সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান © সংগৃহীত
বিএনপি জনগণের কাছে যে ওয়াদা দেয়, সরকার পরিচালনার দায়িত্বে থাকলে সেই ওয়াদা অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশের মানুষের বিপুল সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করেছে উল্লেখ করে তিনি দেশ পুনর্গঠনে জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা ও ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান।
শনিবার (১৬ মে) দুপুরে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর বাজার মাঠে একটি পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী চাঁদপুর সফরে যাওয়ার পথে এ পথসভায় অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা নির্বাচনের আগে বলেছিলাম, প্রত্যেক পরিবারের হাতে ধীরে ধীরে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছাব, কৃষক কার্ড দেব এবং মসজিদ-মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় গুরুদের জন্য সম্মানীর ব্যবস্থা করব। আমরা ইতিমধ্যে সেই কাজগুলো শুরু করেছি। বাংলাদেশের প্রায় ৬০ হাজার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্মানীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশের মা-বোনদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। কৃষক ভাইদের হাতে কৃষক কার্ড দেওয়ার কাজ অল্প করে হলেও শুরু করা হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায়, বিএনপি দেশের মানুষকে যে কথা দেয়, সরকারে থাকলে তা সব সময় রক্ষা করার চেষ্টা করে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করেছিলাম’ মন্তব্য করে দেশ পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করেছিলাম। একই সময়ে স্বাধীন হওয়া এশিয়ার অন্য দেশগুলো আজ আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে গিয়েছে। কারণ আমরা এক বিরাট স্বৈরাচারের কবলে পড়েছিলাম। ১৯৭১ সালে যেভাবে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা হয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবে দেশের মানুষ এবার স্বৈরাচারের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করেছে। তবে শুধু দেশ স্বাধীন করলেই হবে না, এখন প্রধান কাজ হচ্ছে দেশকে পুনর্গঠন করা।’
তারেক রহমান তার সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘দেশের মানুষের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরিবাকরির নিশ্চয়তা বিধান করা হবে। মা-বোনেরা যাতে শিক্ষায় ও অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেশের কৃষক ভাইদের স্বাবলম্বী করা এবং দেশে নতুন নতুন কলকারখানা স্থাপন করে বেকার সমস্যার সমাধান করা হবে। একই সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমনভাবে নিশ্চিত করা হবে, যাতে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দিনে-রাতের যেকোনো সময় নিরাপদে চলাচল করতে পারেন এবং ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন।’
পথসভায় কুমিল্লা বিভাগ প্রতিষ্ঠা, কুমিল্লায় একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং কুমিল্লা সদর হাসপাতালকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় রূপান্তরের দাবি জানানো হয়। এসব দাবি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কুমিল্লা বিভাগ দাবিটি যদি জনগণের প্রকৃত দাবি হয়ে থাকে, তবে ইনশাআল্লাহ সেটির বাস্তবায়ন করা হবে। এ ছাড়া সমগ্র কুমিল্লা জেলা ও আশপাশের এলাকায় প্রচুর শাকসবজি উৎপাদন এবং বিদেশে রপ্তানি হয়। আপনাদের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিটি নিয়ে আমি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর সাথে কথা বলব এবং সবকিছু বিবেচনা করে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করব। পর্যায়ক্রমে আপনাদের সকল যৌক্তিক দাবি পূরণ হবে।’
বক্তব্যের শেষে দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে জনগণের কাছে ধৈর্য প্রত্যাশা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিগত ১৬-১৭ বছরের স্বৈরাচারী সরকার যেমন মানুষের ওপর অত্যাচার, গুম ও খুন চালিয়েছে, ঠিক তেমনি দেশের অর্থ-সম্পদ বিদেশে লুটপাট করে পাচার করেছে। এই ব্যাপক লুটপাটের কারণে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বর্তমানে কিছুটা চাপের মুখে আছে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এবং কিছুটা সময় ধৈর্য ধারণ করতে হবে।’
এক দিনের এই সফরে তারেক রহমান চাঁদপুরে খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ এবং জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘জুলাই-আগস্টে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের সবাইকে দেশ গঠনে হাত দিতে হবে।’ এদিন বিকালে চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার টামটা দক্ষিণ ইউনিয়নের ওয়ারুক বাজার এলাকায় ‘খোর্দ খাল’ পুনর্খনন কাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই এলাকার সাতটা তাজা প্রাণ ঝরে গিয়েছিল স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে। সাতটা তাজা প্রাণ। কেন ঝরে গিয়েছিল? সেই সাতটা তাজা প্রাণ তাদের দাবি ছিল বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা। বিএনপিরই সাতটা প্রাণ ঝরে গিয়েছে বিগত স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে। এইভাবে সারা বাংলাদেশে শুধু বিএনপিরই শত শত নেতাকর্মী তাদের জীবন আত্মাহুতি দিয়েছেন। শুধু জুলাই-আগস্ট মাসেই আমাদের সারা বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে চারশোর মতো নেতাকর্মী খুন হয়েছিল।’
শহীদদের স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের স্বপ্ন যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, তাদের মৃত্যুকে যদি মূল্যায়ন করতে হয় তাহলে আমাদের সবাইকে আজ দেশ গঠন বা রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজে আমাদেরকে হাত দিতে হবে।’
পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারের লক্ষ্যে দেশব্যাপী নদী-নালা ও খাল পুনঃখনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
‘খোর্দ খাল’ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রায় ৪৮ বছর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খনন করে গিয়েছিলেন, তারপরে সময়ের পরিক্রমায় খালটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এই খাল শহীদ জিয়া যখন খনন করেছিলেন, তার ফলে এই এলাকার কৃষক ভাইদের সুবিধা হয়েছিল। প্রায় ২০০০ কৃষক পরিবার সুবিধা পেয়েছে। ১৩ কিলোমিটার লম্বা খালের সুবিধা বহু মানুষ পাবে, শুধু কৃষক ভাইয়েরা না, খালের দুই পাশে যারা থাকে তারাও পানির সুবিধা পাবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বাংলাদেশের মাটি এত উর্বর করে দিয়েছেন যে আমরা যদি সময়মতো পানি দিতে পারি তাহলে আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর রহমতে এখানে ফসল ফলে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘জুন মাসের বাজেটে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য বরাদ্দ অনেক বেশি থাকবে। আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের ৫০ লাখ মা-বোনের হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডিগ্রি বা স্নাতক পর্যন্ত মেয়েদের জন্য আমরা পড়াশোনার খরচ ফ্রি করবো। যে সকল মেয়েরা ভালো রেজাল্ট করবে তাদের আমরা সরকারের পক্ষ থেকে উপবৃত্তিরও ব্যবস্থা করবো। তোমাদের মন দিয়ে পড়তে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন,‘সারাদেশে আমরা ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছি। এর কারণ হচ্ছে দেশ খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ আছে, আমরা আরও বৃদ্ধি করতে চাই। যাতে খাদ্যের জন্য কোনো মানুষকে কষ্ট পেতে না হয়। বাংলাদেশ মাটি এমন উর্বর, অর্থাৎ সময় মতো সেচ দিতে পারলে ভালো ফসল উৎপাদন হয়।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আজকের এই খাল খনন অনুষ্ঠান থেকে প্রতিজ্ঞা করি, এই দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত। এই ৪০ কোটি হাত একসঙ্গে কাজ করলে আমরা বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে একটি মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারবো।’
বিগত সরকারের আমলে দেশের সম্পদ ও অর্থ পাচারের তীব্র সমালোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে যারা কাজ করবে তাদের জন্য বালিশ কেনা হয়েছিলো ৮০ হাজার টাকা দিয়ে। একটি বালিশের দাম কখনো ৮০ হাজার টাকা হতে পারে? জনগণের এই টাকাই বিদেশে পাচার করা হয়েছিলো।’
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো চাঁদপুর সফরে যাওয়ার সময় কুমিল্লা হয়ে যান বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার এ সফরকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন এলাকায় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। পথে পথে হাজারো মানুষের ঢলে পুরো এলাকায় সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের সভাপতিত্বে পথসভায় উপস্থিত ছিলেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিম ভূঁইয়া, কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া, কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রশাসক মোস্তফা মিয়া, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা (টিপু), কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সভাপতি উদবাতুল বারীসহ (আবু) জ্যেষ্ঠ নেতারা। সঞ্চালনা করেন কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ (ওয়াসিম)। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কুমিল্লা জেলা অংশে প্রবেশের পর পথিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে তাঁকে অভ্যর্থনা ও স্বাগত জানান বিএনপির নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষ।