ব্রাজিল-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ © সংগৃহীত
ব্রাজিল যে আর আগের সেই পরাক্রমশালী দলটি নেই, তা বেশ কিছুদিন ধরেই স্পষ্ট। সর্বশেষ বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিয়েছিল তারা—১৯৯০ সালের পর যা ছিল প্রথমবার। এর মধ্যে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে অস্ট্রেলিয়া দুইবার যেভাবে ব্রাজিলকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে, তাতে উদ্বেগটা আরও বাড়ছে। গত শুক্রবার যোগ করা সময়ে রায়ানের গোলে কোনোমতে ড্র বাঁচিয়েছিল ব্রাজিল। আজও ‘সকারুজ’দের বিপক্ষে দুই গোল হজম করে একসময় হারের শঙ্কায় পড়েছিল তারা। শেষ পর্যন্ত রাফিনিয়া, এনদ্রিক ও ভিনিসিয়ুসের হাত ধরে ঘুরে দাঁড়িয়ে সম্ভাব্য ‘লজ্জা’ এড়িয়েছে ব্রাজিল।
ম্যাচের আগে কার্লো আনচেলত্তি বলেছিলেন, ‘আমাদের কাছে বিশ্বকাপের ম্যাচ আর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ একই। আমরা ইতিহাসের সেরা জাতীয় দলকে প্রতিনিধিত্ব করি।’
আগের ম্যাচের একাদশ থেকে সাতটি পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নামেন তিনি। ব্রুনো ও দানিলোকে মাঝমাঠে রেখে বাঁ প্রান্তে ভিনিসিয়ুস এবং আক্রমণের কেন্দ্রে রাফিনিয়াকে খেলান আনচেলত্তি। বার্সেলোনায় হান্সি ফ্লিক যেমনটা করছেন, তেমনই রাফিনিয়াকে ‘নয় নম্বর’ হিসেবে খেলানোর পাশাপাশি অধিনায়কের আর্মব্যান্ডও পরিয়ে দেন তিনি।
টাউনসভিলে কয়েক দিন আগে যে ব্রাজিলকে দেখা গিয়েছিল, এদিন শুরু থেকেই তার চেয়ে অনেক বেশি গতিশীল ছিল দলটি। ম্যাচের পাঁচ মিনিটও পেরোয়নি, এর মধ্যেই এগিয়ে যায় তারা। দ্রুত আক্রমণে উঠে ডান দিক দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বক্সে ঢুকে পড়েন ভান্দেরসন। প্রথম স্পর্শে বল কিছুটা উঁচুতে উঠে গেলেও পরের শটে দুর্দান্তভাবে বলকে ওপরের কোণায় পাঠান তিনি।
গোলের পরপরই রাফিনিয়াকে ঠেকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন অস্ট্রেলিয়ার গোলরক্ষক প্যাট্রিক বিচ। তার দুটি শট ঠেকিয়ে দেন তিনি। প্রথম সারির চাপ ভেঙে দ্রুত সামনে যাওয়া এবং আক্রমণে গতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে তখন বেশ কার্যকর ছিল ব্রাজিল। তবে ভিনিসিয়ুস কিছুটা ছন্দহীন ছিলেন। গোলরক্ষকের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় বলের ওপর তার স্পর্শ একটু বেশি জোরালো হওয়ায় সুযোগটি নষ্ট হয়।
তবে চার মিনিটের ঝড়েই বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। ২৮তম মিনিটে ব্রাজিলের ভুলে বল পেয়ে গোল করেন সার্কাতি। আতিয়োর ভুল পাসের সুযোগ নিয়ে ম্যাচে সমতা ফেরায় অস্ট্রেলিয়া। মাত্র চার মিনিট পরেই উল্টো লিড নেয় তারা। বক্সের সামনে বল পেয়ে মেটকাফ দেখেন, তাকে ঠেকাতে কেউ এগিয়ে আসছে না। ভিনিসিয়ুসও সাহায্য করতে দেরি করেন। সেই সুযোগে জোরালো শটে কাছের পোস্ট দিয়ে বল জালে পাঠিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে এগিয়ে দেন মেটকাফ।
ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তখন পুরোপুরি বদলে যায়। ব্রাজিলের আক্রমণের তীব্রতা কমে আসে, অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া বলের দখল নিয়ে একের পর এক দ্বৈরথে জিততে থাকে। তবে প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগে আবারও ম্যাচে ফেরার সুযোগ পায় ব্রাজিল। ভিনিসিয়ুসের শট ব্লক করার পর ড্যানিলোকে ফাউল করে বসেন সাউটার। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। স্পট-কিক থেকে গোল করে ব্রাজিলকে ২-২ সমতায় ফেরান রাফিনিয়া।
আনচেলত্তির অধীনে এটাই ছিল রাফিনিয়ার প্রথম গোল। তবে বিরতির পর আর মাঠে নামতে পারেননি তিনি। পেশিতে অস্বস্তি অনুভব করায় তাকে তুলে নেন আনচেলত্তি। তার জায়গায় নামানো হয় এনদ্রিককে। আর তরুণ এই ফরোয়ার্ড মাঠে নামার পরই যেন বদলে যায় ব্রাজিলের আক্রমণ।
সাউটারের সঙ্গে ছোটখাটো এক সংঘর্ষেও জড়িয়ে পড়েছিলেন এনদ্রিক। এরপর ব্রাজিলের প্রত্যাবর্তনের গোলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। মাঝমাঠের কাছাকাছি বল পেয়ে দ্রুত বক্সের দিকে ছুটে যান এনদ্রিক। ভিনিসিয়ুসের কাছ থেকে বল ফেরত পাওয়ার পর সেটি পেছনে বাড়িয়ে দেন ব্রুনোর দিকে। ৬৯তম মিনিটে সেখান থেকে গোল করে ব্রাজিলকে আবারও এগিয়ে দেন ব্রুনো।
এরপর ব্যবধান বাড়ানোর আরও দুটি সুযোগ পেয়েছিলেন এনদ্রিক। তবে শেষ পর্যন্ত ব্রাজিলের জয় নিশ্চিত করেন ভিনিসিয়ুস। পুরোনো দিনের ভিনিসিয়ুসকে মনে করিয়ে দেওয়া এক দুর্দান্ত ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে জেসন গেরিয়াকে কাটিয়ে বক্সে ঢুকে পড়েন তিনি। তাকে ফাউল করায় পেনাল্টি পায় ব্রাজিল। মাঠে রাফিনিয়া না থাকায় স্পট-কিক নেওয়ার দায়িত্বও পান ভিনিসিয়ুস। সুযোগটি কাজে লাগিয়ে গোল করে ব্রাজিলের জয় নিশ্চিত করেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা।
একপর্যায়ে আবারও ব্রাজিলের পারফরম্যান্স নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। দুই গোল হজম করে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তারা যে অবস্থায় পড়েছিল, সেখান থেকে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেওয়াটা অবশ্যই স্বস্তির। তবে শেষ পর্যন্ত জয় পেলেও ম্যাচটি আবারও দেখিয়ে দিল, এই ব্রাজিলকে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।