মেসি ও রোনালদো © সংগৃহীত
২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর লিওনেল মেসি যখন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন, তখন যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল পুরো ফুটবল বিশ্ব। টানা কয়েকটি ফাইনালে ব্যর্থতার পর মাত্র ২৯ বছর বয়সে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। সেই সময়ে মেসির হতাশা ও কষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও। তাই মেসির সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়ে তাকে সমর্থন করার পাশাপাশি জাতীয় দলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন পর্তুগিজ তারকা।
২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। টাইব্রেকারে মেসির নেওয়া পেনাল্টি লক্ষ্যে না থাকায় হতাশায় ভেঙে পড়েন তিনি। এর আগে ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল এবং ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালেও শিরোপাবঞ্চিত হয়েছিল আর্জেন্টিনা। একের পর এক ফাইনালে হারের হতাশা শেষ পর্যন্ত মেসিকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
ফাইনালের পরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি। তখনকার ২৯ বছর বয়সী এই তারকার সিদ্ধান্তে শুধু আর্জেন্টিনার সমর্থকরাই নয়, বিস্মিত হয়েছিল গোটা ক্রীড়া বিশ্ব। মেসির এমন সিদ্ধান্তে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন রোনালদোও।
তৎকালীন সময়ে 'মুন্দো দেপোর্তিভো'-কে দেওয়া এক বক্তব্যে রোনালদো মেসির সিদ্ধান্তের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে বলেছিলেন, 'মেসি একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সবার তা বোঝা উচিত। সে হার বা হতাশায় অভ্যস্ত নয়, এমনকি দ্বিতীয় হওয়াতেও নয়। একটা পেনাল্টি মিস করলেই কেউ খারাপ খেলোয়াড় হয়ে যায় না।'
মেসির হতাশার কারণটাও বুঝতে পেরেছিলেন রোনালদো। তাই তাকে নিয়ে সমালোচনা না করে তার মানসিক অবস্থাটা বোঝার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। বিশেষ করে ফাইনালের পর মেসির কান্নার দৃশ্য নাড়া দিয়েছিল পর্তুগিজ তারকাকেও।
রোনালদো তখন আরও বলেছিলেন, 'মেসিকে এভাবে কাঁদতে দেখে কষ্ট লাগে। আমি আশা করি সে আবার তার জাতীয় দলে ফিরবে, কারণ তার দেশকে তার প্রয়োজন।'
রোনালদোর সেই আশা শেষ পর্যন্ত পূরণ হয়েছিল। অবসরের ঘোষণা দেওয়ার কিছুদিন পরই সিদ্ধান্ত বদলে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ফিরে আসেন মেসি। এরপর তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সোনালি অধ্যায়গুলোর একটি শুরু হয়। ২০২১ সালে আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকার শিরোপা এনে দেন তিনি। এরপর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতাও পূরণ করেন। ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে জাতীয় দলের হয়ে নিজের সাফল্যের মুকুটে আরও একটি পালক যোগ করেন তিনি।
তবে ১০ বছর পর আবারও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের ঘোষণা দিয়েছেন মেসি। উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত চলতি বছরের আসরে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের শিরোপা ধরে রাখার অভিযানে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত স্পেন শিরোপা জিতে নেয়। ফাইনালের সেই হারই আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ হিসেবে প্রমাণিত হয়। কয়েক সপ্তাহ পর সোমবার তিনি নিশ্চিত করেন, আর আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মাঠে নামবেন না।
২০১৬ সালের মতো এবারও মেসির সিদ্ধান্তে বিশ্ব ফুটবলে তৈরি হয়েছে আবেগঘন পরিস্থিতি। তবে এবার তার সিদ্ধান্ত বদলের সম্ভাবনা আগের চেয়ে অনেক কম বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ প্রথমবার অবসরের সময় মেসির বয়স ছিল ২৯ বছর; এবার ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে তিনি জাতীয় দলকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
অন্যদিকে, মেসির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রোনালদো নিজেও এখনো তার আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। ফলে মেসির বিদায়ের পর রোনালদো কতদিন পর্তুগালের জার্সিতে থাকবেন, সেটিও এখন ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহের বড় বিষয়।
এক দশক আগে মেসির অবসরের পর রোনালদো যে কথাগুলো বলেছিলেন, সেগুলো এখন ফিরে দেখলে আরও তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। মেসিকে ফিরে আসার আহ্বান জানানো সেই রোনালদো তখনও জানতেন না, তার প্রতিদ্বন্দ্বী একদিন বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুলে ধরবেন। তবে তিনি ঠিকই বুঝেছিলেন—একটি পেনাল্টি মিস কিংবা একটি ফাইনালের হার কোনোভাবেই মেসির মতো একজন কিংবদন্তির সামর্থ্যকে ছোট করে না।