প্রশাসন্ত মাহসাগরীয় অঞ্চল

শ্রেণীকক্ষের বাইরের শিক্ষায় সবচেয়ে বেশী খরচ বাংলাদেশে

২২ আগস্ট ২০১৮, ০৪:০৫ PM

দেশে শ্রেণীকক্ষের বাইরের শিক্ষা খরচ (প্রাইভেট টিউশন ফি) বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। শ্রেণীকক্ষের বাইরে ছাত্রছাত্রীদের শিখন-পঠন বৃদ্ধির বিপরীতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এ শিক্ষা গ্রহণের মূল্যও। দক্ষিণ এশিয়াসহ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে প্রাইভেট টিউশন ফি বাবদ সবচেয়ে বেশী খরচ হয় বাংলাদেশে। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ভারত, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, নিউজিল্যান্ড, ব্রুনাইয়ের চেয়েও এ দেশে প্রাইভেট টিউশন ফি বেশী। 

শিক্ষাবিদ-অভিভাবকরা বলছেন, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান প্রদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাটা শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু বর্তমানে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে পরীক্ষায় ভালো ফল। পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য সন্তানকে কেবল শ্রেণীকক্ষে পাঠিয়ে নিশ্চিত থাকতে পারছেন না মা-বাবা। ছুটছেন প্রাইভেট টিউশনের পেছনে। আলাদা কদর বাড়ছে কোচিং সেন্টার কিংবা শিক্ষকের বাসার। এমন প্রেক্ষাপটে দেশে প্রাইভেট টিউশনের দাম-খরচ বেড়ে চলছে দ্রুতলয়ে। 

শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার ধরন ও শিক্ষার্থীদের ওপর এর প্রভাব সম্পর্কে জানতে গত বছর এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের কয়েকটি দেশে (মোট ৬০টি দেশ) গবেষণা চালায় জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। এর অংশ হিসেবে এ অঞ্চলের নয়টি দেশের বিভিন্ন স্তরের পাঁচ হাজার শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেন গবেষকরা। পরীক্ষায় প্রস্তুতি নিতে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশকে শ্রেণীকক্ষের বাইরে প্রাইভেট টিউশন গ্রহণ করতে হয় বলে উঠে আসে তাদের গবেষণায়। এতে দেখা যায়, এশিয়ার প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে প্রাইভেট টিউশন গ্রহণের হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে।

গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে সম্প্রতি ‘দ্য কালচার অব টেস্টিং: সোসিওকালচারাল ইমপ্যাক্টস অন লার্নিং ইন এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে ইউনেস্কোর ব্যাংকক কার্যালয়। এতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থীই প্রাইভেট টিউশন গ্রহণ করে। যদিও প্রতিবেশী দেশ ভারতে এ হার ৫০ শতাংশ। প্রাইভেট টিউশন গ্রহণের হার সবচেয়ে কম ফিজিতে। দেশটিতে মাত্র ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের বাইরে প্রাইভেট টিউশন গ্রহণ করে। অন্য দেশগুলোর মধ্যে প্রাইভেট টিউশন গ্রহণের হার কাজাখস্তান ও ভিয়েতনামে ৭০ শতাংশ, রিপাবলিক অব কোরিয়ায় ৬৮ শতাংশ ও ফিলিপাইনে ৩৫ শতাংশ।

ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাইভেট টিউশনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে কোচিং সেন্টারের সংখ্যা দ্রুত গতিতে  বাড়ছে। এক্ষেত্রে শহর ও গ্রামে সবখানেই সমান প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সন্তানের ভালো ফল লাভে পিতামাতার উচ্চ প্রত্যাশাকেই এর অন্যতম কারণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

গবেষণাটির বাংলাদেশ অংশের কাজ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, অধ্যাপক মো. ফজলুর রহমান ও সহযোগী অধ্যাপক শাহ্ শামীম আহেমদ। 

গবেষক দলের সদস্য শাহ্ শামীম আহেমদ বলেন, আমরা ঢাকা, যশোর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও যশোরের শহর ও গ্রাম পর্যায়ের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাক্ষাত্কার নিয়েছি। সেখানে দেখা গেছে, সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ বিদ্যালয়ের বাইরে কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল। আবার কোথাও কোথাও বিদ্যালয়ের মধ্যেই প্রাইভেট টিউশনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। প্রাইভেট টিউশনের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জন।

ইউনেস্কোর ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাইভেট টিউশন গ্রহণ মূলত পরীক্ষাকেন্দ্রিক। পরীক্ষার জন্য ভালো প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে পিতা-মাতারা তাদের সন্তানদের কোচিংয়ে পাঠাচ্ছেন। এদিকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষা সংখ্যা অনেক বেশি বলে প্রতিবেদনটিতে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের জরিপে অংশ নেয়া ৬২ শতাংশ শিক্ষক ও ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই পরীক্ষা সংখ্যাকে অনেক বেশি বলে মত দিয়েছেন।

