হাবিব আল মিসবাহ © সংগৃহীত
বাংলাদেশে বর্ষা নতুন নয়। বন্যাও নতুন নয়, নতুন নয় পাহাড়ধস কিংবা জলাবদ্ধতার ঘটনাও। নতুন যদি কিছু থেকে থাকে, সেটি হলো প্রতিবছর একই দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি, একই অসহায়ত্ব, একই কান্না এবং একই প্রতিশ্রুতির চক্র। বছর ঘুরে বর্ষা আসে, আর আমরা আবারও দেখি ডুবে যাওয়া শহর, ভেসে যাওয়া গ্রাম, পাহাড়চাপা পড়া মানুষের মরদেহ, পানিবন্দি লাখো পরিবার এবং অসহায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস।
চলতি জুলাই মাসের ভারী বর্ষণ যেন আবারও প্রমাণ করল, বাংলাদেশ এখনও প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়ে পরিকল্পনাহীনতার কাছে বেশি অসহায়।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং জোয়ারের পানির সম্মিলিত প্রভাবে চট্টগ্রাম নগরী থেকে শুরু করে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালীসহ বিস্তীর্ণ জনপদ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোমরসমান, কোথাও বুকসমান পানি, এমনকি কোথাও কোথাও বহুতল ভবন ও পানির নিচে। বহু সড়ক বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মর্মান্তিক বিষয় হলো, বন্যা ও পাহাড়ধসে কয়েক দিনের মধ্যেই ৩০ জনের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে রয়েছে বৃদ্ধ, নারী ও শিশু।
চট্টগ্রামের এই দুর্যোগ শুধু মানুষের জীবনই কেড়ে নেয়নি, অর্থনীতিতেও বড় আঘাত হেনেছে। হাজার হাজার পুকুর ও দিঘির মাছ বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। বহু মানুষ এক রাতেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। কৃষিজমি তলিয়ে গেছে, গবাদিপশু হারিয়েছে অসংখ্য পরিবার। দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষতি শুধু মৃত্যুর সংখ্যায় নয়, হাজারো মানুষের ভেঙে পড়া জীবিকাতেও লুকিয়ে আছে।
চট্টগ্রামের বাইরে ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, সুনামগঞ্জ এবং দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরাতেও ভারী বর্ষণ ও নদীর পানি বৃদ্ধি মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। কোথাও নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁয়েছে, কোথাও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে ফেনীর মানুষ এখনও ২০২৪ সালের স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষত ভুলতে পারেনি। সেই ক্ষত শুকানোর আগেই আবারও ভারী বর্ষণ ও উজানের পানির চাপ নতুন শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। মুহুরী ও সিলোনিয়া নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নাঞ্চলের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। একই চিত্র নোয়াখালী ও কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকাতেও দেখা যায়। এ বাস্তবতা স্পষ্ট করে যে, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি।
খুলনা বিভাগের পরিস্থিতি বছরের পর বছর একই রকম থেকে যাচ্ছে। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ এলাকায় অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের পানি একসঙ্গে দেখা দিলে দিনের পর দিন পানি আটকে থাকে। নদী-খালের নাব্যতা হ্রাস, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, উপকূলীয় পোল্ডার ও বাঁধ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। অনেক এলাকায় মানুষকে হাঁটু কিংবা কোমরসমান পানির মধ্য দিয়েই দৈনন্দিন জীবন চালাতে হয়। কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়ে, চিংড়িঘের ও মাছের খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা স্থানীয় অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা এবং কার্যকর টিআরএম (Tidal River Management) বাস্তবায়ন ছাড়া এই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
রাজধানী ঢাকাও এই সংকটের বাইরে নয়। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই প্রধান প্রধান সড়ক পানির নিচে চলে যায়। যানজটে আটকে থাকে হাজারো মানুষ, অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত গন্তব্যে পৌঁছাতে হিমশিম খায়। একটি আধুনিক রাজধানীতে এমন দৃশ্য শুধু নাগরিক দুর্ভোগ নয়, এটি নগর পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতারও প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশের মানুষ জানে, বন্যা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়। কারণ আমাদের ভূ-প্রকৃতি, শত শত নদী, উজানের ঢল এবং মৌসুমি বর্ষা মিলেই এই ভূখণ্ডের বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছে। কিন্তু জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধসে প্রাণহানি এবং অল্প বৃষ্টিতেই শহর অচল হয়ে যাওয়াকে কখনোই স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না।
আজ যে খালগুলো বৃষ্টির পানি বহন করার কথা, সেগুলো অনেকজয়গায় দখল হয়ে আছে ব্যাবসায়িক কাজে কোনো সিন্ডিকেটের হাতে। যে জলাধারগুলো অতিরিক্ত পানি ধারণ করার কথা, সেগুলোর জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে বহুতল ভবন, আবাসন প্রকল্প কিংবা বাণিজ্যিক স্থাপনা। নদীর নাব্যতা কমেছে, খাল ভরাট হয়েছে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা অপরিকল্পিতভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। শহর বড় হয়েছে, কিন্তু পানি চলাচলের পথ ছোট হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি বের হওয়ার স্বাভাবিক পথ হারিয়ে গেছে।
