বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সঙ্গে ‘সক্ষম’-এর সদস্যরা © টিডিসি
রঙিন কাগজে ফুল বানানো, ছোট ছোট হাতে ওয়াল ম্যাট তৈরি, গল্পের ফাঁকে হঠাৎ গান—দিনাজপুর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ে গেলে এমন দৃশ্য এখন আর নতুন নয়। এসব মুহূর্তের সঙ্গী হয়ে উঠেছেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) আট শিক্ষার্থী। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাদের সৃজনশীলতা বিকাশে কাজ করা এবং সমাজে তাদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে তারা গড়ে তুলেছেন ‘সক্ষম’।
২০২৬ সালের ১০ মে দিনাজপুর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয় পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে ‘সক্ষম’-এর পথচলা শুরু হয়। একটি ট্রেনিং প্রোগ্রামে পরিচয়ের পর দুই মাসের একটি সামাজিক প্রকল্পে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়েই তারা উপলব্ধি করেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে। সেই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় ‘সক্ষম’।
সংগঠনটির কো-ফাউন্ডাররা হলেন মাহামুদুল হাসান রিফাত, ইয়ামিন ফারিয়া, আনিকা জাহান অবন্তি, মেহেদী হাসান সাকিব, সাফওয়াত সাইমা শাহানা, হাবিবুল বাশার, মো. রাহুল চৌধুরী এবং ত্রয়ী সরকার।
শুরুর দিকে দিনাজপুর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সঙ্গে কীভাবে সংবেদনশীলভাবে কাজ করতে হয়, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন তারা। এরপর থেকে নিয়মিত বিদ্যালয়ে গিয়ে শিশুদের সঙ্গে গল্প করা, খেলাধুলা, গান, শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং সৃজনশীল কাজে অংশ নেওয়া তাদের নিয়মিত কার্যক্রমে পরিণত হয়।
বর্তমানে ‘সক্ষম’ শিশুদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশে নিয়মিত কাজ করছে। পাশাপাশি তাদের হাতে-কলমে বিভিন্ন হস্তশিল্প তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। শিশুদের তৈরি ওয়াল ম্যাট, বুকে, কানের দুল, চুলের ক্লিপসহ বিভিন্ন পণ্য সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্টল এবং ‘সক্ষম’-এর ফেসবুক পেজের মাধ্যমে প্রদর্শন ও বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিশুদের কাজের মূল্যায়নের পাশাপাশি তাদের আত্মবিশ্বাসও বাড়ছে।
এখন পর্যন্ত সংগঠনটি ১১টি ফিল্ড ভিজিট সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে কয়েকজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর সঙ্গে নিয়মিতভাবে কাজ করছে তারা। সংগঠনটির সদস্যরা মনে করেন, সংখ্যার চেয়ে প্রতিটি শিশুর সঙ্গে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও অর্থবহ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং তাদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
‘সক্ষম’-এর কো-ফাউন্ডার মাহামুদুল হাসান রিফাত বলেন, `দিনাজপুর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে আমি জানতামই না যে প্রতিবন্ধিতার বিভিন্ন ধরন ও অটিজম স্পেকট্রামের মানুষ সম্পর্কে এত কিছু রয়েছে। বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর বিষয়টি সম্পর্কে বাস্তব ধারণা পাই। শুরুতে ভেবেছিলাম আমরা শিশুদের অনুপ্রাণিত করব, কিন্তু তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমরাই প্রতিবার অনুপ্রাণিত হয়ে ফিরেছি। আমাদের লক্ষ্য ছিল সচেতনতা তৈরি করা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের সমাজের মূলধারার অংশ করে তোলা। দীর্ঘ দুই মাস মাঠপর্যায়ে কাজ করার পর মনে হয়েছে, আমরা পরিবর্তনের একটি ছোট সূচনা করতে পেরেছি।'
তিনি আরও জানান, বর্তমানে ‘সক্ষম’-এর সব কার্যক্রম আটজন কো-ফাউন্ডারের ব্যক্তিগত অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। এখনো কোনো স্পন্সর, অনুদান বা প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা নেই। তবে ভবিষ্যতে আরও বেশি স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত করা, আরও বেশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর কাছে পৌঁছানো এবং কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
দিনাজপুর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবুল শাহনেওয়াজ বলেন, ‘প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নয়। আমাদের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের পাশে আমাদের সবার এগিয়ে আসা উচিত।’
সংগঠনটির কার্যক্রমে সন্তুষ্ট এক অভিভাবক বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন অনেক শিশুই সূক্ষ্ম ও সৃজনশীল কাজে পারদর্শী। কিন্তু সমাজ তাদের ওপর ভরসা করতে চায় না। ‘সক্ষম’ সেই ভরসা তৈরি করছে। আমরা আনন্দিত এবং আশাবাদী যে, এই উদ্যোগ আরও অনেক মানুষের মন জয় করবে।
বর্তমানে ‘সক্ষম’-এর কোনো স্পন্সর বা পার্টনার প্রতিষ্ঠান নেই। প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের ব্যক্তিগত অর্থায়নেই পরিচালিত হচ্ছে সব কার্যক্রম। তবু অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা তাদের পথচলা থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং শিশুদের মুখের হাসিকেই তারা নিজেদের সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করেন।
আগামী এক বছরে আরও বেশি স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত করা, আরও বেশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর কাছে পৌঁছানো, নতুন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং আরও বিশেষায়িত বিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে ‘সক্ষম’-এর। পাশাপাশি যেসব বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু এখনো কোনো বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না, ভবিষ্যতে তাদের কাছেও পৌঁছাতে চায় সংগঠনটি।
‘সক্ষম’-এর সদস্যদের বিশ্বাস, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের করুণার নয়, প্রয়োজন সুযোগ, আস্থা ও ভালোবাসা। সেই সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে তারাও নিজেদের প্রতিভা বিকশিত করে সমাজের মূলধারায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। আর সেই বিশ্বাস নিয়েই প্রতিদিন নতুন স্বপ্ন বুনছে হাবিপ্রবির এই আট শিক্ষার্থীর উদ্যোগ—‘সক্ষম’।