উরুগুয়ের কোচ বিয়েলসা © টিডিসি ফটো
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের বাঁচা-মরার মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগেই উরুগুয়ে শিবিরে যেন সাক্ষাৎ গৃহযুদ্ধ লেগেছে! মাঠের কৌশলে ব্যর্থতার পর এবার খোদ প্রধান কোচ মার্সেলো বিয়েলসার বিরুদ্ধেই প্রকাশ্য বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন দলের শীর্ষ ফুটবলাররা। খবর ব্রাজিলের জনপ্রিয় পত্রিকা গ্লোবো।
গ্রুপ ‘এইচ’-এর শেষ ম্যাচে স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার আগে পর্দার আড়ালের এই চরম উত্তেজনা উরুগুয়ের বিশ্বকাপ যাত্রাকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। সৌদি আরব ও নবাগত কেপ ভার্দের বিপক্ষে হতাশাজনক ড্রয়ের পর দ্বিতীয় পর্বে উঠতে এই ম্যাচে জয়ের কোনো বিকল্প নেই দলটির সামনে। অথচ এমন এক ‘ডু অর ডাই’ ম্যাচের আগে মাঠের কৌশলের চেয়ে ড্রেসিংরুমের কোন্দলই এখন উরুগুয়ের বড় প্রতিপক্ষ।
রেডিও স্টেশন ‘এস্পেকটাডোর দেপোর্তেস’-এর এক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে জানা গেছে, রিয়াল মাদ্রিদের মিডফিল্ডার ফেদেরিকো ভালভার্দে এবং ইন্টারন্যাসিওনালের গোলরক্ষক রোশের নেতৃত্বে একদল ফুটবলার কোচ বিয়েলসার কৌশল ও ধরন পরিবর্তনের দাবি তুলে বিদ্রোহ করেছেন। এই দলে আরও শামিল ছিলেন ম্যানুয়েল উগার্তে এবং রদ্রিগো বেনতানকুর। খেলোয়াড়রা বিয়েলসাকে একটি জরুরি বৈঠকের জন্য ডেকেছিলেন। সেখানে তারা জানান যে, অতিরিক্ত প্রশিক্ষণের চাপের কারণে তারা অসন্তুষ্ট এবং এর ফলেই প্রস্তুতির সময় কয়েকজন খেলোয়াড় ইনজুরিতে পড়েছেন। খেলোয়াড়রা অনুশীলনের ধরন বদলানোর পাশাপাশি স্পেনের বিপক্ষে ‘লো ব্লকে’ ডিফেন্স করে কেবল পাল্টা আক্রমণ (কাউন্টার অ্যাটাক) কাজে লাগিয়ে খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
প্রতিবেদন অনুসারে, খেলোয়াড়দের এমন দাবিতে ক্ষুব্ধ হয়ে বিয়েলসা একটি সাধারণ সভা ডাকেন। তবে পরিস্থিতি শান্ত করার বদলে তিনি সেখানে দীর্ঘ ৪৮ মিনিট ধরে বক্তব্য রাখেন এবং নিজের কাজের ধরন ও দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করেন। উল্টো অভিযোগ করে বিয়েলসা বলেন, লুইস সুয়ারেজকে দলে না ডাকা এবং মিডফিল্ডার নাহিতান নান্দেজকে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত না করার পর থেকেই খেলোয়াড়রা তাঁকে কোচের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এখানেই শেষ নয়, এই আর্জেন্টাইন কোচ সভায় দাবি করেন যে কাসেরেস এবং ম্যাক্সি আরাউহোর মতো জাতীয় দলের কিছু খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার মূলত তিনিই গড়ে দিয়েছেন। কোচের এমন মন্তব্যের পর কয়েকজন খেলোয়াড় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সভা ছেড়ে চলে যান। ডিফেন্ডার হোসে মারিয়া হিমেনেজ পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত সফল হননি।
উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতি নিয়ে উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেডিও স্টেশনটিকে জানিয়েছেন, 'এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে' কোচ মার্সেলো বিয়েলসাকে উরুগুয়ে জাতীয় দল থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। তবে স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচের আগের দিনের আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়টি উত্থাপন করা হয়নি। এই প্রসঙ্গে উল্লিখিত খেলোয়াড়, কোচ কিংবা উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
ড্রেসিংরুমের এই ছন্নছাড়া অবস্থার মধ্যেই উরুগুয়েকে আজ মোকাবিলা করতে হবে এক কঠিন ঐতিহাসিক সত্যের। কারণ, ফুটবল ইতিহাসে উরুগুয়ে কখনো স্পেনকে হারাতে পারেনি। এই শনিবার গুয়াদালাহারায় যখন তারা মাঠে নামবে, তখন তাদের সামনে থাকবে ১০ ম্যাচের এক পাহাড়সম পরিসংখ্যান; যেখানে স্পেনের জয় ৫টিতে এবং বাকি ৫টি ম্যাচ ড্র হয়েছে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এই নিয়ে তৃতীয়বারের মতো মুখোমুখি হচ্ছে এই দুই দল। এর আগে বিশ্বমঞ্চের দুটি ম্যাচই ড্র হয়েছিল। প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল ১৯৫০ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পাকাইমবুতে, যা ২-২ গোলে ড্র হয়। দ্বিতীয় দ্বৈরথটি হয়েছিল ১৯৯০ ইতালির বিশ্বকাপে, যা ০-০ গোলে ড্র হয় এবং সেই ম্যাচে উরুগুয়ের স্ট্রাইকার রুবেন সোসা একটি পেনাল্টি মিস করেছিলেন। দুই দলের শেষ দেখা হয়েছিল ২০১৩ সালের কনফেডারেশনস কাপে, যেখানে স্পেন ২-১ গোলে জয়লাভ করে।
স্পেন ও উরুগুয়ের মধ্যকার সব ম্যাচের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়: স্পেন ২-১ উরুগুয়ে (কনফেডারেশন কাপ ২০১৩), স্পেন ৩-১ উরুগুয়ে (২০১৩ সালের একটি প্রীতি ম্যাচ), স্পেন ২-০ উরুগুয়ে (২০০৫ সালের একটি প্রীতি ম্যাচ), স্পেন ২-২ উরুগুয়ে (১৯৯৫ সালের একটি প্রীতি ম্যাচ), স্পেন ২-১ উরুগুয়ে (১৯৯১ সালের একটি প্রীতি ম্যাচ), স্পেন ০-০ উরুগুয়ে (১৯৯০ বিশ্বকাপ), উরুগুয়ে ০-০ স্পেন (১৯৭৮ সালের একটি প্রীতি ম্যাচ), স্পেন ২-০ উরুগুয়ে (১৯৭২ সালের একটি প্রীতি ম্যাচ), স্পেন ১-১ উরুগুয়ে (১৯৬৬ সালের একটি প্রীতি ম্যাচ) এবং ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে স্পেন ২-২ উরুগুয়ে।
টানা দুই ড্রয়ের পর নকআউটের টিকিট পেতে হলে উরুগুয়েকে আজ শুধু স্পেনের বিপক্ষে মাঠের ফুটবলই জিততে হবে না, বরং ভাঙতে হবে নিজেদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রথা এবং জয় করতে হবে ভেতরের চরম বিভেদকে।