দেম্বেলের গোল উদযাপন © সংগৃহীত
ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ‘প্যারাডক্স’ বা বৈপরীত্যের গল্প যদি লিখতে বলা হয়, তবে ওসমানে দেম্বেলের নামটা বোধহয় সবার ওপরে থাকবে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফ্রান্সের জার্সি গায়ে নিজের প্রথম তিনটি গোল করতে এই ফরোয়ার্ডের সময় লেগেছিল দীর্ঘ চার বছর। অথচ ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে আজ নরওয়ের রক্ষণভাগকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে সেই ৩ গোল করতে তিনি সময় নিলেন মাত্র ৩২ মিনিট!
এদিন‘আই’ গ্রুপের শেষ ম্যাচে দাপুটে জয় তুলে নেয় ফ্রান্স। উসমান দেম্বেলের হ্যাটট্রিকে নরওয়েকে ৪-১ গোলে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবেই নকআউট পর্বে নাম লিখিয়েছে ফ্রান্স। চলতি বিশ্বকাপের তৃতীয় হ্যাটট্রিকটি তুলে নিয়ে প্রথমার্ধেই ফ্রান্সকে ৩-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে লিড এনে দেয় এই বারুদ-ফরোয়ার্ড।
ম্যাচের শুরু থেকেই ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা নরওয়ের ওপর রীতিমতো টর্নেডো বইয়ে দেয়। শুরুর পাঁচ মিনিটেই গোল হতে পারত গোটা দুয়েক। তবে আসল ধাক্কাটা আসে সপ্তম মিনিটে। ডানপ্রান্তে বল পেয়ে নরওয়ের ডিফেন্ডার বিয়োর্কানকে স্রেফ নাচিয়ে ছাড়েন দেম্বেলে। এক পা, দু পা করে ভেতরে ঢুকে আচমকা এক জোরালো শটে পরাস্ত করেন নরওয়ের গোলরক্ষক সেলভিককে। ১-০ তে লিড নেয় ফ্রান্স।
ম্যাচের ২০তম মিনিটে দেখা যায় দেম্বেলের একক দক্ষতার আরেকটি মাস্টারক্লাস। মাঝমাঠে কিলিয়ান এমবাপের জার্সি টেনে ধরেও থামাতে পারেনি নরওয়ের ওস্তিগাদ। রেফারি চমৎকারভাবে ‘অ্যাডভান্টেজ’ দিলে বল চলে আসে ডানপ্রান্তে থাকা দেম্বেলের পায়ে। বক্সে এমবাপেকে পাস দেওয়ার সহজ সুযোগ থাকলেও দেম্বেলে বেছে নেন কঠিন পথ। একটু ভেতরে কেটে ঢুকে বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া তার বাঁকানো দূরপাল্লার শটটি যখন জালের কোণায় আশ্রয় নেয়, সেলভিকের তখন চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না।
তবে নাটকীয়তার তখনও বাকি। ফ্রান্সের উল্লাসের রেশ কাটার আগেই, ঠিক তার পরের মিনিটেই (২১তম মিনিটে) কিক-অফ থেকে দুর্দান্ত এক গোল শোধ করে বসে নরওয়ে। রেঞ্জার্স মিডফিল্ডার থেলো আসগার্ড ফরাসি বক্সের মাথায় বল পেয়ে দারুণ এক ড্রিবলিংয়ে ডিফেন্ডারকে ভুল পথে পাঠান। এরপর ঠাণ্ডা মাথায় পরাস্ত করেন ফরাসি প্রাচীর মাইগনানকে। ২-১ স্কোরে ম্যাচটি যখন নতুন রোমাঞ্চের ইঙ্গিত দিচ্ছিল, ঠিক তখনই মঞ্চে আবার দেম্বেলে-শো।
৩২তম মিনিটে অহিলিয়েন চুয়ামেনির এক নিখুঁত পাস বক্সের ভেতর খুঁজে নেয় দেম্বেলেকে। সেখানে দাঁড়িয়ে শট নেওয়ার মতো এক ইঞ্চি জায়গাও ছিল না। কিন্তু দেম্বেলে বডি ফেইন্ট বা শরীরের ট্যাকটিকাল ছলাকলায় চার থেকে পাঁচবার দিক পরিবর্তনের ভান করে অবিশ্বাস্যভাবে নিজের শট নেওয়ার জায়গা তৈরি করেন। শটে গতির চেয়ে নিখুঁত প্লেসমেন্টকে প্রাধান্য দিলেন। আলতো ছোঁয়ার শটটি দূরের পোস্ট ঘেঁষে যখন জালে জড়াল, গ্যালারি তখন দেম্বেলে-দেম্বেলে চিৎকারে ফেটে পড়েছে। ৩২ মিনিটেই পূর্ণ হলো রূপকথার এক হ্যাটট্রিক।
আর্লিং হালান্ড এবং মার্টিন ওডেগার্ডকে বেঞ্চে বসিয়ে রেখে নরওয়ে যে জুয়া খেলেছিল, প্রথমার্ধেই তা বুমেরাং হয়ে ধরা দিল। ফ্রান্স এবং নরওয়ে দুই দলই আগেভাগে শেষ ৩২ নিশ্চিত করে রাখলেও, গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লড়াইয়ে দেম্বেলের এই ৩২ মিনিটের টর্নেডো ফ্রান্সকে রাজকীয়ভাবে চালকের আসনে বসিয়ে দিল।