বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরী © টিডিসি ছবি
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরীর চাকরিজীবন নিয়ে নতুন কিছু তথ্য সামনে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার চাকরিসংক্রান্ত নথি সম্পর্কে অবগত এক বিশ্বস্থ সূত্রের দাবি, চাকরিরত অবস্থায় ডোপ টেস্টে পজিটিভ ফল, একাধিক ঘাঁটিতে বদলি, ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিভাগীয় কার্যক্রম এবং মোবাইল ফোন জব্দের মতো ঘটনা ঘটেছিল। প্রায় দুই বছর তার পাসপোর্টও আটকে রাখা হয়েছিল বলে দাবি করেছে সূত্রটি।
তবে এসব তথ্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস। সৌরীর চাকরিসংক্রান্ত মূল নথিপত্রও পর্যালোচনার জন্য পাওয়া যায়নি।
২০২৫ সালের ৪ আগস্ট আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছিল, প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে সৌরী ও বিমানবাহিনীর আরেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফীকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। তাদের অবসরের সঙ্গে শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই বলেও জানিয়েছিল সংস্থাটি।
২৮ বছর বয়সী সৌরীর মরদেহ বুধবার বিকেলে উত্তরা খানের তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিখোঁজ হওয়ার এক দিন পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে তার মৃত্যুর কারণ এখনো জানা যায়নি। ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার উড়োজাহাজে দেশ ছাড়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পর আলোচনায় আসেন সৌরী। আইএসপিআরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী নিয়মিত প্রক্রিয়ায় তিনি চাকরি থেকে অবসরে যান। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রের দাবি, তার চাকরিজীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছিল, যা আইএসপিআরের দেওয়া বক্তব্যে পুরোপুরি উঠে আসেনি।
ভিডিওটি ধারণ করেননি সৌরী
শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার ওই ভিডিওটি ধারণ করেছিলেন বিমানবাহিনীর আরেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফী। সৌরী নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ভিডিওটি প্রকাশ করেন। পরে এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সৌরী নিজেও বলেছিলেন, তিনি ভিডিওটি ধারণ করেননি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সূত্রটির দাবি, ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সৌরীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। সূত্রের দাবি, ভিডিওটি কে ধারণ করেছিলেন, তার চেয়ে সেটি ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টিই বিভাগী তদন্তের মূখ্য বিষয় ছিল।
বিমানবাহিনী প্রকাশ্যে যা বলেছিল
২০২৫ সালের ৪ আগস্ট আইএসপিআর জানায়, বিমানবাহিনীর প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে সৌরী ও আশরাফীকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে—এমন একটি সংবাদকে বিভ্রান্তিকর বলে উল্লেখ করে সংস্থাটি।
আইএসপিআর আরও জানায়, তাদের অবসরের সঙ্গে ওই দাবি কিংবা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ থাকার অভিযোগের কোনো সম্পর্ক নেই।
বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগটি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র-এর (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল। একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে এ অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছিল। বিমানবাহিনী অভিযোগটি নাকচ করে দেয়। একটি পডকাস্টে সৌরীও একে অপপ্রচার বলে অভিহিত করেন। এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
যেসব তথ্য আগে প্রকাশ্যে আসেনি
সৌরীর চাকরিসংক্রান্ত নথি সম্পর্কে অবগত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্র দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে কয়েকটি ঘটনার কথা জানিয়েছে। সূত্রটির দাবি, এসব ঘটনা সৌরীর চাকরিজীবনে প্রভাব ফেলেছিল। তবে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস সূত্রের দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তাই নিচের তথ্যগুলো ওই সূত্রের বর্ণনার ভিত্তিতে তুলে ধরা হলো।
ডোপ টেস্টে পজিটিভ ফল: সূত্রটির দাবি, বিমানবাহিনীতে চাকরিরত অবস্থায় রুটিন ডোপ টেস্টে সৌরীর ফল পজিটিভ এসেছিল। সূত্রটি এ ফলকে গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদমর্যাদায় থাকা সৌরীকে অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক ঘাঁটিতে বদলি করা হয়েছিল। সূত্রটির মতে, ওই পদমর্যাদা ও অবস্থানে থাকা একজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এমন ঘন ঘন বদলি অস্বাভাবিক।
ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিভাগীয় কার্যক্রম: সূত্রটি জানিয়েছে, সামরিক বাহিনীর একটি সংরক্ষিত এলাকায় ধারণ করা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সৌরীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। সৌরী বরাবরই বলে এসেছেন, তিনি ভিডিওটি ধারণ করেননি। তবে সূত্রটির দাবি, তার বিরুদ্ধে কার্যক্রমটি ভিডিও ধারণের জন্য নয়, বরং সেটি ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে শুরু হয়েছিল।
মোবাইল ফোন জব্দ: তদন্তের সময় সামরিক কর্তৃপক্ষ সৌরীর মোবাইল ফোন জব্দ করেছিল বলে জানিয়েছে সূত্রটি। সূত্রের দাবি, ফোনটি পরীক্ষা করে তদন্তকারীরা সেখানে আপত্তিকর কিছু উপাদান পান। এর মধ্যে একাধিক ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া ধারণ করা ভিডিওও ছিল বলে সূত্রটি জানিয়েছে। সামরিক কর্তৃপক্ষ ফোনটি নিজেদের হেফাজতে রাখলেও সৌরীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম চলতে থাকে বলে সূত্রের ভাষ্য।
পাসপোর্ট আটকে রাখা ও বিমান চলাচল খাতে পেশাগত জীবন থমকে যাওয়া: সূত্রটির দাবি, প্রায় দুই বছর সৌরীর পাসপোর্ট আটকে রাখা হয়েছিল। পরে সেটি তাকে ফেরত দেওয়া হয়। তবে তার উড্ডয়ন-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার রেকর্ডে ফ্লাইং আওয়ার পুনরায় যুক্ত করা হয়নি। ফলে তিনি কোনো বাণিজ্যিক বিমান সংস্থায় পাইলট হিসেবে কাজ করতে কিংবা বিমান চলাচল খাতে অন্য কোনো পেশায় যুক্ত হতে পারেননি বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
সূত্রের এসব বক্তব্যের সঙ্গে আইএসপিআরের প্রকাশ্য বক্তব্যের অমিল রয়েছে। আইএসপিআর সৌরীর অবসরকে নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্ণনা করে জানিয়েছিল, এর সঙ্গে ভিডিওর কোনো সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে, সূত্রটির দাবি, ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার আগে ও পরে সৌরীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন শৃঙ্খলাজনিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস মূল নথিপত্র পর্যালোচনা করতে পারেনি। তাই চাকরিসংক্রান্ত এসব তথ্যকে সূত্রের দাবি হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
পরিবারের দাবি, সৌরীকে হত্যা করা হয়েছে
সৌরীর চাচাতো বোন মোশফেকা জাহান ফেসবুকে এক পোস্টে দাবি করেছেন, তাকে হত্যা করা হয়েছে। তার ভাষ্য, ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় সৌরী দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন। অবসরে যাওয়ার পরও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা তাকে নজরদারিতে রাখতেন বলে সৌরী তাকে জানিয়েছিলেন।
মোশফেকা আরও লিখেছেন, সৌরী শুধু ভিডিওটি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তবে তিনি তার এসব দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেননি।
সৌরীর বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দ্বীপ নামে তার এক কমবয়সী পরিচিত ব্যক্তি সৌরীকে বাইরে নিয়ে গিয়েছিলেন। পুলিশ দ্বীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে কি না, সে বিষয়ে এখনো কিছু জানায়নি।
পুলিশ এখন পর্যন্ত সৌরীর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যার সন্দেহের কথা জানায়নি। তবে হত্যার আশঙ্কাও নাকচ করেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্ত ও ময়নাতদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না।
যেভাবে উদ্ধার হয় মরদেহ
সৌরী উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে বসবাস করতেন। তুরাগ নদে ভেসে আসার পর তার মরদেহ রাজাবাড়ী ফেরিঘাটের কাছে একটি স্পিডবোটের সঙ্গে আটকে যায়। সেখানে কয়েক ঘণ্টা মরদেহটি আটকে ছিল।
বুধবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কেউ একজন জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করেন। পরে টঙ্গী নদী পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা রাজাবাড়ী ঘাট থেকে মরদেহটি উদ্ধার করেন। নদী পুলিশের নিয়ন্ত্রণকক্ষের কনস্টেবল মোহাম্মদ রাকিব এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। উদ্ধারের সময় সৌরীর পরনে ছিল সাদা পায়জামা ও কালো শার্ট। তার হাতে একটি হাতঘড়ি এবং পকেটে একটি আইফোন ছিল। ওই ফোনের মাধ্যমে পুলিশ তার পরিচয় শনাক্ত করে।
নদী পুলিশের সুপারিনটেনডেন্ট আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, মরদেহের বাইরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশের প্রাথমিক প্রতিবেদনে নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর সৌরীর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।