এম এ মতিন © টিডিসি ফটো
বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি’র নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন চলছে। প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছিল ২ এপ্রিল আর দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হয়েছে ৭ জুন। দুই অধিবেশনে সদস্যদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার মধ্যে নিজ নিজ এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি বিভিন্ন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। যে সকল এমপি নিজ এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় দাবি করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন– ব্রাম্মণবাড়িয়া এলাকার রুমিন ফারহানা, নাটোর-নওগাঁ এলাকার সংরক্ষিত নারী আসন থেকে মনোনীত সংসদ সদস্য সানজিদা ইয়াসমিন তুলি এবং গফরগাঁও আসনের আখতারুজ্জামান। নিজ নিজ এলাকায় এমপিদের বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবির প্রসঙ্গটি সংসদের ভেতরে এবং বাইরে বিভিন্ন মহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।
সম্প্রতি ঢাকার শেরাটন হোটেলে ইউনিসেফ আয়োজিত ‘ভ্যালিডেশন ওয়ার্কশপ অন দ্য বাংলাদেশ এডুকেশন সেক্টর অ্যানালাইসিস (ইএসএ)’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন তাঁর ভাষণে প্রসঙ্গটি টেনে এনে বলেন, ‘সংসদ সদস্যবৃন্দ নিজ নিজ এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি করছেন’। তিনি বলেন, ‘দক্ষতা উন্নয়ন আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, আমরা সেটিও দেখছি। অবশ্যই আমাদের উপদেষ্টা (মাহদী আমিন), সাবেক উপদেষ্টা (রাশেদা কে চৌধুরী) বলেছেন যে আমরা প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দিকে নজর দিচ্ছি। হ্যাঁ, সেটিও সত্য, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় দরকার, পাশাপাশি আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ও দরকার... এবং যে ঘাটতি আছে, আমরা এখন সেটার ম্যাপিং করছি এবং আমি সেটি দেখব। আর কোনো গ্রাম প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া থাকবে না। সেটিই আমরা এখন দেখছি’। উচ্চশিক্ষা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘সরকার শিক্ষাখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে হবে। আর এই লক্ষ্য অর্জনে মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষার চেয়ে বড় কোনো বিনিয়োগ হতে পারে না’ (দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস, ১৪ জুন, ২০২৬) ।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের আলোকে এই নিবন্ধে আমরা বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ অবস্থার পর্যালোচনা এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে আরও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজন আছে কিনা তা বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছি।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ সংসদে পাশকালে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মাত্র ৬টি। এগুলোর মধ্যে জেনারেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত ছিল ৪টি (ঢাবি, জাবি, চবি ও রাবি) এবং স্পেশালাইজড বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ২টি (বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়)। স্বাধীনতার সময় দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি আর এখন সাড়ে সতেরো কোটি। জনসংখ্যার অনুপাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্বিগুণের চেয়ে কিছু বেশি হয়ে ১৫-১৬ তে দাঁড়াতে পারতো। কিন্তু তা না হয়ে জ্যামিতিক হারে বেড়ে ১৭৭ এ উপনীত হয়েছে (সরকারি ৬১ ও বেসরকারি ১১৬টি) । অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর এই ভাষণ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে যে ১৭৭টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে (সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত আরও কয়েকটি চালুর অপেক্ষায়) সেগুলোর সমস্যা, সম্ভাবনা ও অর্জন পর্যালোচনা না করেই আবারও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষনা আদৌ যৌক্তিক কিনা। তা সরকারিই হোক কিংবা বেসরকারি
নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন উচ্চশিক্ষা বিস্তার এবং উন্নয়নের পরিচায়ক বৈ কি? পৃথিবীর স্বল্পোন্নত সমান সংখ্যক জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশসমূহের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়–১০.৫০ কোটি জনসংখ্যা অধ্যূষিত ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে মোট ১১০টি, ২.২০ কোটির দেশ শ্রীলংকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র ১৭টি, ১০ কোটির দেশ ভিয়েতনামে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ২৪২টি (সরকারি ১৭৬ ও বেসরকারি ৬৬টি), ২৪ কোটির দেশ পাকিস্তানে বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ২০০টি (সরকারি ১৬৫ টি ও বেসরকারি ৩৫টি)। এই পরিসংখ্যান হয়তো আরও বাড়ানো যায় কিন্ত এ থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন যে জনসংখ্যার উপরে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা আদতেই নির্ভর করে? হয়তো নয়। কিন্তু এ কথাও তো সত্য যে, জনসংখ্যা বেশি হলে ছাত্রসংখ্যাও বেশি হবে। কিন্তু ছাত্রসংখ্যা বেশি হলেই যে সবাই উচ্চশিক্ষা অর্জনে সক্ষম হবে কিংবা রাষ্ট্র তাদের শিক্ষাখরচ মেটানোর সক্ষমতা রাখবে তা তো নাও হতে পারে।
আবার জনসংখ্যা কম হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেশি হতে পারে। যেমন – ভিয়েতনাম। লোকসংখ্যা ১০ কোটি অথচ বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ২৪২টি। তাই বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেশি কি কম তা এক কথায় নিরূপণ করা কঠিন। বিভিন্ন আঙ্গিকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যার ইস্যুটি তৈরি হয়েছে শিক্ষামন্ত্রীর প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষনার পরিপ্রেক্ষিতে। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীই শুধু নন, ভূতপূর্ব সরকার প্রধানের (আওয়ামী লীগ) প্রতি জেলায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষনা ও উদ্যোগ থেকেও এই প্রসঙ্গটি সংশ্লিষ্ট মহলে নানান আঙ্গিকে আলোচিত হয়ে আসছে। বিগত সরকার সর্বশেষ যে ২০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যেগুলোর অধিকাংশই বিশেষায়িত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃষি, চিকিৎসা বা ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়) অনুমোদন দিয়েছিল সেগুলোর সর্বশেষ অবস্থা এই পদক্ষেপের অযোক্তিকতা ও অবিমৃষ্যতার ইঙ্গিত দেয় বৈ কি। আবার এখন প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি করা হচ্ছে!
নবপ্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা
ইতোপূর্বেকার রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের প্রতি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত বর্তমান প্রেক্ষাপটে যৌক্তিক নয় বলে অনেকে মনে করেন। একে রাজনীতিকগণ ‘উন্নয়নের মহাসড়কের এক জাজ্বল্যমান গল্প’ হিসেবে প্রচারে নিয়ে এসেছেন বটে কিন্তু এ সম্পর্কে দৈনিক প্রথম আলো ‘নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গৃহহীন, তবু ভূমিহীন’ ( ৮ মে ২০২৪) শীর্ষক প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ‘নতুন প্রতিষ্ঠিত ২০টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব জমি নেই। সেগুলো পরিচালিত হচ্ছে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের ভবনে কিংবা ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবন ভাড়া করে। ফলে চরমভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে এই নবাগত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম’। এ প্রসঙ্গে দৈনিক যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ভূতপূর্ব সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমগীর। তিনি জানান, ‘গত কয়েক দশকে যেসব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে, এগুলোরর প্রতিটির ক্ষেত্রেই সমস্যা বিদ্যমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে নয় বছর পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয়তা নিরূপণে সময় ব্যয় হয়েছে নাথান কমিশনের (১৯১২)। এখন আইন পাশের পরই উপাচার্য নিযুক্ত হন। এরপর কয়েকটি ভবন ভাড়া করেই ছাত্রছাত্রী ভর্তি চলে। ধীরে ধীরে শিক্ষক নিয়োগ ও অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হয়। উপাচার্যই হন প্রকল্প পরিচালক। ফলে উচ্চশিক্ষা বলতে যা হওয়ার কথা, তা হয় না। উল্টো কখনো উপাচার্যদের বিরুদ্ধে মাথা হেঁট করার মতো অভিযোগ আসছে। আইন পাশের পর প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিলে তিনি ক্যাম্পাস তৈরি করতেন। সেটা হস্তান্তরের পর উপাচার্য ও শিক্ষক নিয়োগ শেষে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলে আজকে এত প্রশ্ন উঠতো না’। বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, বর্তমান অবস্থায় দেশে নতুন বিশ্ববিদ্যাল স্থাপন করা হলে ওগুলোর ভাগ্যে এমন বিপর্যয়ই নেমে আসবে। তাতে উচ্চশিক্ষার উন্নতি না হয়ে একটা স্থবিরটা সৃষ্টি হবে।
শিক্ষক সমস্যা
ইউজিসি আরেক প্রতিবেদনে বলেছে, বর্তমানে ‘৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নেই। উপ-উপাচার্য নেই ৭২ আর কোষাধ্যক্ষ ৪৩ টিতে। অধ্যাপক এবং সহযোগী অধ্যাপক নেই এরূপ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগ রয়েছে। মফঃস্বল এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সিনিয়র শিক্ষকরা যেতে চান না’। শিক্ষক ও প্রশাসনে শীর্ষ কর্মকর্তা ছাড়াও নানা সংকটে জর্জরিত বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বছরের পর বছর এরা অস্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম চালাচ্ছে। আইন অনুযায়ী ১০৯ টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৫২ টির স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার কথা। কিন্তু প্রতিষ্ঠার ১২ বছর পরও অন্তত ২৫ টি বিশ্ববিদ্যালয় ভাড়া বাড়িতে আছে।
বাংলাদেশে এই মূহূর্তে ৪৫ লাখের মতো উচ্চশিক্ষার্থী আছে। যেহেতু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কম, তাই প্রয়োজনের তাগিদেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু যেভাবে এগুলো চলছে তাতে শিক্ষার মান অর্জিত হচ্ছে না। শুধু সনদধারী গ্র্যাজুয়েট সৃষ্টি হচ্ছে। এতে চাকরির বাজারে এরা উপেক্ষিত হচ্ছে। ফলে দেশের শ্রমবাজারে বিদেশিরা জায়গা করে নিচ্ছে।
বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের অবস্থান
পৃথিবীতে বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয়-র্যাঙ্কিং কাজে নিয়োজিত বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কথা আমরা জানি। এগুলোর মধ্যে দ্য টাইমস হায়ার এডুকেশন, কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস এবং একাডেমিক র্যাঙ্কিং অব ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিজ তথা সাংহাই র্যাঙ্কিং অন্যতম। এ সকল এজেন্সির র্যাঙ্কিং এর ফলাফল আমাদের দেশের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাতে প্রতিয়মান হয় যে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ (সরকারি, বেসরকারি) বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিং এ বেশ পিছিয়ে। এমন কি দক্ষিণ এশিয়ায়ও তাদের স্থান প্রথম দিকে নেই। যাইহোক, সম্প্রতি ঢাবি সহ বাংলাদেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক র্যাঙ্কিং এ এগিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
তবে এ কথা সত্য যে, ঔপনিবেশিকতার ঔরসে জন্ম হলেও প্রতি-ঔপনিবেশিক জাতীয়তাবাদী ভূমিকার কারণে বাংলাদেশকে তার বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাই এতদূর এনেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক-চেতনার আঁতুড়ঘরে জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু, ষাট-সত্তর দশকের সে সময়ের সঙ্গে আজ আর বাস্তবিক কারণেই তুলনা করা চলে না। কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্র-সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যাপীঠ তাত্ত্বিকভাবেই এখন আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো কাজ করছে না বাংলাদেশে। মানহীন ও পদোন্নতিনির্ভর গবেষণা, ছাত্রসংসদবিহীন ক্যাম্পাসে দলীয়করণ ও সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতি, শিক্ষা কার্যক্রমের যাচ্ছেতাই দশাসহ সরকারি চাকরিকেন্দ্রিক পড়ালেখার প্রতি শিক্ষার্থীদের নিদারুণ অনীহা পুরো ব্যবস্থাটাকেই ঝুঁকিতে ফেলেছে।
নীতিনির্ধারকেরা স্বীকার করতে না চাইলেও দেখা যাবে, সামগ্রিক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ব্যবস্থাটি মৃতপ্রায় ও অকার্যকর। আর একে আরও বেশি ত্বরান্বিত করেছে অপ্রয়োজনীয় ও অপরিকল্পিত বিশ্ববিদ্যালয় ও করণিক সৃষ্টির ‘রাজকীয়’ বিশ্ববিদ্যালয়বাজি। সুতরাং আজকের প্রেক্ষাপটে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আগে আমাদের চিন্তা করা উচিত এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জাতি কী পাবে? নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন নাকি পুরনোগুলোকে ঢেলে সাজিয়ে শক্তিশালীকরণ – কোনটি অধিক যৌক্তিক? একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা দিয়ে উপজেলা পর্যায়ে কয়েকটি পলিটেকনিক/টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট স্থাপন?
উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য কী?
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন ‘কুদরত-ই-খোদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে বলা হয়েছে -
[ভাবার্থ: ‘উচ্চশিক্ষার লক্ষ্য হচ্ছে – যোগ্য, জ্ঞানী ও দূরদর্শী এমন মানবসম্পদ তৈরি করা যারা বিভিন্ন উচ্চতর পদে দায়িত্ব গ্রহণে সক্ষম। যাদের শিক্ষার প্রতি থাকবে অনুরাগ, মুক্ত চিন্তাশক্তি, নিরপেক্ষ আচরণ এবং মানবিক মূল্যবোধ। তাঁরা গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞানের নতুন নতুন দ্বার উন্মোচন করবেন এবং এর মাধ্যমে জাতীয় ও অর্থনৈতিক সকল সমস্যা পর্যালোচনা করবেন এবং তার আলোকে সমাধান খুঁজে বের করবেন’।
আরও বলা হয়েছে – ‘উচ্চশিক্ষায় গবেষণার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। সেজন্যে শিক্ষা প্রদানের সাথে গবেষণা কর্মে যথাযথ মনোযোগ দিতে হবে। গবেষণা শিক্ষাকে পরিপূর্ণতা দান করে এবং জ্ঞানকে সমৃদ্ধতর করে। ফলত জ্ঞানবিজ্ঞানের নবতর উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানব কল্যাণ সাধন করে’ পৃ. ৮০-৮১। সুতরাং যখনই শিক্ষা উন্নয়ের প্রসঙ্গ আসে তখনই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বস্তুনিষ্ঠ ও মানগত দিক থেকে গবেষণা কতটা হচ্ছে সে প্রসঙ্গ এসে যায়। উচ্চশিক্ষা বিষয়ে বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এ বলা হয়েছে, “উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য হলো – জ্ঞান সৃজন ও উদ্ভাবন। সেই সাথে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি’।
সুতরাং উচ্চশিক্ষা কোন সার্টিফিকেটসর্বস্ব শিক্ষা নয়, সংখ্যা বৃদ্ধির শিক্ষা নয়। এটি হচ্ছে কোন বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতার অধিকারী হয়ে শিক্ষা গবেষণা, আর্থ-সামাজিক কর্মকান্ড, প্রশাসন, বিজ্ঞান, ইনোভেশন, মানবিক, ইত্যাদি ক্ষেত্রে উচ্চতর তত্ত্বাবধানমূলক দায়িত্ত্ব পালনে সক্ষম হওয়া। যাকে ব্যবস্থাপনার ভাষায় ‘দক্ষ মানবসম্পদ’ বলা হয়। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে যে সকল গ্রাজুয়েট বের হয় তাদের সম্বন্ধে (ঢালাওভাবে সবাই নয়) বাংলাদেশের শিল্পমালিক, উদ্যোক্তাসহ চাকরিদাতাদের সাধারণ মত হচ্ছে এরা তাদের প্রতিষ্ঠানে ঈপ্সিত দায়িত্বপালনে সক্ষম নয়। সুতরাং তাদেরকে বাইরে থেকে এ সকল পদে লোক নিয়োগ করতে হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন বেসরকারি ও বহুজাতিক দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩ লক্ষ বিদেশি কাজ করছেন এবং এই বিদেশিরা আনুতোষিক হিসেবে বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর বের হয়েছে। অন্যদিকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পাশ গ্র্যাজুয়েটগণ বেকার থাকছেন। উল্লেখ্য, বর্তমানে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার প্রায় ১৩.৫% (শ্রমশক্তি জরীপ ২০২৪)। যদিও সার্বিক বেকারত্বের হার ৫ এর নিচে%(বিবিএস ২০২৪)। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বি আই ডি এস’র এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা মানবিক ও সমাজবিজ্ঞান শাখার কয়েকটি বিষয়ের গ্র্যাজুয়েটদের প্রায় ৭০% বেকার থাকছেন। অতএব বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়ে আমাদের গ্রজুয়েটরা যদি দেশীয়/বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে সক্ষম না হন এবং তাদেরকে অর্জিত যোগ্যতার নিচ পদে কাজ করতে হয় কিংবা বেকার থাকতে হয় তাহলে এই উচ্চশিক্ষা গ্রহণের/প্রদানের যৌক্তিকতা কী? সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলে সরকার তার পেছনে অনেক টাকা খরচ করে আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হলে তার পিতা-মাতাকে যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয়। এ অবস্থায় আমাদের করণীয় কী?
উচ্চশিক্ষা কাদের জন্য?
উচ্চশিক্ষা কখনো সর্বজনীন হতে পারে না – হওয়া উচিত নয়। অতি মেধাবী, উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন, সৃষ্টিশীল, নেতৃত্ব গ্রহণ/প্রদানের যোগ্য ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যেই কেবলমাত্র উচ্চশিক্ষার দ্বার উন্মোচিত থাকা উচিত। উচ্চমাধ্যমিক পাশ হলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে এমন ধারণা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। বর্তমানে যে সকল ছাত্র-ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে – তারা কি সবাই সত্যিকার অর্থে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের যোগ্য। আন্তর্জাতিক মানদন্ডের কথা না হয় বাদই দিলাম– দেশীয় মানদণ্ডেও কি তারা যোগ্যতার ছাপ রাখতে পেরেছে/পারছে? ঢাবি কতৃপক্ষ তাদের ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করে জাতিকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমরা যাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাচ্ছি – তাদের অধিকাংশই উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রায় অযোগ্য। ইদানীং ঢাবি’র ভর্তি পরীক্ষায় পাশ নম্বর ৪০ পায় নাই শতকরা ৯০ জন। শতকরা মাত্র ১০ জন পাশ করে। সিট পূরণের জন্যে তাহলে ঢাবিকে ফেল করা ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করাতে হচ্ছে। বুয়েট –এর ভর্তি পরীক্ষার তথ্যাদি ঢাবি’র মত জনসমক্ষে প্রকাশ না করা হলেও অনুমান করা যায় যে সেখানকার অবস্থাও তথৈবচ হওয়া ছাড়া উপায় নাই। কেননা, যোগানদাতা প্রতিষ্ঠান (উচ্চমাধ্যমিক কলেজ/আলিম মাদ্রাসা) তো এক ও অভিন্ন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ঢাবিতে ফেল করা ছাত্র-ছাত্রীরাই অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় (যাদের আর্থিক অবস্থা ভাল) এবং সরকারি কলেজ ও পরে বেসরকারি কলেজে ভর্তি হয় এবং পাশ করে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি করে। এ অবস্থায় উচ্চশিক্ষাকে সীমিত, নির্বাচিত এবং লক্ষভিত্তিক করা, ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক করা এবং কারিগরি/ভোকেশনাল শিক্ষাকে উপযুক্ত সকলের দোড়গোড়ায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
উচ্চশিক্ষা না কারিগরি শিক্ষা
উচ্চশিক্ষার যে সংকটময় চিত্র উপরে তুলে ধরা হলো – এ প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় কী? আমরা কি উচ্চশিক্ষার সুযোগ ক্রমাগত বাড়াতেই থাকবো – নাকি তা সীমিত এবং অর্থবহ করে কারিগরি/ভোকাশনাল শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করে মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে দৃঢ়ভাবে কাজ শুরু করবো? এ কথা সত্য যে, জন্মগতভাবে সব মানুষ সমান নয় – নয় সমান মেধাবী। ছাত্র-ছাত্রীদের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। সব ছেলে-মেয়ে, সব ছাত্র-ছাত্রী সমান মেধাবী নয়। এর অর্থ এই নয় যে, যারা মেধাবী নয় – তারা অথর্ব – কোন কাজের যোগ্য নয়। স্বল্প মেধাবীদের কাজ এক রকম ও মেধাবীদের কাজ অন্যরকম। সবাই নিজ নিজ কর্মদক্ষতা ও মেধাগুণে স্ব স্ব ক্ষেত্রে অবদান রাখতে সক্ষম। সেভাবেই আদিকাল থেকে পৃথিবী চলে আসছে। রাষ্ট্র পরিচালক ও নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব হচ্ছে – মেধাবী-স্বল্পমেধাবী-মেধাহীন সকল ছেলেমেয়ে-ছাত্রছাত্রীকে শ্রেণীকরণ করে যার যার যোগ্যতা অনুযায়ী যথাস্থানে পদায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
উচ্চশিক্ষাকে সীমিত, নির্বাচিত এবং লক্ষভিত্তিক করা হলে বহুসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার কাঠামোর বাইরে পড়ে যাবে এবং তাদের ভবিষ্যত কী? এখানে আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং সংস্কার সম্পর্কে দুই একটি কথা বলা দরকার। প্রাথমিকের মেয়াদকাল ৫ বৎসর না হয়ে তা ৮ হওয়া উচিত। কুদরত-ই-খোদা শিক্ষাকমিশনে এ সুপারিশ করা হয়েছিল। ছেলেমেয়েরা ৫ বছর লেখাপড়া করে তেমন কিছুই শিখতে পারে না। তাছাড়া ১১-১২ বছর বয়সের ছেলেমেয়েরা কিইবা বৈষয়িক জ্ঞানের অধিকারী হয়? শারীরিক শক্তি সামর্থ্যও তেমন একটা জন্মায় না। পঞ্চম শ্রেণী পাশের পর মাধ্যমিক পর্যন্ত যেতে আরও ৫ বছর সময় লাগে। এই সময়ের মধ্যে আর্থ-সামাজিক কারণে ঝরে পড়ে বহু সংখ্যক ছাত্রছাত্রী। আর পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা নিয়ে কোথাও দাঁড়ানো সম্ভব হয় না। এ দিকে বাধ্যতামূলক ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা হলে এবং ঝরে পড়া বন্ধ করতে পারলে ৮ম শ্রেণী পাশ ছেলেমেয়েরা অনেক কিছু করতে পারে। শারীরিক দিক দিয়েও যথেষ্ট সামর্থবান হয়ে উঠে। এখন রাষ্ট্র ও সমাজের কর্তব্য হলো ৮ম শ্রেণী পাশ এই বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর মধ্যে থেকে যোগ্যতরদের মাধ্যমিকে ভর্তির সুযোগ করে দেয়া এবং বাকীদের চতুর্থ শ্রেণীর চাকরি, ড্রাইভিং, কারিগরি যাবতীয় ট্রেড কোর্সে ভর্তির সুযোগ করে দেয়া। এর উদ্দেশ্য হল এদেরকে কোন একটি কারিগরি বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলা। দক্ষ শ্রমিকের মূল্য অদক্ষ শ্রমিকের চেয়ে অনেক বেশি।
দক্ষ শ্রমিক বনাম অদক্ষ শ্রমিক
আমাদের ফরেন রিজার্ভের সিংহ ভাগ আসে বৈদেশিক রেমিট্যান্স থেকে। ২০২৩ ২৪ সালে গার্মেণ্ট রফতানী থেকে এসেছে প্রায় ৫৬.০০ বিলিয়ন ডলার এবং বিদেশে কর্মরত ব্যক্তিগণ (প্রায় ১.৭৬ কোটি) পাঠিয়েছেন প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার। এই ২২ বিলিয়নের মধ্যে বিভিন্ন দেশে কর্মরত শ্রমিকদের একটি অংশ রয়েছে। শ্রমিকরা আবার ২ ভাগে বিভক্ত। দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক। দক্ষ শ্রমিকদের বেতন অদক্ষ শ্রমিকদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। আমাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য ও উপাত্ত না থাকলেও এ কথা অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও অনুমান থেকে বলা যায় যে, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকাংশই অদক্ষ এবং সংগত কারণেই তাদের বেতন কম। ২.৫ কোটি জনসংখ্যার দেশ শ্রীলংকার মাত্র ৩০ লক্ষ মানুষ বিদেশে কাজ করেন। কিন্তু ২০২২-২৩ সালে বিদেশে কর্মরত শ্রীলংকানদের প্রেরিত রেমিট্যান্সের পরিমাণ প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলার যা আমাদের চেয়ে দ্বিগুণ এবং আমাদের গার্মেণ্টস থেকে প্রাপ্ত রেমিট্যান্স এর কাছাকাছি।
সুতরাং একথা বলা বোধ হয় অযৌক্তিক হবে না যে, বিদেশে লোক প্রেরণ ও ফরেন রেমিট্যান্স অর্জনে শ্রীলঙ্কার নিকট থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। কিভাবে মাত্র ৩০ লক্ষ লোক এক বছরে ৫৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠাতে পারে আর আমদের ১.৭৬ কোটি লোক পাঠায় মাত্র ২২.০০ বিলিয়ন? এ দিক থেকে ভারতীয়, পাকিস্তানী এমন কি নেপালি শ্রমিকরাও আমাদের চেয়ে এগিয়ে – প্রাপ্ত তথ্যাদি তাই সাক্ষ্য দেয়। তাই আমাদের দক্ষ শ্রমিক তৈরি, সরকারি সহযোগিতায় (প্রয়োজনে ঋণ দিয়ে) তাদের বিদেশ পাঠানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। দেশের জনশক্তিকে পুঁজিবাজারে কাজে লাগানোর জন্য তাই দরকার প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং যথাসম্ভব মানসম্পন্ন বিশেষায়িত কলেজিয়েট কারিগরি শিক্ষার প্রসার।
মাধ্যমিক শিক্ষা উন্নতকরণ
স্যাডলার কমিশনের রিপোর্টে দেখা যায়, কমিশন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সমস্যার পাশাপাশি তৎকালীন এতদঞ্চলের মাধ্যমিক শিক্ষার সমস্যর উপর আলোকপাত করেছে। কারণ – কমিটির বিদগ্ধ সদস্যগণ উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, মাধ্যমিক তথা এন্ট্রান্স পাশের পর যারা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তাদের শিক্ষার গুণগত মান অধোগামী। তাই তা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও স্যাডলার কমিশনের সেই সুপারিশ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আজও প্রযোজ্য বলে মনে করি। যখন দেখা যায়, ঢাবি’র ভর্তি পরীক্ষায় শতকরা ৯০ জন ফেল করে তখন দেশে বিদ্যমান মাধ্যমিক শিক্ষার প্রতিই বিজ্ঞজনেরা অঙ্গুলি নির্দেশ করেন। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিকে পাশ কাটিয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার নতুন শিক্ষাক্রম, পাঠদান ও মূল্যায়ন পদ্ধতি মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মানকে কতটা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে শিক্ষাবিদ বিশেষজ্ঞ দিয়ে তা মূল্যায়ন করা অতি জরুরি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা
নব্বইয়ের দশকের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থী দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পেয়ে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় পড়াশোনার জন্য চলে যেত। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। সুতরাং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভর্তিও গুচ্ছ পরীক্ষার মাধ্যমে সীমিত হওয়া প্রয়োজন। যারা সত্যিকার অর্থে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের যোগ্য কেবল তাদেরকেই ভর্তির অনুমোদন দেয়া উচিত।
উপসংহার
আর্থসামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং অর্থনৈতিক উন্নতির প্রয়োজনে একটি দক্ষ ও উদ্ভাবনী সমাজ গড়ে তোলার স্বার্থে প্রাইভেট ও পাবলিক- উভয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত ফলাফলভিত্তিক শিক্ষা (OBE) এবং ছাত্রকেন্দ্রিক শেখার (SCL) মডেলগুলো গ্রহণ করা। একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা উচিত বলে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত; কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশ ব্যয় হয়ে থাকে। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ব্যয় হয় জিডিপির ৩.৮ শতাংশ আর পাকিস্তানে ২.৬ শতাংশ। অর্থের হিসাবে ২০২৬-২০২৭ বছরের বাজেটে যে টাকা শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে, তা আমাদের প্রেক্ষাপটে অভূতপূর্ব হলেও এখন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। দেশের বিপুল সংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে হলে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তাই শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়টি সরকার পুনর্বিবেচনা করবে বলে আমরা আশাবাদী।
আমরা আশা করি, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ালে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের পথে বাংলাদেশ আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে। ফলে শিক্ষাখাতে ব্যয় জাতীয় আয়ের (জিডিপি) ২ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশে এবং জাতীয় বাজেটের বরাদ্দ ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশে উন্নীত করা যেতে পারে। আর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা (৮ম শ্রেণী পর্যন্ত) প্রবর্তন এবং সেখান থেকে ঝরে পড়া নিরোধের লক্ষে যাবতীয় সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধিসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যয় বাড়াতে হবে।
সবশেষে বলবো, উচ্চশিক্ষা একটি জাতির জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণে কিংবা সংকোচনে খুবই সাবধানতা অবলম্বন করা দরকার। সেজন্যে একটি স্থায়ী বিশেষজ্ঞ কমিশন করা যেতে পারে। তারা সকল প্রকার সংকীর্ণ ধারণার (আঞ্চলিকতা, ব্যক্তি ও গোষ্ঠি স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব, ইত্যাদি) ঊর্ধে উঠে বস্তুনিষ্ঠভাবে উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণ কিংবা সংকোচনের সুপারিশ করবেন।
লেখক: উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রক্টর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি)
ই-মেইল: amatin@aub.ac.bd