পরীক্ষার সংখ্যা বিষয়ে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ কমাতে পরীক্ষার সংখ্যা কমিয়ে আনছে। অথচ বাংলাদেশে এ সংখ্যা বাড়ছে। নানা সমালোচনা ও প্রতিবাদ সত্ত্বেও প্রাথমিক সমাপনী নেয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত পরীক্ষার চাপ শুধু শিক্ষার্থী নয়; তার পরিবারের ওপরও পড়ে। পাবলিক পরীক্ষা ছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্লাস টেস্টের নামে প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের চাপের মধ্যে রাখছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।

পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে কত সময় ব্যয় করা হয়- শিক্ষার্থীদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চান গবেষকরা। তাদের দেয়া উত্তরে দেখা যায়, বাংলাদেশে ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থী শ্রেণীকক্ষের ভেতরে সপ্তাহে ৭ ঘণ্টার বেশি সময় পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ব্যয় করে, যা এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। আর ৪৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষা প্রস্তুতির জন্য শ্রেণীকক্ষের বাইরে সপ্তাহে ৭ ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় করে। 

এদিকে সন্তানের ভালো ফল লাভে পিতা-মাতার যে উচ্চ প্রত্যাশা, তা পূরণ হলে উদযাপনের বিষয়টিও গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৮২ শতাংশ পিতা-মাতাই সন্তানের ভালো ফল অর্জন উদযাপন করেন। এক্ষেত্রে বাসায় সুস্বাদু খাবার রান্না, আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের মাঝে মিষ্টি বিতরণ ও সন্তানকে উপহার দেয়া হয়। বাংলাদেশে সন্তানের ভালো ফলকে পিতা-মাতার পাশাপাশি পরিবারের সম্মান ও মর্যাদার বিষয় হয়ে ওঠে। এজন্য পিতা-মাতা ছাড়াও ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব ও নিকটাত্মীয়রা ভালো ফল লাভে শিক্ষার্থীকে নানাভাবে চাপ দিয়ে থাকে। উদযাপনের পাশাপাশি প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল অর্জনে ব্যর্থ হলে শিক্ষার্থীদের ওপর নাখোশ হন অভিভাবকরা। বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনে ব্যর্থ হলে ৩০ শতাংশ পিতা-মাতাই সন্তানের প্রতি তাৎক্ষণিক রাগ-ক্ষোভ প্রকাশ করেন। 

পরীক্ষায় ভালো ফলে অতি উদযাপন ও খারাপ ফলে রাগ-ক্ষোভ কোনোটিই শিক্ষার্থীর জন্য মঙ্গলজনক নয় বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, অতি উদযাপনের মাধ্যমে পরবর্তী পরীক্ষায়ও ভালো ফল লাভের আরেকটি চাপ সৃষ্টি হয়। আর রাগ-ক্ষোভ প্রকাশের ফলে সন্তান হতাশ হয়। অনেক সময় তা মেনে না নিতে পেরে কেউ কেউ আত্মহত্যাও করে বসে। তাই পরীক্ষা কিংবা ফল নিয়ে এত বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। ছেলে-মেয়েরা ঠিকমতো শিখছে কিনা, আমাদের সে বিষয়ে নজর দিতে হবে।

এদিকে কোচিং সেন্টার নিষিদ্ধ হলেও এ ধরনের অবৈধ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে না। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে কোচিং সেন্টার বন্ধে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, উচ্চ আদালত কোচিং, গাইড, নোটবই বেআইনি ঘোষণা করেছেন। আমাদের হাতে আইন প্রয়োগ করার ক্ষমতা বা শক্তি নেই। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এর সঙ্গে সম্পৃক্ত আছে। আইনগতভাবে কোচিং গ্রহণযোগ্য নয়। কোচিং, গাইড, নোটবই বন্ধে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। 

ব্যানারে নেই জিয়াউর রহমানের ছবি, শেখ মুজিবকে ‘জাতির পিতা’ ও…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
৫০তম বিসিএসের ফল প্রকাশ নিয়ে যা জানাল পিএসসি
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
সিজারের পর যমজ সন্তানের একজন উধাও, ওয়ার্ডবয় গ্রেপ্তার
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
হৃদরোগ থেকে সুস্থ হওয়া রোগীদের জন্য বাসাভিত্তিক পুনর্বাসন ব…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
গোবিপ্রবির প্রশাসনিক পদে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের চান এমপি বাব…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের অনুষ্ঠানে সুনামগঞ্জ বিএনপির দুই…
  • ০৭ নভেম্বর ২০২৬
×
NORTH SOUTH
UNIVERSITY Center of Excellence
UNDERGRADUATE
ADMISSION
SPRING 2027
APPLY NOW
APPLICATION DEADLINE
NOVEMBER 22, 2026
ADMISSION TEST
NOVEMBER 28, 2026
WORLD RANKINGS 2027#801-1000
WORLD RANKINGS 2027#901-950