সম্পত্তি বন্টন © সংগৃহীত
শাখাওয়াত-ফারহানা (ছদ্মনাম) দম্পতির একমাত্র সন্তান একটি কন্যা। মেয়েটির বয়স এখনও ১৮ হয়নি এবং ভবিষ্যতে নতুন কোনো সন্তান হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। পৈতৃক সূত্রে শাখাওয়াত বিশাল সম্পদের মালিক। কিন্তু তাঁদের দুশ্চিন্তা, ভবিষ্যতে শাখাওয়াত মারা গেলে এই একমাত্র মেয়ে কি তাঁর সম্পত্তির পূর্ণ অধিকার পাবে, নাকি পরিবারের অন্য সদস্যরা—যেমন ভাই ও ভাতিজারা—তাতে ভাগ বসাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তাঁরা একজন আইনজীবীর শরণাপন্ন হন। কারণ, তাঁরা নিশ্চিত হতে চান যে, তাঁদের অনুপস্থিতিতে মেয়েটি যেন সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ থাকে এবং প্রাপ্য সম্পদ থেকে যেন বঞ্চিত না হয়।
ইসলামি আইন কী বলছে?
মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির যদি কেবল একটি মেয়ে থাকে এবং ছেলে না থাকে, তবে সেই মেয়ে তাঁর মোট সম্পত্তির অর্ধেকের অধিকারী হন। যদি একাধিক মেয়ে থাকে, তবে তারা সবাই মিলে সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ পায় এবং সেটা তাদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হয়। অবশিষ্ট অংশ যায় মৃত ব্যক্তির অন্য ওয়ারিশদের কাছে।
শাখাওয়াতের ক্ষেত্রে, যদি তাঁর মৃত্যুর সময় স্ত্রী জীবিত না থাকেন, তাহলে তাঁর মেয়ে সম্পত্তির অর্ধেক পাবে। বাকি অর্ধেক পাবে শাখাওয়াতের ভাই এবং তাঁদের সন্তানরা। কিন্তু যদি স্ত্রী জীবিত থাকেন, তবে স্ত্রী পাবেন মোট সম্পত্তির এক-অষ্টমাংশ, মেয়ে পাবেন অর্ধেক এবং বাকিটুকু যাবে অন্যান্য উত্তরাধিকারীদের কাছে।
কন্যাকে জীবিতাবস্থায় সম্পত্তি দান করা কি সম্ভব?
জবাব হলো—হ্যাঁ, সম্ভব। যে কেউ ইচ্ছা করলেই জীবদ্দশায় তাঁর মেয়ে বা মেয়েদের সম্পত্তি দান করে যেতে পারেন। তবে এর জন্য কিছু শর্ত পূরণ করা বাধ্যতামূলক। যেমন:
ঘোষণা: দানটি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে।
হস্তান্তর: দানকৃত সম্পত্তি কন্যার দখলে দিতে হবে। যদি সে অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়, তাহলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর হস্তান্তর করতে হবে।
রেজিস্ট্রি: দানের দলিল অবশ্যই রেজিস্ট্রার অফিসে রেজিস্ট্রি করতে হবে।
শাখাওয়াত যদি তাঁর কন্যাকে এখনই সম্পত্তি দান করতে চান, তাহলে সেটি সম্ভব। তবে যেহেতু মেয়েটি এখনও প্রাপ্তবয়স্ক নয়, তাই দানকৃত সম্পত্তির পূর্ণ দখল দিতে হবে তার বয়স ১৮ পূর্ণ হওয়ার পর।
মেয়েকে দান মানে কি বাবা-মার অপসারণ?
এমনটা নয়। বাবা-মা মেয়েকে সম্পত্তি দান করলেও তারা চাইলে মেয়ের সঙ্গেই সেই সম্পত্তিতে বসবাস করতে পারবেন। এমনকি মেয়ের বিয়ের পরও, সেই সম্পত্তিতে বাবা-মার বসবাসে কোনো আইনি বাধা থাকবে না।
তবে এক্ষেত্রে মেয়েরও দায়িত্ব রয়েছে—বাবা-মায়ের দানকৃত সম্পত্তি গ্রহণ করে যেন তাঁদের অবহেলা বা বঞ্চিত না করেন। অন্যথায়, বাবা-মাও তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইনের দ্বারস্থ হতে পারেন।
উইল করলে কী হবে?
অনেকে মনে করেন, মেয়েকে সম্পত্তি উইল করে দেওয়া ভালো বিকল্প। তবে ইসলামী আইনে উইলের মাধ্যমে সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ প্রদান করা যায়। এর বেশি উইল করতে চাইলে অন্যান্য ওয়ারিশদের অনুমতি প্রয়োজন হয়। আর উইল কার্যকর হয় সম্পত্তি প্রদানকারীর মৃত্যুর পর, জীবদ্দশায় নয়।
শাখাওয়াত-ফারহানার মতো অনেকেই একমাত্র কন্যাসন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত থাকেন। এ ক্ষেত্রে আইন জানা ও প্রয়োগ করাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। জীবদ্দশায় সঠিক প্রক্রিয়ায় দানই হতে পারে কন্যার নিরাপদ ভবিষ্যতের মূল চাবিকাঠি। তবে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ।