হরমোন নাকি মানসিক চাপ—নারীদের মুড সুইংয়ের আসল কারণ কী?

১৩ জুন ২০২৬, ০৯:৩৬ AM , আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬, ০৪:০৬ PM
নারীদের মুড সুইং

নারীদের মুড সুইং © এআই দিয়ে তৈরিকৃত ছবি

অনেকেই মনে করেন, নারীদের ঘন ঘন মুড পরিবর্তন বা মুড সুইং কেবল আবেগপ্রবণতার ফল। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এর পেছনে রয়েছে শরীরের হরমোনগত পরিবর্তন, মস্তিষ্কের রাসায়নিক প্রক্রিয়া এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের নানা প্রভাব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিশেষ করে বয়ঃসন্ধি, মাসিক চক্র, গর্ভাবস্থা এবং মেনোপজের সময় হরমোনের ওঠানামা মেজাজ ও আবেগকে প্রভাবিত করতে পারে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন বৈশ্বিক পর্যালোচনা অনুযায়ী, প্রজননক্ষম নারীদের প্রায় ৭০–৯০ শতাংশ জীবনের কোনো না কোনো সময় মাসিকের  আগে হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার PMS উপসর্গ অনুভব করেন । এর মধ্যে উপসর্গগুলোর অংশ হিসেবে থাকে মুড সুইং, খিটখিটে মেজাজ, উদ্বেগ, ক্লান্তি ইত্যাদি।

মাসিক চক্র ও হরমোনের সম্পর্ক

বিশ্বখ্যাত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান মায়ো ক্লিনিক জানায়, মাসিকের আগে অনেক নারীর মধ্যে ‘প্রিমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম’ (PMS) দেখা যায়। এর সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে মুড সুইং, খিটখিটে মেজাজ, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ক্লান্তি এবং ঘুমের সমস্যা। গবেষকদের মতে, মাসিক চক্রের সময় ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন হরমোনের পরিবর্তন এসব উপসর্গের অন্যতম কারণ। 

মস্তিষ্কের রাসায়নিক পরিবর্তনও ভূমিকা রাখে

মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু হরমোনই নয়, মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক পদার্থ ‘সেরোটোনিন’-এর ওঠানামাও মেজাজে প্রভাব ফেলে। সেরোটোনিনের মাত্রা কমে গেলে বিষণ্নতা, ক্লান্তি, উদ্বেগ এবং আবেগের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। 

কৈশোরে কেন বেশি দেখা যায়?

বয়ঃসন্ধিকালে শরীরে দ্রুত হরমোনগত পরিবর্তন ঘটে। এ সময় নতুন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর কারণে অনেক কিশোরীর মধ্যে মুড সুইং দেখা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। 

মানসিক চাপও বড় কারণ

পড়াশোনা, পারিবারিক চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও মুড সুইং বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে যারা আগে থেকেই উদ্বেগ বা বিষণ্নতায় ভুগছেন, তাদের ক্ষেত্রে মাসিকের সময় এসব লক্ষণ আরও তীব্র হতে পারে। 

কখন সতর্ক হওয়া প্রয়োজন?

চিকিৎসকদের মতে, মুড সুইং যদি এতটাই তীব্র হয় যে তা পড়াশোনা, কাজ, পারিবারিক সম্পর্ক বা দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে, তাহলে সেটি সাধারণ PMS-এর চেয়ে গুরুতর সমস্যা—যেমন PMDD (Premenstrual Dysphoric Disorder)—এর লক্ষণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। 

কীভাবে কমানো সম্ভব?

বিশেষজ্ঞরা নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং মানসিক চাপ কমানোর পরামর্শ দেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক মেজাজ পরিবর্তন হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার কথাও বলা হয়েছে। 

মুড সুইংকে শুধুই ‘অতিরিক্ত আবেগ’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এটি অনেক সময় শরীর ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক জৈবিক পরিবর্তনেরই একটি বহিঃপ্রকাশ। তাই বিষয়টি নিয়ে ভুল ধারণার বদলে সচেতনতা ও সহমর্মিতাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আয়েশা মাহমুদা বলেন, ‘নারীদের ঘন ঘন মুড সুইংকে শুধু আবেগের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে হরমোনজনিত পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিক ও সামাজিক নানা কারণও সমানভাবে কাজ করে।’

তিনি বলেন, ‘মুড সুইং শুধু আবেগের বিষয় না। এটি অনেকটাই নির্ভর করে পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর। একজন ব্যক্তি কোন ধরনের মানসিক চাপের মধ্যে আছে, তার পরিবেশ কেমন, এবং সে চাপ মোকাবিলায় কতটা সক্ষম—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’

মুড সুইং কি কেবল হরমোনজনিত কারণে হয়, নাকি এর সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক কারণও জড়িত—এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘হরমোনজনিত পরিবর্তন অবশ্যই একটি বড় ভূমিকা রাখে। তবে এটি একমাত্র কারণ নয়; মানসিক চাপ এবং জীবনযাপনের ধরনও মুড সুইংয়ের ওপর প্রভাব ফেলে।’

সাধারণ মুড সুইং এবং উদ্বেগ বা বিষণ্নতার মতো মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার মধ্যে পার্থক্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তির উদ্বেগ বা মানসিক অস্থিরতা দীর্ঘ সময় ধরে থাকে এবং এর নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা যায়, তাহলে বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা সম্ভব হয়।’

দৈনন্দিন জীবনে মুড সুইং নিয়ন্ত্রণের উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তির জীবনযাপন যদি অনিয়মিত বা ইনডিসিপ্লিনড হয়, তাহলে যেকোনো সময় মানসিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। নিয়মিত জীবনযাপন, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং সচেতনতা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’

নারীদের মাসিক চক্রের সঙ্গে মুড সুইংয়ের সম্পর্ক কতটা—এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মাসিক চক্রের সময় শরীরের হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে অনেক সময় মানসিক অবস্থার ওঠানামা দেখা দিতে পারে। শারীরিক অস্বস্তি বা ব্যথাও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে, যা মানসিক স্থিতিশীলতাকে কিছুটা হলেও প্রভাবিত করে।’

আরও পড়ুন: অনার্সে ৩.১৫, নামের পাশে ৫ ‘ব্যাকলগ’—মাস্টার্স ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডির অফার পেলেন বাকৃবির নাহিদ

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শামসুল আহসান বলেন, ‘ মুড যে কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে সময়, স্থান, স্ট্রেস এবং ব্যক্তিত্ব বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে ওঠানামা করতে পারে। সাধারণভাবে নারীদের মধ্যে মুড সুইং বেশি দেখা যেতে পারে, কারণ তারা স্ট্রেস, আবেগীয় অবস্থা এবং মাসিকের মতো শারীরিক অবস্থার প্রতি বেশি সংবেদনশীল। মাসিক চলাকালীন এবং ডিম্বস্ফোটনের সময় (হরমোনের পরিবর্তনের কারণে) তাদের মধ্যে মুড সুইং দেখা যায়।’

ডিপ্রেশন এবং অ্যানজাইটি বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ডিপ্রেশনে মানুষ সাধারণত বলে যে আমি মন খারাপ অনুভব করছি বা স্বাভাবিক মুডে নেই বা বেশিরভাগ দিনই বিরক্ত/খারাপ লাগছে। আর অ্যানজাইটিতে মানুষ ছোটখাটো বিষয় নিয়েও উদ্বিগ্ন থাকে বা তা সামলাতে পারে না। মুড সুইং স্বাভাবিক মানুষের মধ্যেও থাকতে পারে, এটি মানসিক বা সাইকিয়াট্রিক রোগের ফল হতে পারে যেমন বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার, বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার বা স্কিজোফ্রেনিয়া, মাদকাসক্তি ইত্যাদি।’

মুড সুইং নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মুড সুইং নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এর কারণ চিহ্নিত করতে হবে। যদি এটি ম্যানিয়ার কারণে হয় তবে ওষুধ প্রয়োজন। বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডারের ক্ষেত্রে নিয়মিত কাউন্সেলিং প্রয়োজন। যদি আসক্তির কারণে হয় তবে আসক্তির চিকিৎসা করতে হবে। যদি এটি স্ট্রেসের কারণে হয় তবে স্ট্রেসপূর্ণ জীবন কমাতে হবে, নিয়মিত ব্যায়াম, কাজ থেকে বিরতি নেওয়া, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে। রিল্যাক্সেশন এক্সারসাইজ যেমন ডিপ ব্রিদিং, প্রগ্রেসিভ মাসল রিল্যাক্সেশন মুড সুইং কমাতে সাহায্য করতে পারে।’

ব্যাংকিং ছেড়ে প্রযুক্তি খাতে জিশান আহমেদ, জেনকোর সল্যুশনসের…
  • ০৩ আগস্ট ২০২৬
জামিন পেলেন অভিনেতা জাহের আলভী
  • ০৩ আগস্ট ২০২৬
পরীক্ষা নয়, লটারির মাধ্যমেই প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি
  • ০৩ আগস্ট ২০২৬
‘প্রাইম মিনিস্টার্স গোল্ডকাপ’ সমাপনীতে এমবাপ্পেকে আনার পরিক…
  • ০৩ আগস্ট ২০২৬
ছাগলকাণ্ডের সেই মতিউরের বিচার শুরু
  • ০৩ আগস্ট ২০২৬
কাজ করতে দিচ্ছেন না এমডি, সভাপতির পদ ছাড়লেন জনস্বাস্থ্য বিশ…
  • ০৩ আগস্ট ২০২৬