নবম জাতীয় পে স্কেল © টিডিসি সম্পাদিত
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। নতুন বেতন কাঠামোয় মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ভাতা যৌক্তিকীকরণ বা কাটছাঁটের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
বুধবার (২৪ জুন) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে পুনর্গঠিত সচিব কমিটির উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকরের নীতিগত সিদ্ধান্ত ধরে রেখেই বৈঠকে এর রূপরেখা, আর্থিক প্রভাব, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে জনপ্রশাসনে কর্মদক্ষতা, জবাবদিহি এবং সেবার মান উন্নয়নের বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।
বর্তমানে কার্যকর অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের নিয়মিত ও বিশেষ ভাতা পেয়ে থাকেন। এর মধ্যে রয়েছে বাড়িভাড়া ভাতা, যা অঞ্চলভেদে মূল বেতনের ৪৫ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত; চিকিৎসা ভাতা, যা বর্তমানে সব পদের জন্য মাসিক এক হাজার ৫০০ টাকা; নির্দিষ্ট গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য যাতায়াত ভাতা এবং প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি সুবিধা; দুই সন্তানের জন্য শিক্ষা সহায়ক ভাতা; বছরে দুটি উৎসব ভাতা এবং মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাংলা নববর্ষ ভাতা।
এ ছাড়া নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য টিফিন ও ধোলাই ভাতা এবং অঞ্চল ও ঝুঁকিভিত্তিক বিশেষ ও পাহাড়ি ভাতাও চালু রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, জনপ্রশাসন অর্থাৎ সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে-স্কেলের বিষয়টি মোটামুটি চূড়ান্ত হয়েছে। তবে কত শতাংশ বেতন বৃদ্ধি পাবে কিংবা কত ধাপে তা বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কমিটির সদস্যরাই জানাতে পারবেন।
এলপিআর (লিভ প্রিপারেটরি টু রিটায়ারমেন্ট) ভোগরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন পে-স্কেলের সুবিধা পাবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, এলপিআর ভোগরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নবম পে-স্কেলের আওতায় আসবেন।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ দুই কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাদের ভাষ্য, পে-স্কেল সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় এবং এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা সরকারই দেবে।
আরও পড়ুন: পে-স্কেল নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করল সচিব কমিটি
এদিকে অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সচিব কমিটির বৈঠকে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় রেখে নতুন পে-স্কেলের কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মূল বেতন বাড়ানোর ফলে সামগ্রিক বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ যাতে না পড়ে, সে জন্য বিভিন্ন ভাতা পুনর্মূল্যায়ন বা সীমিত করার প্রস্তাব সামনে এসেছে।
বিশেষ করে বাড়িভাড়া ভাতার শতাংশের হার কিছুটা কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে আনার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কারণ মূল বেতন বৃদ্ধি পেলে শতাংশভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী বাড়িভাড়া ভাতার পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। একই সঙ্গে চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াত ভাতার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ বা হার পুনর্নির্ধারণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
এ ছাড়া বর্তমান সময়ে কার্যকারিতা হারানো বা অপ্রাসঙ্গিক বিবেচিত কিছু ছোটখাটো ভাতা পুরোপুরি বিলুপ্ত করার প্রস্তাবও বৈঠকে উত্থাপিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
বৈঠকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, রাষ্ট্র সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে। তবে এর বিনিময়ে জনপ্রশাসনে স্বচ্ছতা, কর্মগতিশীলতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি নাগরিকদের জন্য সরকারি সেবা আরও সহজলভ্য করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশ, আইনি ভেটিং এবং বিভিন্ন কারিগরি জটিলতা নিরসনের বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নবম জাতীয় পে-স্কেল নিয়ে সচিব কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সভায় জনপ্রশাসনসংক্রান্ত পে-কমিশনের সুপারিশ নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য প্রস্তাবিত সুপারিশ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ দুটি খাত নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে এবং শিগগিরই পৃথক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে আরও একটি সভা অনুষ্ঠিত হতে পারে।
বেসিক বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা না গেলেও সরকারের হাতে একাধিক বিকল্প রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সচিব কমিটির প্রথম প্রস্তাবনায় প্রথম ধাপে মূল বেতন ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির কথা রয়েছে। বিকল্প হিসেবে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য ৪০ শতাংশ এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ৬০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে। এছাড়া নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন শতভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধির বিষয়েও আলোচনা চলছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বেসিক বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে একাধিক বিকল্প রয়েছে। শেষ পর্যন্ত কোন প্রস্তাব কার্যকর হবে, তা সরকারই নির্ধারণ করবে। এ বিষয়ে এখনই মন্তব্য করা সমীচীন নয়, কারণ সরকার যেকোনো বিকল্প গ্রহণ করতে পারে।
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই নবম পে-স্কেলের আওতায় বেতন-ভাতা প্রদানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দও রাখা হয়েছে।