সরকারের ৬ মাস পূর্তি
সরকারের ৬ মাস পূর্তি © লোগো
যেকোনো সময় মন্ত্রিসভায় বড় রদ-বদল ও সম্প্রসারণের ঘোষণা দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ক্ষমতায় বসার ৬ মাস পার করতে চলেছে বিএনপি। আর এর মধ্যেই প্রশাসনিক কাজের গতি বাড়াতে এবং সরকারের পারফরমেন্স আরো ঝালিয়ে নিতে উদ্যোগ শুরু হয়েছে সরকারের ভেতরে। প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে এখন আট থেকে ১০ জন নতুন মুখ এবং সম্ভাব্য রদ বদলের আমলনামা ও ভেরিফিকেশন রিপোর্ট তৈরি হয়ে জমা আছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে যে কোনো মুহূর্তেই এই পরিবর্তনের আসতে পারে। আগামী ১৭ আগস্ট তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের ৬ মাস পূর্তি হবে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা কাজ শুরু করে।
মন্ত্রিসভা গঠনের সময়ই সরকারপ্রধান তখনই নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিলেন, প্রথম ছয় মাস সবাইকে (মন্ত্রী) নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। যারা ভালো করবেন তারা বহাল থাকবেন কিন্তু যাদের কাজে ধীরগতি বা সমন্বয়হীনতা দেখা যাবে বা যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উত্থাপন হবে, তাদের বাদ দেওয়া হবে বা দপ্তর পরিবর্তন হতে পারে। মনে রাখতে হবে, মন্ত্রিত্বে কারও জন্য স্থায়িত্বের গ্যারান্টি নেই।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনা, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতেই মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। আর সে ক্ষেত্রে যুক্ত হতে পারে নতুন মুখও। পাশাপাশি, তাছাড়া এক মন্ত্রীর কাঁধে একাধিক মন্ত্রণালয়ের চাপ কমাতেই প্রধানত মন্ত্রিসভার পরিধি বাড়ানোর এই চিন্তা। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে বড় চর্চার বিষয়। কারা ঢুকছেন নতুন তালিকায় আর কার দপ্তর বদলাচ্ছে
সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রগুলো বলছে, রদ-বদল হলেও প্রথম দফায়ই কাউকে বাদ না দেওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের একটা বড় হাওয়া বইছে মন্ত্রিপাড়ায়। বিশেষ করে কয়েকটি বিতর্কিত ঘটনা বক্তব্যের প্রধানমন্ত্রী বেশ বিব্রত হয়েছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। যেমন দুর্যোগকালীন সময় পরীক্ষা গ্রহণ নিয়ে কিছু সিদ্ধান্তে সৃষ্টি হয় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনকে অন্য মন্ত্রণালয়ে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। একইভাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সর্দার শাখাওয়াত হোসেন বকুলের সম্প্রতি করা কিছু মন্তব্য অতিকথনে ক্ষুব্ধ হয়ে তাকেও অন্য দায়িত্বে পাঠানোর আলোচনা জোরালো হচ্ছে। অন্যদিকে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে প্রত্যাশিত পারফর্মেন্সের জন্য পুরস্কার হিসেবে প্রতিমন্ত্রী এম রাশিদুজ্জামান মিল্লাত পূর্ণমন্ত্রী হতে পারেন।
জানা গেছে, দেশের ভৌগোলিক ভারসাম্য মিলাতে এবং অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিতে কিছু প্রবীণ ও তরুণ নেতা মন্ত্রিসভায় যোগের আলোচনায় রয়েছেন। বর্তমান মন্ত্রিসভায় নোয়াখালী অঞ্চলের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় বিএনপির অন্যতম ঘাটি হিসেবে খ্যাত ওই অঞ্চলটির নেতাকর্মী ও সাধারণের মনে যেমন ক্ষোভ আছে, তেমনি ওই অঞ্চলের নেতারাও রীতিমতো চরম হতাশা ভূগছেন। সেসেক্ষেত্রে বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রবীণ নেতা বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান নোয়াখালী-৪ (সদর–সুবর্ণচর) আসন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদস্য মোহাম্মদ শাহজাহান, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য জয়নুল আবেদিন ফারুকের নাম আলোচনায় আছে। মোহাম্মদ শাহজাহান ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ, ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি) সালে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ, ১৯৯৬ (জুন) সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ, ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ এবং ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি নোয়াখালী অঞ্চলে বিএনপির একজন নিবেদিত সংগঠক হিসেবে পরিচিত।
এছাড়া, আলোচনার টেবিলে আরো ঘুরপাক খাচ্ছে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহিদুর রহমান, নোয়াখালীর বরকতুল্লাহ ভুলু, পাবনার শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোহাম্মদ আবুল কালাম, পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন, নরসিংদীর খায়রুল কবির খোকন, চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ এবং সংরক্ষিত নারী আসন থেকে মাহমুদা হাবিবা ও রেহানা আক্তার রানুর নাম আলোচনায় আছে।
এর বাইরে, টেকনোক্র্যাটি কোটায় কোটায় বিএনপির বাইরে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা শরিক, মিত্রদের মধ্য থেকেও কাউকে নতুন চমক হিসেবে মন্ত্রিসভায় দেখা যেতে পারে।
সরকারের একজন উপদেষ্টা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রথম ১০০ দিন পার হওয়ার পর সরকার এখন ‘বাস্তবায়ন ও ফল দেখানো’র দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। এজন্য মন্ত্রিসভায় নতুন মুখ আনার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। দায়িত্ব ভাগ হলে কাজের গতি বাড়বে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের রদবদল বা সম্প্রসারণ কেবল প্রশাসনিক কাজের গতি বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই করা হয় না। এর পেছনে কয়েকটি সুদূর প্রসারী কৌশলগত হিসাব-নিকাশও থাকে। নতুন পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকার একদিকে যেমন তাদের ছয় মাসের কাজের মূল্যায়ন শেষ করছে, অন্যদিকে আগামী দিনগুলোতে নির্বাচনী ইশতেহারের বাকি প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পথ সুগম করতে চাইছে। যেসব মন্ত্রণালয়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা পারফরম্যান্সের ঘাটতি রয়েছে সেগুলিতে অভিজ্ঞ কর্মঠ নেতাদের নতুনভাবে বসানো হতে পারে। বিশেষ করে যারা একই সঙ্গে একাধিক দপ্তরের দায়িত্ব থেকে হিমশিম খাচ্ছিলেন তাদের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হলে কাজের গতি অনেকটাই বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এছাড়া সরকারের ভেতরের সমন্বয়হীনতা দূর করতেও এ রদ-বদল একটি বড় ভূমিকা রাখবে। নতুন যুক্ত হতে যাওয়া সম্ভাব্য সদস্যদের তালিকাটি লক্ষ্য করলে বোঝা যায় সেখানে দলের বর্ষীয়ান রাজনীতিক ও রাজপথের পরীক্ষিত নেতাদের পাশাপাশি তরুণ নেতৃত্ব এবং প্রযুক্তিগত যোগ্যতা ব্যক্তিদেরও মূল্যায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। এতে করে একদিকে দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল যেমন চাঙ্গা হবে তেমনি প্রশাসনিক কাজেও একটি নতুন উদ্দীপনা তৈরি হবে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা সিনিয়র নেতাদের মতে, সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রিসভার এ পরিবর্তন বা সম্প্রসারণ অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। আর এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার একক এখতিয়ার কেবল প্রধানমন্ত্রীরই। সব মিলিয়ে ছয় মাসের হিসাব নিকাশ শেষ করে সরকার এখন নতুন গতিতে পথ চলতে চাইছে। আমলনামা যাচাই বাছাই শেষে কার ভাগ্যে নতুন দপ্তর জুটবে আর মন্ত্রিসভায় নতুন শপথ নিবেন তার উত্তর পেতে এখন শুধু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষা।
মন্ত্রিসভায় রদ-বদল বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, হতে পারে। হওয়াটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং সম্পূর্ণভাবে প্রধানমন্ত্রীর এখতিয়ার বা ইচ্ছাধীন ব্যাপার। তিনি চাইলে যখন তখন মন্ত্রিসভায় প্রয়োজন মনে করলে কাউকে যুক্ত করতে পারেন আবার কারও পারফর্মেন্স ওনার বিবেচনায় মনঃপূত না হলে যে কাউকে বাদও দিতে পারেন।
ডা. জাহেদ বলেন, এই বাদ পড়া বা নতুন কেউ মন্ত্রিসভায় যুক্ত হওয়া কিন্তু গণতান্ত্রিক প্র্যাক্টিস। ফ্যাসিস্ট বা স্বৈরশাসকের সঙ্গে গণতন্ত্রের এটাই বড় পার্থক্য। ফ্যাসিস্ট বা স্বৈরশাসকরা নিজের সিদ্ধান্তকে শ্রেষ্ঠ বিবেচনা করে বা জনমনে সেটা বোঝাতে ভুল হলেও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে না। তারা মূলত নিজেদের স্বৈরাচারী মানসিকতার কারণেই এটা করে থাকে। কিন্তু আমরা যে বারবার গণতন্ত্রের কথা বলে আসছি। সেখানে কাউকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ভুল করলে তিনি তা শুধরিয়ে নেবেন। রদ-বদল করবেন। জনগণের চাওয়াকে প্রাধান্য দেবেন, এটাই গণতন্ত্রের বিউটি।
এর আগে, শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। গত ১ জুন সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন মাসের মাথায় একজন মন্ত্রীর পদত্যাগে মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা বেশ বিব্রত ও অস্বস্তিতে পড়েন বলে জানা গেছে।
দীপেন দেওয়ান সত্যিই অসুস্থতার কারণে পদত্যাগ করেছেন, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে, তা নিয়ে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন আছে সরকার ও প্রশাসনে। দীপেন দেওয়ানের আকস্মিক পদত্যাগের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে রাঙামাটিতে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধও করেন স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
উল্লেখ্য, বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভা প্রধানমন্ত্রীসহ মোট ৫০ সদস্যের। এর মধ্যে ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন।