ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম এবং বায়োটেকনোলজি, ইলেক্ট্রনিক্স, এআই অ্যান্ড রোবোটিক্স সামিটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান © টিডিসি ছবি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, পোশাকশিল্পের পর সেমিকন্ডাক্টর শিল্পই হতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক গন্তব্য। সরকারের নীতি সহায়তা, দক্ষ জনশক্তি ও উদ্ভাবনী সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাত থেকে নির্ধারিত রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
শনিবার (২৫ জুলাই) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম এবং বায়োটেকনোলজি, ইলেক্ট্রনিক্স, এআই অ্যান্ড রোবোটিক্স সামিটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকের এই আয়োজন কোনো সাধারণ সম্মেলন নয়। এই সম্মেলনকে আমি আগামীর প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণের অন্যতম কারিগরদের মিলনমেলা হিসেবেই অভিহিত করতে চাই। প্রবাসী বাংলাদেশিরা, যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন, তাঁদের অনেকেই নিজ উদ্যোগে আজকের এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সামিটে অংশ নিয়েছেন। আমি আপনাদের সবাইকে বিশেষভাবে অভিনন্দন জানাই। এই সামিটে দেশি-বিদেশি প্রযুক্তি বিশারদদের সাগ্রহ উপস্থিতি সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের জন্য অবশ্যই অনুপ্রেরণাদায়ক বলে আমি মনে করি।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্ব এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি মিলেমিশে চতুর্থ ও পঞ্চম শিল্পবিপ্লবের ভিত্তি রচনা করেছে। আজকের এই সামিটে যারা উপস্থিত রয়েছেন, আপনারা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চান। বর্তমান সরকারও এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায়, যে বাংলাদেশ হবে স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ এবং প্রযুক্তিনির্ভর। এই সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে একটি মেধাভিত্তিক বাংলাদেশের সম্ভাবনার বার্তা পৌঁছে দিতে চাই।’
তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টর শুধু একটি শিল্পই নয়, এটি আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি। প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষতার এই সময়ে মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে কম্পিউটার, চিকিৎসাসামগ্রী, কৃষি প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, ডেটা সেন্টার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আধুনিক কলকারখানা কিংবা মহাকাশের স্যাটেলাইট—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেমিকন্ডাক্টর অপরিহার্য। সবকিছুর কেন্দ্রেই রয়েছে একটি সেমিকন্ডাক্টর বা মাইক্রোচিপ। বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বাজার বর্তমানে দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং, ইলেকট্রিক ভেহিকল, স্মার্ট ডিভাইস, ৫জি এবং ৬জি যোগাযোগব্যবস্থা, ডেটা সেন্টার এবং অটোমেশন প্রযুক্তির বিস্তারের কারণে চিপের চাহিদা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। সুতরাং, নিজেদের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তি দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে বাংলাদেশের সামনেও সম্মানজনক অবস্থান তৈরির এখনই সময়।’
তারেক রহমান বলেন, ‘২০৩০ সালের দিকে বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর বাজার ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাবে বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করেছিলেন। তবে ২০২৬ সালের মধ্যেই সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে রয়েছে। সুতরাং, এই বাজারে প্রবেশ করার জন্য বাংলাদেশের সামনেও এক অপার সুযোগ ও সম্ভাবনা বিদ্যমান। আমি আশা করি, ২০৩০ সালের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প থেকে রপ্তানি আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, বাংলাদেশ সেটি পূরণ করতে সক্ষম হবে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের তিন হাজারেরও বেশি সেমিকন্ডাক্টর পেশাজীবী বর্তমানে আমেরিকা, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর এবং ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় বড় প্রযুক্তি কোম্পানি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্যতার প্রমাণ রেখে চলেছেন। তাঁরা প্রকৌশলী, আর্কিটেক্ট, গবেষক, ব্যবস্থাপক ও উদ্যোক্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। প্রবাসে বিশ্বস্বীকৃত এই মেধাবীদের বাংলাদেশের সমৃদ্ধির পথে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার ব্যাপারেও সরকারি ও বেসরকারি—উভয় পর্যায় থেকেই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, টেস্টিং, এমবেডেড সিস্টেম, পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স এবং অ্যাডভান্সড প্যাকেজিং—এসব ক্ষেত্রে কাজ শুরু হয়েছে। দেশের কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘লক্ষ্য পূরণে বর্তমান সরকার, বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে এগিয়ে নিতে, চলতি বাজেটে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের চাহিদা অনুযায়ী সব ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করেছে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাঁচামালের ওপর সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন সার্ভিসের রপ্তানি আয়ের ওপর নগদ প্রণোদনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবন বাস্তবায়নের জন্য সরকার প্রথমবারের মতো বছরে ৫০০ কোটি টাকা স্টার্টআপ অনুদান বরাদ্দ রেখেছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্টার্টআপকে এই অনুদান দেওয়া হয়েছে।’
চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের সামনে নিঃসন্দেহে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দক্ষতার ঘাটতি আছে। ল্যাবের সীমাবদ্ধতা আছে। বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে কঠিন প্রতিযোগিতা রয়েছে। তবে এসব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছেও আমাদের রয়েছে। আমি কথা দিচ্ছি, আপনাদের সেই অদম্য ইচ্ছাকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সাধ্য ও সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে বর্তমান সরকার আপনাদের পাশে রয়েছে এবং থাকবে, ইনশাআল্লাহ।’