পাহাড়ি অঞ্চলের সংকট আরও উদ্বেগজনক। বছরের পর বছর অবৈধভাবে পাহাড় কাটা, ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে বসতি নির্মাণ এবং বন উজাড়ের কারণে পাহাড়ধস এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। প্রতিবছর মানুষ মারা যায়, কিন্তু পরের বছর একই পাহাড়ে আবারও মানুষ বসবাস করতে বাধ্য হয়। কারণ নিরাপদ পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখন অল্প সময়ে অস্বাভাবিক পরিমাণ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। অতিবৃষ্টি, উজানের ঢল এবং উচ্চ জোয়ারের মতো তিনটি বিষয় একসঙ্গে ঘটলে বাংলাদেশের বিদ্যমান অবকাঠামো দ্রুত ভেঙে পড়ে। আবহাওয়া ও বন্যা পূর্বাভাস সংস্থাগুলো আগাম সতর্কবার্তা দিলেও সেই তথ্যকে মাঠপর্যায়ে কার্যকর প্রস্তুতিতে রূপান্তর করার সক্ষমতা এখনও সীমিত।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জুলাই মাসেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিল। প্রশ্ন হলো, সেই সতর্কবার্তার ভিত্তিতে কতটা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল? আগাম সতর্কতা তখনই কার্যকর হয়, যখন সেটি দ্রুত স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়। কিন্তু আমাদের বাস্তবতায় অনেক সময় সতর্কবার্তা সংবাদ শিরোনামেই সীমাবদ্ধ থাকে, মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্নআয়ের মানুষ। একজন দিনমজুরের কাছে কয়েক দিন কাজ বন্ধ থাকা মানে পরিবারের চুলায় আগুন না জ্বলা। একজন কৃষকের কাছে তলিয়ে যাওয়া একটি জমি মানে বছরের সঞ্চয় হারিয়ে ফেলা। একজন মৎস্যচাষীর কাছে ভেসে যাওয়া একটি পুকুর মানে নতুন করে ঋণের বোঝা কাঁধে নেওয়া। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দোকান পানিতে তলিয়ে যায়, রিকশাচালক কিংবা ভ্যানচালকের আয় বন্ধ হয়ে যায়, শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যেতে পারে না, অনেকের বই-খাতা নষ্ট হয়ে যায়। বন্যার পানি নেমে গেলেও এসব পরিবারের অর্থনৈতিক ক্ষত অনেক দিন পর্যন্ত থেকে যায়। তাই একটি বন্যা শুধু কয়েক দিনের দুর্ভোগ নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটেরও নাম।
দুর্যোগের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে জনস্বাস্থ্যের ওপর। জলাবদ্ধতার কারণে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়, পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে, ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও সাপের কামড়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত মানুষকে খাদ্য, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে বন্যা কেবল অবকাঠামো নয়, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেও কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করায়।
দুঃখের বিষয়, দুর্যোগের পর আমরা সাধারণত ত্রাণ, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা এবং পুনর্বাসনের আলোচনা করি। কিন্তু দুর্যোগের আগেই ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে যতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত, বাস্তবে তা খুব কমই দেখা যায়। ফলে প্রতিবছর একই অভিজ্ঞতা, একই সংবাদ শিরোনাম এবং একই মানবিক বিপর্যয় আমাদের সামনে ফিরে আসে।
এখন সময় এসেছে, বন্যা ও জলাবদ্ধতাকে কেবল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে না দেখে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করার। নদী, খাল, বিল ও জলাধার দখলমুক্ত করে তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। নগর ও গ্রামীণ উভয় এলাকায় আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং সমন্বিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাহাড় কাটা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, নদী ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আগাম সতর্কবার্তা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্ষম করে তোলা জরুরি।
বাংলাদেশের মানুষ দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করতে জানে। ইতিহাস বলে, এই দেশের মানুষ প্রতিকূলতার মধ্যেও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের সাফল্য কেবল দুর্যোগের পর ত্রাণ বিতরণে নয়, বরং দুর্যোগকে বিপর্যয়ে পরিণত হওয়ার আগেই তা মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জনে।
প্রশ্নটি তাই শুধু এই নয় যে, এবার কত মানুষ মারা গেল বা কত এলাকা প্লাবিত হলো। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, আগামী বর্ষায়ও কি আমরা একই সংবাদ পড়ব, একই শোক পালন করব, একই প্রতিশ্রুতি শুনব? নাকি এবার আমরা শিক্ষা নেব?
বর্ষা বাংলাদেশের শত্রু নয়। বরং এই বর্ষাই আমাদের কৃষি, নদী, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের প্রাণ। তাই বর্ষাকে দোষারোপ নয়, বরং এমন একটি পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও দুর্যোগ-সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলাই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। যেখানে অতিবৃষ্টি মানেই মানবিক বিপর্যয় হবে না, বন্যা মানেই অসহায়ত্ব হবে না, আর জলাবদ্ধতা বাংলাদেশের চেনা বাস্তবতা হয়ে থাকবে না। কারণ একটি দেশের সক্ষমতা দুর্যোগ এড়িয়ে চলায় নয়, বরং দুর্যোগকে দূরদর্শিতা, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং সুশাসনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যেই নিহিত। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়, আমরা কি প্রতিবছর একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করব, নাকি আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সহনশীল ও পরিকল্পিত বাংলাদেশ গড়ে তুলব।
লেখক,
হাবিব আল মিসবাহ
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মী