খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় © টিডিসি সম্পাদিত
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) পাঁচ শিক্ষকসহ সাত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। গত ২৭ অক্টোবর এ-সংক্রান্ত নোটিশ জারি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয়। গত ১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১৫তম সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগসংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘন, নিয়োগের সময় বয়সসংক্রান্ত অনিয়ম, ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ দাখিলসহ বিভিন্ন অভিযোগ তদন্তের পর তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
চাকরিচ্যুত ব্যক্তিরা হলেন, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক ড. পিন্টু চন্দ্র শীল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (আইইএম) বিভাগের অধ্যাপক ড. সুব্রত তলাপাত্র, এনার্জি সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (ইএসই) বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নিবিড় মন্ডল, মানবিক ও ব্যবসায় বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসরুরা মোস্তফা ও সহকারী অধ্যাপক শাহরিয়ার রোমান, ডেপুটি রেজিস্ট্রার নিমাই চন্দ্র মিস্ত্রি এবং অফিস সহায়ক সত্যজিৎ কুমার দত্ত।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পিন্টু চন্দ্র শীল, নিমাই চন্দ্র মিস্ত্রি ও সত্যজিৎ কুমার দত্ত ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন। তাদের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৪তম সিন্ডিকেট সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, সুব্রত তলাপাত্র, নিবিড় মন্ডল, মাসরুরা মোস্তফা ও শাহরিয়ার রোমান ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন। তাদের বিষয়ে ৯৫তম সিন্ডিকেট সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সিএসই বিভাগের অধ্যাপক ড. পিন্টু চন্দ্র শীলের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বাধা দেওয়া, বিভিন্ন সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নির্যাতনে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকা এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। সাময়িক বরখাস্ত থাকাকালে তিনি নিয়মিত কুয়েট ক্যাম্পাসে উপস্থিত থাকতেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ও স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ওয়েবসাইটে তাঁর নাম দেখা গেছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানে তার যুক্ত থাকার বিষয়ে কুয়েট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছিল না বলে জানা গেছে।
অধ্যাপক ড. সুব্রত তলাপাত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ২০১০ সালের ২০ অক্টোবর কুয়েটে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের সময় আবেদনপত্রে উল্লেখিত বয়সের শর্ত পূরণ করেননি। আবেদনের সময় তার বয়স ৩০ বছরের বেশি ছিল, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগবিধি অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মানবিক ও ব্যবসায় বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসরুরা মোস্তফার বিরুদ্ধেও প্রভাষক পদে আবেদনের সময় বয়স ৩০ বছরের বেশি থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির অভিজ্ঞতা গণনা করার বিষয়টিও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগবিধি অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহরিয়ার রোমানের বিরুদ্ধে নিয়োগের শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, প্রভাষক পদে আবেদনের ক্ষেত্রে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উভয় পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার শর্ত ছিল। তবে তিনি উভয় পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েও জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া সহকারী অধ্যাপক পদে আবেদনের সময় তিনি নিজের নামে প্রকাশিত দুটি গবেষণাপত্রের তথ্য উল্লেখ করলেও সেগুলোর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সহকারী অধ্যাপক নিবিড় মন্ডলের বিরুদ্ধে চাকরিতে যোগদানের সময় প্রকল্পে কাজের অভিজ্ঞতা দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগবিধি অনুযায়ী ওই অভিজ্ঞতা গ্রহণযোগ্য ছিল না বলে জানা গেছে। এ ছাড়া সাময়িক বরখাস্ত থাকা অবস্থায় কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে বিদেশে গেলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে ফিরে কর্মস্থলে যোগদান করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে, ডেপুটি রেজিস্ট্রার নিমাই চন্দ্র মিস্ত্রি ও অফিস সহায়ক সত্যজিৎ কুমার দত্তের বিরুদ্ধে সেকশন অফিসার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিজ্ঞতার সনদ দাখিল এবং জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়স কমিয়ে চাকরি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর ডেপুটি রেজিস্ট্রার নিমাই চন্দ্র মিস্ত্রি ও সহকারী অধ্যাপক নিবিড় মন্ডল হাইকোর্টে রিট করেছিলেন বলে জানা গেছে। তবে কুয়েট রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের দাবি, তারা নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে রিট করেননি; বরং ছয় মাসের বেশি সময় কাউকে সাময়িক বরখাস্ত রাখা যায় কি না, সে বিষয়ে রিট করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সম্পন্ন করা হয়েছে।
এ বিষয়ে কুয়েটের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী মো. আনিছুর রহমান ভূঞা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১৫তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাতজনকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই অভিযোগ ছিল। এ কারণে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। অভিযোগ তদন্তের পর অনেকের কাছে ব্যাখ্যা তলব করা হলেও তারা কোনো জবাব দেননি।