদেন, তাঁর কাছে অ্যাপটার তেমন দরকার পড়ে না।

আরেক ধরনের ব্যবহারকারী আছেন, যাঁদের হিসাবে টাকা আসে কিন্তু থাকে না। প্রবাসী ছেলের পাঠানো টাকা বা সরকারি ভাতা ঢোকার দিনই অনেকে এজেন্টের দোকানে গিয়ে পুরোটা তুলে ফেলেন। ওয়ালেট তাঁদের কাছে টাকা আসার একটা পথ মাত্র, রাখার জায়গা নয়। কেউ বলেন, ফোনে টাকা রাখলে কখন কী হয় বলা যায় না। কেউ আবার নগদ হাতে না পেলে ঠিক স্বস্তি পান না। এই মানুষদের হিসাব খাতায় সক্রিয় দেখা গেলেও তাঁরা আসলে ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত হননি।

অ্যাপ সহজ হলে ব্যবহারকারী বাড়বে, এমন ধারণা একসময় ছিল। এখন দেশের প্রায় সব ওয়ালেটই চালানো সহজ। বাংলা মেনু আছে, ধাপগুলোও মোটামুটি একই রকম। ফলে কোনো ওয়ালেট শুধু সহজ হওয়ার কারণে বাড়তি গ্রাহক পাচ্ছে, এমনটা দেখা যায় না। জটিল হলে অবশ্য মানুষ সরে যেত।

প্রযুক্তিজ্ঞান কম থাকলেও মানুষ ওয়ালেট ব্যবহার করছেন। অনেক পরিবারে একজনের ফোন কয়েকজন মিলে চালান। বাবার হয়ে ছেলে টাকা পাঠায়, দোকানি ক্রেতার হয়ে নম্বর টিপে দেন, পাশের বাসার কলেজপড়ুয়া মেয়েটা বিল দেওয়ার নিয়ম দেখিয়ে দেয়। সমস্যাটা নিরাপত্তায়। কোনো প্রতিষ্ঠান ফোন করে গোপন নম্বর চায় না, এটা যিনি জানেন না, প্রতারকের ফাঁদে তিনিই সহজে পড়েন। অনেক বয়স্ক মানুষ এজেন্টের দোকানে গিয়ে নিজের পিন নম্বর মুখে বলে দেন, কেউ কাগজে লিখে ফোনের কভারের ভেতর রেখে দেন। অন্যের সাহায্য নিয়ে যিনি লেনদেন করেন, তাঁর পিন বা ওটিপি আশপাশের অনেকেই জেনে যান।

ঈদ বা পয়লা বৈশাখে ওয়ালেট প্রতিষ্ঠানগুলো নানা রকম ছাড় দেয়। তবে ছাড় দেখে মানুষ কোনো ওয়ালেটে স্থায়ী হয়, এমনটা আমার মনে হয় না। ক্যাশব্যাকের লোভে কেউ হয়তো একবার লেনদেন করেন, কিন্তু নিয়মিত ব্যবহারকারী হন না। ছাড় শেষ হলে তাঁর আগ্রহও কমে যায়। এত হিসাব নিষ্ক্রিয় পড়ে থাকার একটি কারণ সম্ভবত এটি। কেউ কেউ একেক উৎসবে একেক প্রতিষ্ঠানের অফার দেখে নতুন হিসাব খোলেন, পুরোনোটা আর খোলেন না। এতে হিসাবের সংখ্যা বাড়ে, কিন্তু নিয়মিত গ্রাহক বাড়ে না। ক্যাশব্যাকের খরচও প্রতিষ্ঠানকে কোথাও থেকে তুলতে হয়, সেই চাপ শেষ পর্যন্ত সেবা মাশুলে পড়তে পারে।

ওয়ালেট থেকে মানুষকে সবচেয়ে বেশি দূরে রাখে টাকা হারানোর ভয়, সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের দুশ্চিন্তা। "আপনার অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে, কোডটা বলুন" জাতীয় ফোন কমবেশি সবাই পেয়েছেন। কেউ পুরস্কার জেতার বার্তা পাঠিয়ে লিংকে চাপ দিতে বলে, কেউ ওয়ালেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা পরিচয়ে ফোন করে। পরিচিত কেউ এভাবে টাকা হারালে সেই খবর দ্রুত ছড়ায়, ভয়ও বাড়ে। যিনি কখনো ওয়ালেট খোলেননি, তিনিও তখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যে ওদিকে যাবেন না।

কারও টাকা হয়তো মাত্র দুই দিন আটকে ছিল। সেই দুই দিনে তাঁকে হেল্পলাইনে বারবার ফোন করতে হয়েছে, প্রতিবার নতুন একজনকে পুরো ঘটনা প্রথম থেকে বলতে হয়েছে। টাকা ফেরত পেলেও তিনি আর ওয়ালেটে টাকা রাখতে চান না, পরিচিতদেরও নিষেধ করেন। অভিযোগ করার পর প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ নিজে ফোন করে খবর দিলে তাঁর অভিজ্ঞতাটা হয়তো অন্য রকম হতো। একজন অসন্তুষ্ট গ্রাহকের কথা পাড়ায় যত দ্রুত ছড়ায়, কোনো বিজ্ঞাপন তত দ্রুত পৌঁছায় না।

সাধারণ ব্যবহারকারী জানেন না একটি ওয়ালেটের প্রযুক্তিগত সুরক্ষা কতটা মজবুত। তিনি ঝুঁকি মাপেন অন্যের কাছে শোনা কথা আর নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে। তাই প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা বাড়ালেও গ্রাহক সেটা টের না পেলে তাঁর ভয় কমে না। লেনদেনের পরপরই একটা পরিষ্কার বার্তা আসা, কিংবা অস্বাভাবিক কোনো লেনদেনের আগে প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ফোন পাওয়া, এমন ছোট অভিজ্ঞতায় গ্রাহক বোঝেন যে তাঁর হিসাবের দিকে কেউ নজর রাখছে। নতুন কোনো সুরক্ষাব্যবস্থা চালু হলে সেটা সহজ ভাষায় জানানোও দরকার।

এই ভয় অনেকটা কমায় পরিচিত ব্র্যান্ড। যে নাম মানুষ বহুদিন ধরে শুনছে, যার অফিস বা এজেন্ট আশপাশে দেখা যায়, তার ওপর ভরসা সহজে আসে। ভরসা থাকলে ঝুঁকির চিন্তা কমে, সুবিধাগুলোও তখন বেশি কাজে লাগে বলে মনে হয়। অচেনা দোকান থেকে দামি জিনিস কিনতে আমরা ইতস্তত করি, চেনা দোকানে বাকিতেও কিনি। টাকার লেনদেনে এই প্রবণতা আরও বেশি। নতুন কোনো ওয়ালেট যত সুবিধাই দিক, মানুষ প্রথমে খোঁজ নেয় চেনাজানা কেউ সেটা ব্যবহার করেন কিনা।

ব্র্যান্ড পরিচিতি বাড়াতে প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত বিজ্ঞাপন আর তারকাদের ওপর ভরসা করে। তাতে নাম পরিচিত হয়। গ্রাহকের আস্থা অবশ্য তৈরি হয় সেবার অভিজ্ঞতা থেকে। ভুল নম্বরে টাকা গেলে কত দিনে ফেরত পাওয়া গেল আর হেল্পলাইনে কেউ ফোন ধরল কিনা, গ্রাহক এসব মনে রাখেন। গ্রামে অনেকের কাছে ওয়ালেট মানে বাজারের এজেন্টের দোকান। সেখানে বাড়তি টাকা কেটে রাখা হলে বিজ্ঞাপন দিয়ে সেই ক্ষতি পোষানো যায় না। কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের খবর বেরোলে পুরো খাতের ওপরই মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে।

প্রতিষ্ঠানগুলো ক্যাশব্যাকের বাজেটের একটা অংশ অভিযোগ নিষ্পত্তি, গ্রাহকসেবা আর এজেন্টদের প্রশিক্ষণে খরচ করলে বেশি লাভবান হবে বলে আমার বিশ্বাস। হেল্পলাইনে একই সমস্যা যেন বারবার বলতে না হয়, অভিযোগের অবস্থা যেন গ্রাহক অ্যাপেই দেখতে পান, এমন ছোট পরিবর্তনেও অনেক কাজ হয়।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিয়ম কড়া করছে, সেটা দরকারি। তবে সাধারণ গ্রাহক নিয়মকানুনের খোঁজ রাখেন না। টাকা আটকালে কেউ ফোন ধরবে কিনা আর অভিযোগ করলে কেউ খোঁজ নেবে কিনা, তিনি মূলত এটুকুই দেখেন।

সবাই অবশ্য নিজের পছন্দে ওয়ালেট খোলেন না। কারও বেতন আসে এই পথে, কেউ বন্ধুদের দেখে শুরু করেন। ঢাকার তরুণ চাকরিজীবী আর উত্তরবঙ্গের বয়স্ক কৃষকের অভিজ্ঞতাও আলাদা। প্রথমজনের কাছে যা রোজকার অভ্যাস, দ্বিতীয়জনের কাছে তা নতুন ঝুঁকি। লেনদেনের খরচ বেশি মনে হলে কেউ কেউ আবার নগদে ফিরে যান। ফলে সবার জন্য এক রকম প্রচারণা বা এক রকম অফার দিয়ে কাজ হয় না। প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদা আলাদা গ্রাহকের প্রয়োজন বুঝতে হবে।

হিসাব খোলানোর দিক থেকে খাতটি অনেক দূর এগিয়েছে। যাঁরা হিসাব খুলে আর ফেরেননি, তাঁদের ফিরিয়ে আনাটাই এখন বড় কাজ। বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি হেল্পলাইন আর এজেন্টের সেবার মান নিয়েও সমান মনোযোগ দেয়, পড়ে থাকা হিসাবগুলোর অনেকগুলোতে আবার লেনদেন শুরু হতে পারে।

লেখক: মো. সাকির হোসেন,
রেজিস্ট্রার, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি

শিক্ষকদের মাঝে যারা প্রশাসনে ভালো করছেন, তাদের নিয়ে শিক্ষা…
  • ০৮ নভেম্বর ২০২৬
দীর্ঘ এক যুগ পর মাওলানা ফারুকী হত্যা মামলায় ৬ আসামির বিচার…
  • ০৮ নভেম্বর ২০২৬
সান্ধ্যকালীন ডিগ্রিধারীরাও অংশ নিতে পারবেন ইবির ৫ম সমাবর্তনে
  • ০৮ নভেম্বর ২০২৬
এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও একই হারে পে-স্কেল পেতে যাচ্ছে
  • ০৮ নভেম্বর ২০২৬
ছিটকে যাচ্ছেন সাদমান, ওপেনিংয়ে আলোচনায় নতুন মুখ
  • ০৮ নভেম্বর ২০২৬
আত্মহত্যার চেষ্টা, ৯৯৯ কল দিয়ে প্রাণে বাঁচলেন তরুণী
  • ০৮ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950