ব্যানার হাতে আর্জেন্টিনার উদযাপন © টিডিসি ফটো
ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে জয়ের পর মাঠে ‘ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনার’ লেখা একটি ব্যানার প্রদর্শন করেছে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা। ফিফার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাজনৈতিক বার্তাসংবলিত ওই ব্যানার প্রদর্শনের কারণে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ফিফার শৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী সতর্কবার্তা থেকে শুরু করে জরিমানা, এমনকি চরম ক্ষেত্রে শিরোপা কেড়ে নেওয়ার মতো ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
ইংল্যান্ডকে নাটকীয়ভাবে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনাল নিশ্চিত করার পর উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা। উদ্যাপনের একপর্যায়ে তারা গ্যালারি থেকে 'ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনার' লেখা একটি ব্যানার মাঠে নিয়ে এসে প্রদর্শন করেন। তবে ম্যাচ চলাকালে বা ম্যাচ-পরবর্তী আনুষ্ঠানিক আয়োজনে রাজনৈতিক বার্তা বহনকারী কোনো ব্যানার বা বার্তা প্রদর্শনের অনুমতি দেয় না ফিফা।
ফিফার ৬৪ পৃষ্ঠার শৃঙ্খলা বিধির ১৭ নম্বর ধারার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো ফুটবল সংস্থা বা দল খেলাধুলার পরিবেশের সঙ্গে অসংগত রাজনৈতিক, আদর্শিক, ধর্মীয় বা আপত্তিকর বার্তা অঙ্গভঙ্গি, লেখা, বস্তু বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে প্রচার করলে সেই দায় সংশ্লিষ্ট ফুটবল সংস্থাকেই বহন করতে হবে।
যেসব শাস্তি দিতে পারে ফিফা
এ ধরনের বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ফিফা বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
সতর্কবার্তা
আনুষ্ঠানিক তিরস্কার
জরিমানা বা আর্থিক দণ্ড
পুরস্কারের অর্থ ফেরত নেওয়া
শিরোপা কেড়ে নেওয়া
আর্থিক দায়বদ্ধতা পূরণের নির্দেশ
শুধু খেলোয়াড়দের কর্মকাণ্ড নয়, সমর্থকদের আচরণের জন্যও সংশ্লিষ্ট ফুটবল সংস্থাকে দায় নিতে হতে পারে। শৃঙ্খলা বিধিতে বলা হয়েছে, কোনো দলের এক বা একাধিক সমর্থক জাতীয় সংগীত চলাকালে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে সেই দায়ও সংশ্লিষ্ট ফুটবল সংস্থার ওপর বর্তাবে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা ইংল্যান্ডের জাতীয় সংগীত চলাকালে 'যে লাফায় না, সে ইংরেজ' বলে স্লোগান দেন। এতে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতে দেখা যায়।
ফিফার বিধি অনুযায়ী, রাজনৈতিক বার্তাসংবলিত ব্যানার প্রদর্শনের প্রথম অপরাধ তুলনামূলক কম গুরুতর হলে প্রায় ৩১ হাজার ব্রাজিলিয়ান রিয়াল সমপরিমাণ জরিমানা হতে পারে। অপরাধ গুরুতর হিসেবে বিবেচিত হলে জরিমানার পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৬২ হাজার ব্রাজিলিয়ান রিয়াল (প্রায় ১৪ লাখ ৯৪ হাজার টাকা) পৌঁছাতে পারে। একই ধরনের অপরাধ পুনরায় ঘটলে প্রতিবার জরিমানার পরিমাণ ১০০ শতাংশ করে বাড়বে।
জাতীয় সংগীত চলাকালে বিশৃঙ্খলার ঘটনায় প্রথমবার প্রায় ৩১ হাজার ব্রাজিলিয়ান রিয়াল (প্রায় ৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা) এবং দ্বিতীয়বার প্রায় ৪৭ হাজার ব্রাজিলিয়ান রিয়াল (প্রায় ১১ লাখ ৩৩ হাজার টাকা) পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। তৃতীয়বার থেকে এ ক্ষেত্রেও জরিমানার পরিমাণ দ্বিগুণ হারে বাড়তে থাকবে।
এদিকে আগামী রোববার সন্ধ্যা ৬টায় নিউইয়র্ক/নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলবে আর্জেন্টিনা। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে মাঠে নামবে। একই সঙ্গে ৬৪ বছর পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়ার সুযোগও রয়েছে তাদের সামনে।
ফকল্যান্ডস ইস্যুকে রাজনৈতিক হিসেবে দেখার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক বিরোধ। দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জকে আর্জেন্টিনা 'মালভিনাস' এবং যুক্তরাজ্য 'ফকল্যান্ডস' নামে ডাকে। ১৮৩৩ সাল থেকে দ্বীপগুলোর নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাজ্যের হাতে থাকলেও শুরু থেকেই এর সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে আর্জেন্টিনা।
এই বিরোধের জেরে ১৯৮২ সালের ২ এপ্রিল থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত ৭৪ দিন ধরে ফকল্যান্ডস যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধে মোট ৯০৭ জন নিহত হন। তাদের মধ্যে ৬৪৯ জন ছিলেন আর্জেন্টিনার, ২৫৫ জন ব্রিটিশ এবং তিনজন ছিলেন দ্বীপপুঞ্জের বেসামরিক বাসিন্দা।
যুদ্ধ শেষ হলেও ফকল্যান্ডস দ্বীপপুঞ্জ এখনো যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে আর্জেন্টিনা এখনো দ্বীপগুলোর ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের দাবি জানিয়ে আসছে। এই কারণেই 'ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনার' লেখা ব্যানারটি কেবল একটি ক্রীড়া বার্তা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।