বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ১৮ বছরের ইতিহাসে ৬ উপাচার্যের পাঁচ জনই দুর্নীতি-হত্যা মামলার আসামি!

০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৭ PM
দুর্নীতি-হত্যা মামলার আসামিতে নাম থাকা বেরোবির ৫ উপাচার্য

দুর্নীতি-হত্যা মামলার আসামিতে নাম থাকা বেরোবির ৫ উপাচার্য © টিডিসি সম্পাদিত

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ইতিহাস যেন একের পর এক বিতর্ক ও দুর্নীতির ছায়ায় আচ্ছন্ন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করা ৬ জন উপাচার্যের মধ্যে ৫ জনই কোনো না কোনো মামলার আসামি। একমাত্র ব্যতিক্রম প্রথম উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. লুৎফর রহমান—তিনিও উপাচার্য থাকাকালে ‘অতিরিক্ত সততার কারণে’ মাত্র ৭ মাসেই দায়িত্ব ছাড়তে বাধ্য হন।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, এ পর্যন্ত  বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচজন উপাচার্যের  দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, বর্তমানে (সর্বশেষে) ষষ্ঠ উপাচার্য  হিসেবে অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী যোগদান করেছেন।

জানা যায়, ২০০৮ সালে বেরোবির প্রতিষ্ঠাকালীন উপাচার্য ছিলেন ড. মো. লুৎফর রহমান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। প্রশাসনিক সুশাসন, নিয়মনীতি ও স্বচ্ছতার পক্ষে ছিলেন তিনি কঠোর অবস্থানে। প্রথম উপাচার্য এক বছরও পূর্ণ করতে পারেননি। 

তিনি বলতেন, ‘কোনো এমপি-মন্ত্রীর সুপারিশে একজনেরও চাকরি আমার হাতে হবে না। যোগ্যতার ভিত্তিতে হবে।’ তখন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টে যাওয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতির একটি প্রভাবশালী মহল তার সততার বিরোধিতা করে। মাত্র সাত মাসের মাথায় তাকে অপসারণ করা হয়।

দ্বিতীয় উপাচার্য ড. আব্দুল জলিল মিয়া
পরবর্তীতে দায়িত্ব পাওয়া ড. আব্দুল জলিল মিয়া জড়িয়ে পড়েন দুর্নীতির মামলায়। ২০ জুলাই ২০১৭, দুপুরে তিনি রংপুরের একটি আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করলে আদালত তা নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।

তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমোদন ব্যতিরেকে নিয়োগ প্রদান ও কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পেয়ে মামলা করে দুদক। প্রায় চার বছরের দায়িত্বকালের পর ৪ মে ২০১৩, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে গোপনে কানাডায় চলে যান তিনি। পরবর্তীতে তিনি দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।

তৃতীয় ও চতুর্থ উপাচার্য 
তারা দুইজনও একই অভিযোগে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। তৃতীয় উপাচার্য এ কে এম নুরুন্নবী এবং চতুর্থ উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ— দুজনের বিরুদ্ধেই অর্থ আত্মসাৎ এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে মামলা করেছে দুদক। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে  উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ অপব্যবহারের তদন্তে।

১৮ জুন ২০২৫, দুর্নীতির মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পের ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এই দুই উপাচার্য, প্রকৌশলী ও ঠিকাদারসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। 

আরও পড়ুন: ‎বেরোবিতে দুদকের অভিযান, মিলেছে নিয়োগ জালিয়াতির প্রাথমিক সত্যতা

জানা যায়, প্রকল্পের অনুমোদিত ডিপিপি উপেক্ষা করে নকশা পরিবর্তন, ৩০ কোটি টাকার বেশি মূল্যের চুক্তি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই সম্পাদন, এবং নিরাপত্তা জামানতের টাকা এফডিআর হিসেবে ব্যাংকে জমা রেখে ঋণ প্রদানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপব্যবহার করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, চুক্তিতে অগ্রিম অর্থ প্রদানের কোনো বিধান না থাকলেও ঠিকাদারকে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে অগ্রিম ৪ কোটি টাকার বিল প্রদান করা হয়। অথচ বিল সমন্বয়ের আগেই গ্যারান্টি অবমুক্ত করে দেওয়া হয়। এছাড়াও প্রথম পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের ডিজাইন উপেক্ষা করে দ্বিতীয় পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে যা সরকারি ক্রয় বিধিমালা লঙ্ঘনের শামিল। আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে।

