ইকামাতেদ্বীন মডেল কামিল মাদ্রাসা
ইকামাতেদ্বীন মডেল কামিল মাদ্রাসা © এআই জেনারেটেড ছবি
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার ইকামাতেদ্বীন মডেল কামিল মাদ্রাসায় এনটিআরসিএর সনদ ছাড়া নিয়োগ, পদ বিলুপ্ত হলেও অবৈধভাবে বেতন-ভাতা উত্তোলনসহ নানা খাতে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে। ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে ডিআইএ। পরে অনিয়মের বিষয়গুলো তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয় চলতি বছরের মে মাসে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পুলিশ খ্যাত ডিআইএর তদন্তে প্রতিষ্ঠানটিতে এনটিআরসিএর নিবন্ধন ছাড়াই শিক্ষক নিয়োগ, দারুল ইহসানের অবৈধ সনদের ভিত্তিতে এমপিও সুবিধা গ্রহণ, অনুমোদনহীন স্তরের শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলন, অতিরিক্ত স্কেলে বেতন গ্রহণের বিষয়গুলো প্রকাশ্যে এসেছে। এসব অনিয়মের কারণে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫২ টাকার আর্থিক ক্ষতির কথা বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইএ পরিচালক প্রফেসর এম. এম সহিদুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমরা প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করে যা পেয়েছি, সেটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি। এখন এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা মন্ত্রণালয় নেবে।’
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় অনিয়ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ফাজিল ও কামিল স্তরের এমপিওর বিষয়টি। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠানটি দাখিল ও আলিম স্তরের এমপিওভুক্ত হলেও ফাজিল ও কামিল স্তরের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো এমপিও অনুমোদন নেই। এরপরও ওই স্তরের শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকারি বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়েছে, যা এমপিও নীতিমালার পরিপন্থি।
ফাজিল স্তরে নিয়োগ পাওয়া ১৬ শিক্ষক-কর্মচারীর কাছ থেকে ১ কোটি ২৪ লাখ ৬৯ হাজার ৯৩৮ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে কামিল স্তরে নিয়োগ পাওয়া তিন প্রভাষকের কাছ থেকে আরও ১৯ লাখ ৩০ হাজার ১১০ টাকা ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অবৈধ নিয়োগে ২১ লাখ টাকার বেশি উত্তোলন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইকামাতেদ্বীন মডেল কামিল মাদ্রাসার ইসলামের ইতিহাস বিষয়ের প্রভাষক মো. ফারুক হোসেন ২০১৩ সালে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ওই পদে নিয়োগের জন্য এনটিআরসিএর নিবন্ধন সনদ থাকা বাধ্যতামূলক। তবে নিবন্ধন সনদ ছাড়াই তাকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০০৫ সালের নির্দেশনা এবং বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন বিধিমালা ২০০৬ অনুযায়ী নিবন্ধন সনদ ছাড়া কোনো ব্যক্তি শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্য নন। এর ফলে নিয়োগটি অবৈধ উল্লেখ করে ২০১৫ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উত্তোলিত ২১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৪১ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
দারুল ইহসানের সনদে এমপিও, ফেরত দিতে হবে ১০ লাখ টাকার বেশি
প্রতিষ্ঠানটির সহকারী গ্রন্থাগারিক রুনা লায়লার নিয়োগের সময় প্রয়োজনীয় লাইব্রেরি ডিপ্লোমা সনদ ছিল না। পরে তিনি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাইব্রেরি সনদ নেন। কিন্তু হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের রায়ে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এমপিও কিংবা উচ্চতর আর্থিক সুবিধার ক্ষেত্রে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সনদ গ্রহণযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে ২০২০ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি বেতন-ভাতা হিসেবে উত্তোলিত ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৪০০ টাকা ফেরতযোগ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অতিরিক্ত স্কেলে বেতন নিয়েছেন অধ্যক্ষ, ৮ লাখ টাকার অনিয়ম
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আলিম স্তরের অধ্যক্ষ হিসেবে ৪৩ হাজার টাকার স্কেলে বেতন পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। কিন্তু ফাজিল স্তরের এমপিও অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও তিনি ৫০ হাজার টাকা স্কেলে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেছেন। এর ফলে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৭ লাখ ৭৭ হাজার ৯৬৩ টাকা অতিরিক্ত উত্তোলন করেছেন। এ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে।
জনবল কাঠামোতেও একাধিক অনিয়ম
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ইকামাতেদ্বীন মডেল কামিল মাদ্রাসায় দাখিল কারী শিক্ষকের পদ ১৯৯৫ সালেই বিলুপ্ত হলেও একজন শিক্ষক উদ্বৃত্ত পদে বেতন পাচ্ছেন, যা পুরোনো নীতিমালার আওতায় বৈধ। দাখিল স্তরে তিনজন সহকারী মৌলভীর পরিবর্তে চারজন কর্মরত ছিলেন। পরে ২০১৮ সালের নীতিমালায় চারটি পদ অনুমোদিত হওয়ায় বিষয়টি নিয়মের মধ্যে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির ফাজিল ও কামিল স্তরে সরকারি অনুমোদন ছাড়াই শিক্ষক নিয়োগ ও এমপিও সুবিধা দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়; ২০২১ সালে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ডিও লেটারের ভিত্তিতে একাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে তদন্তে দেখা যায়, যাদের অনেকেই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলেও পদত্যাগপত্র বা চাকরি ছাড়ার কোনো বৈধ নথি জমা দেননি। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে চাকরি বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
অবসর ও মৃত্যুর পরও এমপিও ডিলিট হয়নি
অবসর গ্রহণ কিংবা মৃত্যুর পরও কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিও ডিলিট করা হয়নি। ফলে সরকারি এমপিও ডাটাবেজে তাদের তথ্য বহাল ছিল, যা আর্থিক ও প্রশাসনিক ঝুঁকি তৈরি করেছে। নিরীক্ষা কর্মকর্তারা এসব এমপিও যথাযথভাবে ডিলিট করে রেকর্ড হালনাগাদের সুপারিশ করেছেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের গাফিলতি এড়াতে নিয়মিত এমপিও ডাটাবেজ পর্যালোচনা ও হালনাগাদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (নিরীক্ষা ও আইন) শামিম সুলতানা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘প্রতিবেদনটি এ মুহূর্তে আমার হাতে নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে কোন অবস্থায় আছে সেটি জানাতে পারব।’
কার কাছে কত টাকা পাবে সরকার
ইসলামের ইতিহাসের প্রভাষক মো. ফারুক হোসেনের কাছে ২১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৪১ টাকা, সহকারী গ্রন্থাগারিক রুনা লায়লার কাছে ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৪০০, মো. আল আমিনের কাছে ৭ লাখ ৫১ হাজার ২৪২, মো. রাশেদুল ইসলামের কাছে ১০ লাখ ৬০ হাজার ৩০২, মো. কুদরাতুর রহমানের কাছে ১৮ লাখ ১ হাজার ১০২, মো. ফকরুল ইসলামের কাছে ১৮ লাখ ১ হাজার ১০২, মো. সরোয়ার হোসেনের কাছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৫০, মো. মহিউদ্দিনের কাছে ৭ লাখ ৫১ হাজার ২৪২, মো. নুরুন্নবীর কাছে ৬ লাখ ২৭ হাজার ৭০২, নাছরিনের কাছে ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৪৫৩, কাজী আল মাসুদের কাছে ৪ লাখ ৮১ হাজার ৯৮৩, মো. রেজাউল মিয়ার কাছে ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৯৯৯, সাম্মি আক্তারের কাছে ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৯৯৯, মো. মাসুম বিল্লাহর কাছে ৮ লাখ ৮ হাজার ৫৯০, মো. সাইফুল ইসলামের কাছে ৩ লাখ ২৮ হাজার ২১৫, মো. নাজমুল ইসলামের কাছে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৪০৭ এবং হামিম গাজীর কাছে ৮ লাখ ৮ হাজার ৫৯০, কামিল স্তরের আজিজুল হক, জাহিদ হোসেন এবং মো. মহিবুর রহমানের কাছে ৬ লাখ ৪৩ হাজার ৩৭০ টাকা করে পাবে সরকার।