শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য: কেন এখনো উদাসীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো?

১২ জুলাই ২০২৬, ০৯:০০ PM , আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৯:০১ PM
জয় পাল অর্ঘ

জয় পাল অর্ঘ © টিডিসি সম্পাদিত

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে বলা হয় জীবনের সবচেয়ে সোনালি সময়। এর পেছনে রয়েছে যথেষ্ট কারণ। দীর্ঘ প্রতিযোগিতা ও কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। তারুণ্যের উদ্দীপনা, জ্ঞানচর্চার আগ্রহ এবং ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে বিভোর থাকার কথা তার এই সময়টাতে। 

কিন্তু বাস্তবতার নির্মম সত্য হলো, আমাদের দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আজ আর শুধু জ্ঞান অর্জনের কেন্দ্র নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো রূপ নিয়েছে মানসিক চাপের এক নীরব কারখানায়।

প্রতিনিয়ত সংবাদপত্রের পাতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চোখ রাখলেই দেখা যায় কোনো না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর। 

২০২৫ সালে বাংলাদেশে ৭৭ জন এবং ২০২৪ সালে ৮২ জন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন ।অ্যাকাডেমিক চাপ, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, পারিবারিক প্রত্যাশা, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা একাকীত্ব— নানা কারণে মানসিক বিপর্যয়ে ভুগে ঝরে যাচ্ছে অসংখ্য তরুণ প্রাণ। 

অথচ এই সংকট মোকাবিলায় আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা এখনো অত্যন্ত সীমিত ও হতাশাজনক। প্রশ্ন জাগে— শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এত উদাসীন কেন? আর এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথই বা কী?

সমস্যার অন্যতম মূল কারণ আমাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গি। এখনো অনেক ক্ষেত্রেই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাকে প্রকৃত অসুস্থতা হিসেবে দেখা হয় না। কোনো শিক্ষার্থী যদি হতাশা, উদ্বেগ কিংবা বিষণ্ণতার কথা প্রকাশ করে, তবে তাকে প্রায়ই ‘মন খারাপ’, ‘সাময়িক ক্লান্তি’ বা ‘অতিরিক্ত চিন্তা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। 

অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, পরিপূর্ণ সুস্থতা বলতে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক সুস্থতার সমন্বয়কে বোঝায়। এই ভুল ও বিজ্ঞানবিরোধী ধারণার কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিজের কষ্টের কথা প্রকাশ করতে পারে না। লোকলজ্জা ও সামাজিক অপবাদের ভয়ে তারা নিজেদের গুটিয়ে নেয়, যা অনেক সময় ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়।

দ্বিতীয়ত, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশেই যান্ত্রিক ও প্রতিযোগিতামুখী। ক্রেডিট আওয়ারের চাপ, ল্যাব রিপোর্টের কঠোর ডেডলাইন, সিজিপিএ-নির্ভর মূল্যায়ন এবং নিরবচ্ছিন্ন প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের এক ধরনের মানসিক ক্লান্তির মধ্যে ফেলে দেয়। 

পরীক্ষার রুটিন বা পাঠ্যক্রম প্রণয়নের সময় শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক ধারণক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার মতো কার্যকর নীতিমালা অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই অনুপস্থিত। ফলে একজন শিক্ষার্থীর মানসিক সুস্থতা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভাবার সুযোগ কিংবা উদ্যোগ— দুটোরই অভাব স্পষ্ট।

এই সংকটকে আরও গভীর করেছে ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত ও দক্ষ মনোবিজ্ঞানীর অনুপস্থিতি। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত পরিসরে কাউন্সেলিং সেবা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মানসিক সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজন পূর্ণকালীন, অভিজ্ঞ ও পেশাদার ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট এবং একটি সুসংগঠিত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কাঠামো। 

একজন শিক্ষার্থী যখন তীব্র বিষণ্ণতা বা উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভোগে, তখন কোথায় যাবে, কার কাছে সহায়তা পাবে কিংবা কীভাবে গোপনীয়তা বজায় রেখে কাউন্সেলিং গ্রহণ করবে— সে বিষয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো স্পষ্ট ব্যবস্থা নেই। দুঃখজনক হলেও সত্য, নতুন ভবন নির্মাণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতার জন্য স্থায়ী মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এখনো পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।

এ ছাড়া মধ্যবিত্ত পরিবারের উচ্চ প্রত্যাশা এবং চাকরির বাজারের তীব্র অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে উঠতেই অনেকের সামনে বেকারত্বের শঙ্কা বড় হয়ে দেখা দেয়। 

বিসিএস, উচ্চশিক্ষা কিংবা কর্পোরেট চাকরির কঠিন প্রতিযোগিতায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে না পারলে সমাজ অনেক সময় তাকে ‘ব্যর্থ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন কিছু শিক্ষার্থী আত্মহত্যার মতো চরম ও বেদনাদায়ক পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়।

একটি রাষ্ট্র বা সমাজের প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার ওপর। অবকাঠামোগত উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু যে তরুণদের হাত ধরে দেশ এগিয়ে যাবে, তাদের মন যদি ভেতরে ভেতরে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, তবে সেই উন্নয়নের স্থায়িত্ব ও মূল্য দুটোই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

তাই এখনই সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দীর্ঘদিনের উদাসীনতা কাটিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত সংখ্যক স্থায়ী ও পেশাদার মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ, সহজলভ্য ও গোপনীয় কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিতকরণ, নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টকে শিক্ষাব্যবস্থার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশাসনের মধ্যে একটি সহানুভূতিশীল ও সহযোগিতামূলক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।

আমরা আর কোনো শিক্ষার্থীর অকালমৃত্যুর খবর শুনতে চাই না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু ভালো ফলাফল বা উচ্চ সিজিপিএ তৈরির যান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান না হয়ে উঠুক জীবন গড়ার, স্বপ্ন দেখার এবং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার নিরাপদ আশ্রয়স্থল। প্রশাসনকে তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতেই হবে— কারণ জীবন কোনো সিজিপিএর চেয়ে অনেক বড়, অনেক মূল্যবান।

লেখক: জয় পাল অর্ঘ
শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

টঙ্গীতে সাবেক ছাত্রদল নেতার ওপর হামলার অভিযোগ
  • ১২ জুলাই ২০২৬
নেত্রকোনায় ১৪ পিস ইয়াবাসহ যুবক আটক
  • ১২ জুলাই ২০২৬
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের …
  • ১২ জুলাই ২০২৬
বাড়লো গুচ্ছের চূড়ান্ত ভর্তির সময়
  • ১২ জুলাই ২০২৬
শ্রেণিকক্ষে হাঁটুসমান পানি, চার দিন ধরে বন্ধ মাদ্রাসার পাঠদ…
  • ১২ জুলাই ২০২৬
নকল ব্যান্ডেজ লাগিয়ে আদিবাসী ছাত্র-জনতা ওপর হামলাকারী সেই খ…
  • ১২ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence