মেসি ও ইয়ামালের সুতিকাগার লা মাসিয়া ফুটবল একডেমি © সংগৃহীত
মার্কিন মুলুকে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফিফা বিশ্বকাপ মেগা ফাইনালকে ঘিরে ফুটবল বিশ্বে যখন টানটান উত্তেজনা, ঠিক তখনই সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে ৩২৪ বছর পুরনো এক ঐতিহাসিক কাতালান খামারবাড়ি। ১৭০২ সালে নির্মিত এই চুনকাম করা ভবনটির নাম—‘লা মাসিয়া দে কান প্লানেস’। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে যা সংক্ষেপে লা মাসিয়া নামে পরিচিত। নিউজার্সিতে রবিবার (১৯ জুলাই) আর্জেন্টিনা বনাম স্পেনের এই হাইভোল্টেজ ফাইনালকে তাই অনেকেই রূপক অর্থে ডাকছেন ‘লা মাসিয়া ডার্বি’ নামে।
বিশ্বকাপ ফাইনালের আঙিনায় এই ফুটবল-খামারের জয়জয়কার বোঝাতে একটি বিশেষ স্কোরলাইনের দিকে নজর দেওয়া যাক; আর তা হলো—স্পেন ৮ - আর্জেন্টিনা ১। এটি কোনো ম্যাচের ফলাফল নয়, বরং এবারের ফাইনালে দুই দলের স্কোয়াড মিলিয়ে লা মাসিয়া থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়দের সংখ্যার পরিসংখ্যান। স্পেনের ফাইনাল স্কোয়াডে লা মাসিয়ার ‘গ্র্যাজুয়েট’ রয়েছেন আটজন—লামিনে ইয়ামাল, ভিক্টর মুনিয়োজ, পাউ কুবারসি, গাভি, দানি ওলমো, এরিক গার্সিয়া, অ্যালেক্স গ্রিমালদো এবং মার্ক কুকুরেয়া। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার ডাগআউটে লা মাসিয়ার প্রতিনিধি কেবল একজন, তবে তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা নক্ষত্র—লিওনেল মেসি।
মুনিয়োজ, কুকুরেয়া, গ্রিমালদো কিংবা মেসি এখন বার্সেলোনা ছেড়ে অন্য ক্লাবে খেললেও, স্পেনের বর্তমান দলের বাকি পাঁচজন এখনও বার্সারই ঘরের ছেলে। ক্লাব ক্যারিয়ারে তাদের বর্তমান ঠিকানা যা-ই হোক না কেন, সবার শিকড় কিন্তু মিশে আছে ওই এক লা মাসিয়াতেই। এই আট ফুটবলারকে নিয়ে স্পেন দল এবার ফিরিয়ে আনছে ১৬ বছর আগের সেই সোনালি স্মৃতিকে। ২০১০ সালে স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী দলে জাভি, ইনিয়েস্তা, পুয়োল, পিকে ও বুসকেতসসহ মোট ৯ জন লা মাসিয়ার সন্তান ছিলেন।
তবে এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং রোমাঞ্চকর। লা মাসিয়ার ইতিহাসের সর্বকালের সেরা সন্তানটি এবার খেলবেন খোদ লা মাসিয়ার গড়া স্প্যানিশ প্রাচীরের বিপক্ষে। ফলে ট্রফি যে দেশেই যাক না কেন, একটি বিষয় শতভাগ নিশ্চিত—বিশ্বকাপের একটি স্বর্ণপদক লা মাসিয়ার কোনো না কোনো সন্তানের গলায় উঠছেই।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ফাইনাল আসলে লা মাসিয়ার ‘অতীতের সঙ্গে বর্তমান ও ভবিষ্যতের’ এক মহাকাব্যিক লড়াই। একদিকে মাত্র ১৩ বছর বয়সে এই খামারে পা রেখে বার্সেলোনার সর্বজয়ী পোস্টারবয় বনে যাওয়া লিওনেল মেসি, যিনি লা মাসিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে সোনালি অতীত ও বর্তমান।
অন্যদিকে মাত্র ১৯ বছর বয়সে স্পেন ও বার্সার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন কাঁধে নেওয়া ফরোয়ার্ড লামিনে ইয়ামাল, যিনি এই খামারের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। ফুটবল ইতিহাসের দুটি ভিন্ন যুগের এই মেলবন্ধন বার্সেলোনার সভাপতি হোয়ান লাপোর্তাকেও করেছে গর্বিত। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, “মেসি হলেন অতীত ও বর্তমান, আর লামিনে হলো বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। বার্সা ও লা মাসিয়া নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই।”
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যখন ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজবে, তখন হাজার মাইল দূরে কাতালুনিয়ায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই ধূসর রঙের ভবনটিই হবে এক নীরব বিজয়ী। সামনে সবুজ মাঠ আর গাছপালায় ঘেরা এই ইটের দালানটি আসলে কোনো সাধারণ ভবন নয়, এটি ফুটবল বিশ্বের কোটি কোটি তরুণের এক অবিনশ্বর স্বপ্নের নাম। আর সেই স্বপ্নপুরী থেকে উঠে এসেই আজ বিশ্বমঞ্চ কাঁপাতে মুখোমুখি হচ্ছেন মেসি ও ইয়ামালরা।