উচ্চশিক্ষায় কি দলীয়করণমুক্ত করতে পেরেছি—প্রশ্ন ড. মাহমুদুর রহমানের

০১ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২৬ PM , আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২৮ PM
ইউটিএলের ১ম বার্ষিক সম্মেলনে অতিথিরা

ইউটিএলের ১ম বার্ষিক সম্মেলনে অতিথিরা © সংগৃহীত

দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান বলেছেন, অন্তত দেশের উচ্চশিক্ষায় আমরা কি দলীয়করণমুক্ত করতে পেরেছি? জুলাইয়ে ফিরে যাই আমরা। জুলাইয়ে প্রথম কথা কি ছিল? কি নিয়ে আন্দোলন হলো, মেধা না কোটা? আন্দোলনের প্রথম শব্দটা ছিল মেধা। আর দ্বিতীয়টা ছিল বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি অনেক ছেলেকে চিনি—ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট ও সেকেন্ড হয়েছে, কিন্তু তাদের চাকরি হয় নাই। চাকরি হয়েছে সেকেন্ড ক্লাসে। কারণ তারা বিশেষ রাজনৈতিক দলের কর্মী। এই কারণে সেকেন্ড ক্লাস পাওয়ার ছেলেমেয়েদের চাকরি হয়েছে। ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট ও সেকেন্ড তাদের চাকরি হয় নাই। কারণ তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ভিন্নরকম।

আজ শনিবার (১ আগস্ট) দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে ‘বিপ্লব ও বিজয়ে ৩৬ জুলাই: নতুন প্রত্যাশায় আগামীর ভাবনা’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল)-এর ১ম বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্য তিনি এ কথা বলেন।

ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, উচ্চশিক্ষায় দলীয়করণে শিক্ষকদের একটি অংশ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কেউ কেউ এই সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও দলীয়করণমুক্ত পরিবেশ দেখতে পাচ্ছি না। এটা দুর্ভাগ্যজনক। আমরা এটা আশা করি নাই। আমাদের জুলাই যোদ্ধারা এটা আশা করেন না। এ সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষক সংগঠনগুলোর প্রতি মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, শিক্ষকদের প্রধান দায়িত্ব হলো শিক্ষার্থীদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা। আন্তর্জাতিক অভিবাসনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি উল্লেখ করেন, উন্নত জীবনের আশায় বিপজ্জনক পথে বিদেশে পাড়ি দিতে গিয়ে বহু বাংলাদেশি প্রাণ হারাচ্ছেন, যা দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশার প্রতিফলন। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরও যদি যুবসমাজ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য বড় ব্যর্থতা বলে তিনি মন্তব্য করেন। তরুণদের দেশে রেখে সম্ভাবনা তৈরিতে শিক্ষকদের আরও সক্রিয় ভূমিকা এবং রাষ্ট্রকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে বুদ্ধিবৃত্তিক চাপ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড.  নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, তিনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত না থাকলেও নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, টিকে থাকা এবং সমাজের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, দেশে দলীয় রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা কমলেও রাজনীতিহীনতা কোনো সমাধান নয়; তাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ, সমালোচনা গ্রহণের মানসিকতা ও ঐক্য বজায় রাখা জরুরি।

এসময় তিনি গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের সামনে থাকা বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ধৈর্য, সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি শহীদদের আত্মত্যাগের ঋণ স্মরণ রেখে দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার এবং ভালোকে ভালো ও খারাপকে খারাপ বলার পাশাপাশি বন্ধুত্ব, কৃতজ্ঞতা ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। শেষে তিনি আয়োজকদের উদ্যোগের প্রশংসা করে এর সফলতা কামনা করেন।

ফরিদপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ড. মো: ইলিয়াস মোল্লা বলেন, বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষায় শিক্ষিত পশ্চিমা নীতি নির্ধারকদের দ্বারা বিশ্বে যুদ্ধ ও অশান্তি বিরাজ করার মূল কারণ আমাদের চিন্তন পদ্ধতিতে মৌলিকতার অভাব এবং ঔপনিবেশিক ধারার শিক্ষা। তাই শিক্ষকদের কেবল গতানুগতিক পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, আমাদের সোনালী অতীতের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে আইনস্টাইনের মতো চরম একাগ্রতা ও মৌলিক চিন্তার মাধ্যমে নিজস্ব জ্ঞান ও চিন্তার ক্যানভাস বড় করতে হবে, যাতে স্বাধীন ও প্রজ্ঞাবান জাতি গঠনে বাংলাদেশ সফলতার সাথে এগিয়ে যেতে পারে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ্ হাসান নকীব বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় সম্মিলিত ব্যর্থতার নেতিবাচক প্রভাব এখন স্পষ্ট, যা কাটিয়ে উঠতে গবেষণাবান্ধব পরিবেশ, কার্যকর ফলো-আপ এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিকতা ও অপ্রয়োজনীয় কাগজপত্রের চাপ শিক্ষককে শিক্ষা ও গবেষণার মূল কাজ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। গবেষণাভিত্তিক নীতি প্রণয়নের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল)-এর দায়িত্ব হবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে শিক্ষকসমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের মাধ্যমে জাতির সম্মিলিত স্মৃতির অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করা। একই সঙ্গে তিনি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা, অধ্যাপক আতাউর রহমান বিশ্বাসকে স্মরণ এবং ইউটিএলকে সব মত ও চিন্তার মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখার আহ্বান জানান। নারী শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া উচ্চশিক্ষা ও জাতির অগ্রযাত্রা পূর্ণতা পাবে না।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড.  মো. হায়দার আলী বলেন, উচ্চশিক্ষায় এআই ও প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, প্রাথমিক শিক্ষায় ভারী সিলেবাসের বদলে জাপানের মতো জীবনমুখী ও নৈতিক শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া, এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বার্থে মুদ্রাস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে পে-স্কেল ও জীবনযাত্রার মান নিয়ে নীতিনির্ধারক মহলে নতুন করে ভাবা জরুরি।

সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মারদিয়া মমতাজ বলেন, টারশিয়ারি লেভেলে কেমব্রিজ বোর্ডের আদলে নব্বইয়ের দশক থেকে চলে আসা আউটকাম বেসড এডুকেশন বা ফলভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে কারিকুলাম প্রণয়ন থেকে শুরু করে ফলাফল প্রস্তুতকরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিকে নিখুঁতভাবে স্ক্রুটিনি বা মূল্যায়ন করা উচিত যাতে শিক্ষার্থীদের শিখন ও দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে শুধু একপেশে লেকচার না দিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া নিশ্চিত করা, বৈচিত্র্যময় শিক্ষার্থীদের একই কাঠামোর আওতায় সঠিকভাবে এড্রেস করা এবং ক্লাসে মোবাইল ফোনের যত্রতত্র ব্যবহার বা অপ্রস্তুতভাবে ক্লাস নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এছাড়া শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের পেশাদারিত্ব, জীবনযাপন ও ব্যক্তিত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, কারণ শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের আচার-আচরণ ও জীবনধারা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়, যা জ্ঞান, আত্মমর্যাদা, বিশ্বাস ও স্বাধীনতার মতো মূল নীতিগুলোকে ফুটিয়ে তোলে।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড.  মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বর্তমান ডিজিটাল ও অরাজক সমাজে শিক্ষার্থীদের মাঝে পিতা-মাতা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা এবং সত্য বলার মতো চিরন্তন নৈতিক মূল্যবোধগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, যা পুনরুদ্ধারে শিক্ষকদের পড়াশোনার পাশাপাশি ক্লাসে নৈতিকতা শিক্ষা দেওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া গবেষণার মান বাড়াতে ইউটিএল কর্তৃপক্ষকে একটি কমিটি গঠন করে মৌলিক গবেষণাগুলো সমাজের সামনে তুলে ধরার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

ইউটিএল এর আহ্বায়ক (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. যুবাইর মোহাম্মদ এহসানুল হকের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্যে ইউটিএল এর সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসেন।

ট্যাগ: ইউটিএল
ভবন আর কলেজ বাড়ালেই স্বাস্থ্যখাতের সংকটের সমাধান হবে না
  • ০১ আগস্ট ২০২৬
ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল ইতালি
  • ০১ আগস্ট ২০২৬
একই গ্রুপে ভারত-পাকিস্তান, বাংলাদেশের সঙ্গী কারা?
  • ০১ আগস্ট ২০২৬
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি ৩৭১
  • ০১ আগস্ট ২০২৬
শিক্ষকদের বদলি আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে চান মাউশি ডিজি
  • ০১ আগস্ট ২০২৬
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাফ সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন কাজী সাল…
  • ০১ আগস্ট ২০২৬