লিওনেল মেসি © সংগৃহীত
বিশ্ব ফুটবলে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন লিওনেল মেসি। প্রায় দুই দশক ধরেই আর্জেন্টিনার নেতৃত্বভার সামলে যাচ্ছেন। শুধু নেতৃত্ব বললেও ভুল হবে, দলটির সাফল্যের প্রতিটি ধাপেই মিশে আছে মেসির ছোঁয়া। ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে আর্জেন্টিনাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেন তিনি।
সদ্য সমাপ্ত ফিফা বিশ্বকাপেও লে আলবিসেলেস্তেদের একক নৈপুণ্যে ফাইনাল পর্যন্ত টেনে নিয়েছিলেন মেসিই। তবে শিরোপা নির্ধারণী ফাইনালে নিষ্প্রভ মেসিতে রেকর্ড গড়ে শিরোপা ছোঁয়া হয়নি আর্জেন্টিনার। দেশটির এই মহাতারকা ক্যারিয়ারের গোধূলি-লগ্নে পৌঁছে যাওয়ায় এখন ফুটবল বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটাই—মেসির অবসরের পর আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ কী?
ফুটবল বিশ্লেষকদের দাবি, কোনো একক খেলোয়াড়ের পক্ষে মেসির শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব না। কেননা, আর্জেন্টাইন এই ক্ষুদে জাদুকর কেবল গোলদাতা কিংবা প্লে-মেকার নন। বরং যেকোনো ম্যাচের গতিপথ বদলে, রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তে সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই মেসির বিদায়ে একটি যুগের উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারাবে আর্জেন্টিনা।
ফুটবল বোদ্ধারা এ-ও মানছেন, বর্তমান আর্জেন্টিনা দল কেবল মেসি-নির্ভার দল নয়। সবশেষ কয়েক বছরে আর্জেন্টিনাকে একটি সামষ্টিক দল হিসেবেই গড়ে তুলেছেন লিওনেল স্কালোনি। আক্রমণ, মাঝমাঠ ও রক্ষণ—সব বিভাগেই ভারসাম্যের পাশাপাশি বিকল্প খুঁজে এনেছেন বিশ্বকাপজয়ী এই কোচ। তাই স্বাভাবিকভাবেই অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, মেসির বিদায়ে আর্জেন্টিনা শিবির হয়তো-বা বড় ধরনের ধাক্কা খাবে, তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলত অবস্থান হারাবে না।
বর্তমান আর্জেন্টিনা দলে ভবিষ্যৎ নেতৃতে অনেকেই এগিয়ে রাখা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে দলের অন্যতম ভরসার প্রতীক লাউতারো মার্টিনেজ। আরেক ফরোয়ার্ড হুলিয়ান আলভারেজও বড় ম্যাচে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখাচ্ছেন। পাশাপাশি, এনজো ফার্নান্দেজ ও আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার আধুনিক ফুটবলে অন্যতম সেরা তরুণ মিডফিল্ডার হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করছেন।
দলটিতে রদ্রিগো দে পলের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়ও আছেন। একইসঙ্গে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোও এরই মধ্যে বিশ্বসেরা সেন্টার-ব্যাকদের একজন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। সবমিলিয়ে মেসির অবসর পরবর্তীতে নেতৃত্ব কার কাঁধে যাবে, এ নিয়ে নানান প্রশ্ন, আলোচনা থাকলেও এদের মধ্যে কারোর কাছেই দল সামলানোর ভার পরতে যাচ্ছে, এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
নেতৃত্ব নিয়ে কোনো শঙ্কা না থাকলেও কাতার বিশ্বকাপজয়ীদের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জই অপেক্ষা করছে। কেননা, সাম্প্রতিক সময়ে আর্জেন্টিনা দলে এক মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য পাল্টে দেওয়ার মতো খুব কম খেলোয়াড়ই আছে। বিগ ম্যাচে তার অভিজ্ঞতা আর মানসিক দৃঢ়তার অভাব খুব স্বাভাবিকভাবেই ভোগাবে লে আলবিসেলেস্তেদের। পাশাপাশি নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে মানিয়ে এবং সৃজনশীলতার ঘাটতি কাটিয়ে ওঠাও দলের জন্য বড় পরীক্ষা হবে।
এরপর আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার বেশ কিছু কারণ আছে। ধারাবাহিকভাবে নতুন প্রতিভা তৈরি করছে দেশটির যুব ফুটবল কাঠামো। ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোতে নিয়মিতই সুযোগ পাচ্ছেন অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-২০ পর্যায় থেকে উঠে আসা ফুটবলাররা। তাই, ভবিষ্যতের জন্য প্রতিভার সংকট দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা কম।
সবমিলিয়ে মেসির গড়ে দেওয়া জয়ের সংস্কৃতি, স্কালোনির সুসংগঠিত পরিকল্পনা এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান ফুটবলারদের সমন্বয়ে আর্জেন্টিনা আগামী এক দশকেও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত রাখতে পারে বলে মনে করছেন ফুটবল-বোদ্ধারা।