২০২৫ সালের আগস্ট মাসে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি মামলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক উপাচার্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। তিনি এখন কারাগারে আছে।

পঞ্চম উপাচার্য ড. হাসিবুর রশিদ
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে পঞ্চম উপাচার্য ড. মো. হাসিবুর রশিদের সময়ে। ২০২৪ সালের আলোচিত শহীদ আবু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে প্রধান আসামি করে ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। এই ঘটনায় সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

২০২৩ সালের  জুন মাসে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়োগ পরীক্ষায় আড়াই হাজার খাতা সৃজন, টেম্পারিং ও জালিয়াতির অভিযোগে বর্তমান উপাচার্য ড. শওকাত আলী দুদকে মামলা হয়। এ মামলাটি তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে যোগদানের পূর্ব থেকে ছিল। 

মামলার এজাহারে আসামিদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে খাতা প্রণয়ন এবং অফিশিয়ালি সরবরাহ করা উত্তরপত্র বর্তমানে থাকা উত্তরপত্র দ্বারা কোনো একপর্যায়ে প্রতিস্থাপিত করার অভিযোগ আনা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি ৪০৯/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/৪৭৭ (ক) ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবি যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা উপচার্য হিসেবে আসে তারা শুরুতে ভালোই থাকে। কিন্তু কিছু সুবিধাভোগী শিক্ষক কর্মকর্তা নিজেদের সুবিধা আদায়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গুলোকে ভুল পথে চালিত করে। ফলে শেষ পর্যন্ত কেউ সসম্মানে যেতে পারে না। তারাও আরও দাবি করে বলেন যে, যতক্ষণ পর্যন্ত নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেউ উপাচার্য হবে না ততক্ষণ পর্যন্ত ভালো কিছু করা সম্ভব নয়। কারণ বাইরে থেকে আসলে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে আর কোনো জবাবদিহিতা থাকে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক শিক্ষক ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন,আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি আর প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা প্রত্যক্ষ করেছি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে একের পর এক উপাচার্যরা বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। এখানকার ছাত্রছাত্রীরা উপাচার্য বদল হতে দেখেছে, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতিপরায়ণ কাঠামো বদলানো দেখেনি। প্রতিশ্রুতি ছিল অনেক, বাস্তবায়ন হয়েছে অতি অল্প। 

আরও পড়ুন: ‘আমাকে চেনো, আমি ঢাবির শিক্ষক, তোমার চাকরি কীভাবে হয় দেখে নেব’

বিশেষ করে শহিদ আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে যে ছাত্রের জীবন কতটা মূল্যহীন হয়ে উঠতে পারে এক অসৎ প্রশাসনের অধীনে। তাই বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও উপাচার্যের প্রতি আমাদের পরামর্শ, কলঙ্কিত ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ছাত্রবান্ধব এবং জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন গড়ে তুলুন। যেন ছাত্ররা আন্দোলন নয়, শিক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারে। আর যদি দলীয় প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ চাটুকারিতার রাজনীতি এড়িয়ে যোগ্যতা ও নীতি-নৈতিকতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তাহলে আমাদের শিক্ষক সমাজ এ ধরনের উদ্যোগে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ষষ্ঠ উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী বলেন, হুম মামলা চলমান আছে। যে অভিযোগ এনে মামলাটা হয়েছিল, সেই পরীক্ষাটা বাতিল হয়েছিল। নতুন করে আবার পরীক্ষা এবং নিয়োগ হয়েছে।

তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত, সিলেটের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বন্ধ
  • ০১ এপ্রিল ২০২৬
রুয়েটে ‎ক্যান্টিনে বসা নিয়ে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ
  • ০১ এপ্রিল ২০২৬
অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি, জানতে চাইলে ছাত্রদলের দুই নেতাকে …
  • ০১ এপ্রিল ২০২৬
দৌলতদিয়া বাসডুবি: তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল
  • ০১ এপ্রিল ২০২৬
রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল শিশু, ধাক্কা দিয়ে প্রাণ নিল অটোরিক…
  • ০১ এপ্রিল ২০২৬
হলের সিট বরাদ্দে সময়সীমা নির্ধারণ ও নীতিমালা প্রণয়নে ডাকসু …
  • ০১ এপ্রিল ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • April 1, 2026
  • Admission Test
  • April 4, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
SUMMER 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence