পরোক্ষ ধূমপানের প্রতীকি ছবি © এআই দিয়ে তৈরি করা ছবি
অনেকেই মনে করেন আমি তো ধূমপান করছি না, তাহলে আমি হয়তো নিরাপদে আছি। কিন্তু, নিজে ধূমপান না করলেও অন্যের সিগারেট, বিড়ি বা তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে এলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। পরোক্ষ ধূমপান বা সেকেন্ডহ্যান্ড স্মোকের কারণে হৃদ্যন্ত্র, ফুসফুসসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পরোক্ষ ধূমপান অধূমপায়ীদের মধ্যেও নানা রোগ ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদ্রোগ ও শিশুদের হাঁপানিসহ বিভিন্ন শ্বাসযন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
পরোক্ষ ধূমপানে যেসব ক্ষতি হয়
পরোক্ষ ধূমপানের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালিতে। তামাকের ধোঁয়ার ক্ষতিকর উপাদান রক্তনালির অভ্যন্তরীণ আস্তরণে ক্ষতি ও প্রদাহ তৈরি করতে পারে। এর ফলে হৃদ্রোগ, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ফুসফুসেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। দীর্ঘদিন অন্যের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকলে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে শ্বাসনালির প্রদাহ, হাঁপানি, নিউমোনিয়া এবং অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তামাকের ধোঁয়া চোখ, মুখ ও গলাসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘদিন ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকা প্রজননস্বাস্থ্যের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে শিশুদের জন্য ঘরের ভেতরের ধোঁয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বাবা-মা বা পরিবারের অন্য কোনো সদস্য ঘরের মধ্যে ধূমপান করলে অধূমপায়ী শিশুদেরও নিয়মিত তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসতে হয়।
বাংলাদেশেও পরোক্ষ ধূমপানের ঝুঁকি
বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণাতেও পরোক্ষ ধূমপানের ব্যাপকতা উঠে এসেছে। ২০১৯ সালে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল ও রংপুর এই সাত বিভাগীয় শহরের ৬১৬ জন বহুতল আবাসিক ভবনের বাসিন্দার ওপর করা এক গবেষণায় দেখা যায়, ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারী পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে ছিলেন। গবেষণাটি মো. গোলাম কিবরিয়াসহ একদল গবেষক পরিচালনা করেন এবং ২০২৩ সালে প্লস ওয়ান জার্নালে প্রকাশিত হয়। পরিবারের কোনো সদস্য ধূমপান করলে পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি আরও বেশি ছিল।
এ ছাড়া বাংলাদেশে পরিচালিত গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (জিএটিএস) ২০১৭ অনুযায়ী, বাড়িতে পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে আসার হার ২০০৯ সালের ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে ২০১৭ সালে ৩৯ শতাংশে নেমেছিল। কর্মস্থল, রেস্তোরাঁ ও গণপরিবহনেও পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শ কমেছে, যদিও ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি।
সাম্প্রতিক ডব্লিউ এইচ ও এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে তামাক ব্যবহারের কারণে আনুমানিক ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ২০ দশমিক ৯ শতাংশ মৃত্যু দ্বিতীয় হাতের ধোঁয়ার সংস্পর্শের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। অর্থাৎ, আনুমানিক ২৭ হাজার ২০০ মৃত্যু পরোক্ষ ধূমপানের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতে ২০২৩ সালে পরোক্ষ ধূমপানে ৩ লাখের বেশি মৃত্যু
সম্প্রতি দ্য ল্যানসেট পাবলিক হেলথে প্রকাশিত এক গবেষণায় ভারতে পরোক্ষ ধূমপানের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ভারতে দ্বিতীয় হাতের ধোঁয়ার সংস্পর্শের কারণে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ১৯৯০ সালে এ সংখ্যা ছিল ২ লাখ ১৭ হাজার ৭০০। অর্থাৎ তিন দশকের ব্যবধানে পরোক্ষ ধূমপানজনিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
আরও দেখুন: পলিথিন ও প্লাস্টিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশ
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে ভারতে প্রায় ৪৪ কোটি ৪০ লাখ মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে ছিলেন। ১৯৯০ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩৭ কোটি ৫০ লাখ।
কীভাবে পরোক্ষ ধূমপান থেকে বাঁচবেন?
বাড়িকে ধূমপানমুক্ত রাখুন। ঘরের ভেতরে কাউকে ধূমপান করতে না দেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। জানালা খোলা বা ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করলেও তামাকের ধোঁয়ার ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না।
গাড়িতে ধূমপান বন্ধ করুন। বন্ধ গাড়ির ভেতরে তামাকের ধোঁয়া আটকে থাকে। তাই গাড়ির ভেতরে ধূমপান না করাই নিরাপদ।
ধূমপায়ীর কাছ থেকে দূরে থাকুন। কেউ সামনে ধূমপান করলে সম্ভব হলে ওই স্থান থেকে সরে যান। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী ও শ্বাসযন্ত্রের রোগীদের ধোঁয়া থেকে দূরে রাখা জরুরি।
শিশুদের ধূমপানের পরিবেশ থেকে দূরে রাখুন। ঘর, গাড়ি কিংবা অন্য কোনো আবদ্ধ স্থানে শিশুদের সামনে ধূমপান করা উচিত নয়।
সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা হলো বাড়ি, গাড়ি ও কর্মস্থলসহ আশপাশের পরিবেশকে সম্পূর্ণ ধূমপানমুক্ত রাখা। বাংলাদেশে ধূমপানমুক্ত পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেওয়ার কারণও এটাই।
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, দ্য ল্যানসেট পাবলিক হেলথ, গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (জিএটিএস) বাংলাদেশ ২০১৭।