ঈদুল ফিতর উদযাপন © প্রতীকী ছবি
মুসলিম উম্মাহর জন্য ঈদ আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও ইবাদতের এক অনন্য দিন। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর আসে পবিত্র ঈদুল ফিতর, যা মুমিনদের জন্য পুরস্কারের বার্তা বহন করে। তাই এ দিনটি শুধু উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সুন্নত অনুযায়ী জীবনযাপন, ইবাদতে মনোযোগ এবং পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
ঈদের দিনের অন্যতম করণীয় হলো সকালে গোসল করে পরিচ্ছন্ন হওয়া। সাহাবায়ে কেরাম এ আমল করতেন। হজরত নাফে (রহ.) বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার আগে গোসল করতেন (মুয়াত্তায়ে মালিক ৪৮৮)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি উত্তমভাবে গোসল করতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন এবং সেরা পোশাক পরে ঈদের নামাজে যেতেন (শরহুস সুন্নাহ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩০২)।
ঈদের দিন নিজের সাধ্যমতো উত্তম পোশাক পরিধান করাও মুস্তাহাব। হজরত নাফে (রহ.) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) দুই ঈদের দিন সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করতেন (বাইহাকি ৬১৪৩)। উত্তম পোশাক মানেই নতুন পোশাক নয়, বরং নিজের কাছে থাকা ভালো পোশাক পরিধান করাই যথেষ্ট।
ঈদুল ফিতরের গুরুত্বপূর্ণ করণীয়গুলোর মধ্যে সদকাতুল ফিতর আদায় অন্যতম। যাদের নেসাব পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তাদের ওপর ফিতরা ওয়াজিব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে ফিতরা আদায় করতে (বুখারি ১৫০৯)। হজরত নাফে (রহ.) বর্ণনা করেন, সাহাবিরা ঈদের এক বা দুই দিন আগে ফিতরা আদায় করতেন (আবু দাউদ ১৬০৬)। নির্ধারিত সময়ে আদায় না হলে পরে অবশ্যই তা আদায় করতে হবে।
ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার আগে কিছু খাওয়া মুস্তাহাব। হজরত আনাস (রা.) বলেন, নবী (সা.) ঈদের দিন খেজুর না খেয়ে বের হতেন না এবং বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেতেন (বুখারি ৯৫৩)। পাশাপাশি ঈদের দিন বেশি বেশি তাকবির পাঠ করাও সুন্নত। হজরত নাফে (রহ.) বলেন, ইবনে ওমর (রা.) ঈদগাহে যাওয়া থেকে ইমাম আসা পর্যন্ত তাকবির বলতে থাকতেন (দারাকুতনী ১৭১৬)।
ঈদের দিনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো ঈদের নামাজ আদায় করা। ঈদের নামাজ দুই রাকাত ওয়াজিব, যা জামাতে আদায় করতে হয় এবং খোলা ময়দানে আদায় করা উত্তম (ফতোয়ায়ে শামি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৯)। এছাড়া ঈদের দিন একে অপরের জন্য দোয়া করা এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সাহাবিরা একে অপরকে বলতেন—‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম’, অর্থাৎ আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের আমল কবুল করুন (ফাতহুল বারি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৬)।
আরও পড়ুন: পবিত্র ঈদুল ফিতর আজ
ঈদের দিন এতিম ও অভাবীদের খোঁজ নেওয়া, তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা এবং সম্ভব হলে নতুন পোশাকের ব্যবস্থা করে দেওয়া ঈমানদারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা আল্লাহর ভালোবাসায় অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে খাদ্য দান করে’ (সুরা দাহর: আয়াত ৮)। পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া, মনোমালিন্য দূর করা এবং সম্পর্ক সুদৃঢ় করারও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন।
একই সঙ্গে ঈদের দিনে আনন্দ প্রকাশ করাও সুন্নতের অংশ। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিন তাঁর ঘরে আসেন, তখন দুই কিশোরী গান গাচ্ছিল। এ সময় তিনি বলেন, প্রত্যেক জাতির উৎসব আছে, এটি আমাদের ঈদ (বুখারি ৯৫২)।
তবে ঈদের দিনে কিছু বিষয় অবশ্যই এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে। ঈদুল ফিতরের দিন রোজা রাখা হারাম। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন (মুসলিম ১১৩৮)। এছাড়া বিজাতীয় আচরণ অনুকরণ করা থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে অন্য জাতির অনুকরণ করে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত (আবু দাউদ ৪০৩৩)।
ঈদের আনন্দে অপচয়-অপব্যয় করা থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই’ (সুরা বনি ইসরাইল: ২৭)। পাশাপাশি মদ, জুয়া ও আতশবাজির মতো শরিয়তবিরোধী কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মদ ও জুয়া শয়তানের কাজ, সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর’ (সুরা মায়িদা: আয়াত ৯০)।
সব মিলিয়ে ঈদের দিনটি যেন শুধু বাহ্যিক আনন্দে সীমাবদ্ধ না থেকে ইবাদত, মানবিকতা ও সুন্নতের আলোকে উদযাপিত হয়—এটাই হওয়া উচিত প্রতিটি মুসলমানের লক্ষ্য।