হাসিনার দেশে ফেরা: বাস্তবতা কী বলে?

০৬ জুন ২০২৬, ০৬:২০ PM , আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬, ০৫:৪৬ PM
তারেক সালমান

তারেক সালমান © টিডিসি সম্পাদিত

গেল কদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বিষয় ব্যাপক চর্চিত হচ্ছে। চায়ের কাপে ঝড় উঠছে ঠিক যেন ধোঁয়ার মতোই। বিষয়টি হচ্ছে-জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গণ আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারানো ও হাজার লক্ষ নেতাকর্মীদের বিপদের মুখে ফেলে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা। আওয়ামী লীগের পলাতক (যারা দলটির সাধারণ নেতাকর্মীদের কাছেই ইতোমধ্যে ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছেন) সেই সব নেতারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন উসকানিমূলক পোস্ট দিচ্ছেন যে, শিগ্‌গিরই তাদের নেত্রী সদলবলে দেশে প্রত্যাবর্তন করবেন। অতি উৎসাহী এই সব নেতাদের অনেকে তার (হাসিনা) দেশে ফেরার নির্দিষ্ট সময়সীমাও প্রচার করছেন। যে কারণে রাজনীতির মারপ্যাঁচ না বোঝা নিরীহ সাধারণ নেতাকর্মীরা উৎসাহী হয়ে রাজনীতির মাঠে নামছেন। আর দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এসব অতি সাধারণ নেতাকর্মী আবারও নতুন করে বিপদের মুখে পড়ছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছেন। নতুন করে হামলা-মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন। অথচ উসকানিদাতা জনধিক্কৃত নেতারা বিদেশে দেশের অর্থ পাচার করে বহাল তবিয়তে বিলাসী জীবন কাটাচ্ছেন।

বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদ আছে- ‘বাইরের লোক পতন ঘটাতে পারে না যদি না মানুষ নিজেই সেই পতনের ফাঁদে পা দেয়।’ শেখ হাসিনার বেলাতেও হয়েছে তাই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘নাটকবাজ’ হিসেবে জনমনে খ্যাত দেমাগি হাসিনা কথার ফুলঝুড়ি ফোটাতেন। তিনি প্রায় বক্তৃতায় আওড়াতেন- ‘রিক্ত আমি নিঃস্ব আমি দেবার কিছু নাই, আছে শুধু ভালোবাসা দিয়ে গেলাম তাই।’

আসলে নিজের দেমাগেই নিজে তো পালিয়েছেন, সঙ্গে আওয়ামী লীগকেও শেষ করে গেছেন হাসিনা। কথায় আছে, জেদ মানুষকে ধ্বংস করে। আর এই প্রবল জেদই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল শেখ হাসিনার জন্য। বিস্ময়কর বিষয় গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে ভারতের মাটিতে নির্বাসিত জীবনেও তার (হাসিনা) সেই একগুঁয়েমি বিন্দুমাত্র কমেনি বরং তার এই অহমিকার কারণেই আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগের মত বড় ও উপমহাদেশের একটি প্রাচীন রাজনৈতিক দল। ব্যক্তিস্বার্থ আর ক্ষমতার দম্ভের কাছে তিনি এতটাই অন্ধ যে, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দলটিকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করতেও দ্বিধা করছেন না। দেশে থাকা দলের কোটি কোটি তৃণমূল কর্মী আর সমর্থকদের নিরাপত্তার চেয়ে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখাই তার কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সেই নাটকীয় পলায়নের পর অনেকেরই ধারণা ছিল তিনি হয়ত কিছুটা হলেও আত্মোপলব্ধি করবেন। ভাববেন, কেন লাখ লাখ মানুষ তার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এসেছিল। কেন তার দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের সাজানো বাগান মুহূর্তেই তছনছ হয়ে গেল। কিন্তু না ‘ভারতের নিরাপদ আশ্রয়ে’ বসেও তিনি এখনও সেই পুরোনো মানসিকতা ধরে রেখেছেন। 

সম্প্রতি গণমাধ্যমের খবরে যা উঠে আসছে তা এককথায় আওয়ামী লীগের জন্য হতাশাজনক। ভারত সরকার তাকে দুটো বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিল; এক- তিনি সসম্মানে কাতার চলে যাবেন এবং সেখানে নির্বাসিত জীবন কাটাবেন। দুই- বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখতে একটি রিফাইনড বা শুদ্ধ আওয়ামী লীগ গঠনে সায় দেবেন। অর্থাৎ যে নেতৃত্ব জুলাই আগস্টের নৃশংসতা চালিয়েছে সেই নেতৃত্ব সরিয়ে ক্লিন ইমেজের কাউকে সামনে আনা। কিন্তু হাসিনা যেন কসম খেয়ে বসে আছেন। এখনও তার মনোভাব ‘আমি না থাকলে আমার দলও থাকবে না।’ হাসিনা মনে করেন কাতার যাওয়া মানেই রাজনীতি থেকে অবসর। আর রাজনীতি থেকে অবসর মানেই তার একচ্ছত্র নেতৃত্বের অবসান। অথচ তিনি এটা বুঝতে পারছেন না যে বাংলাদেশের মাটিতে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান এখন আকাশ কুসুম কল্পনামাত্র। জুলাইয়ের সেই রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে যে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে, তা এদেশের মানুষের হৃদয়ে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। সেই ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার বদলে তিনি নিজের নেতৃত্ব বাঁচাতে মরিয়া। বিচক্ষণ রাজনীতিবিদের কাজ হল সময়ের প্রয়োজনে পিছু হটা। কিন্তু হাসিনা উলটো পথে হাঁটছেন। 

ভারত যখন দেখল হাসিনা নিজে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন। তখন তারা চাইল আওয়ামী লীগেরই একজন সজন ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কাউকে দিয়ে দলটিকে নতুন করে গোছাতে। উদ্দেশ্য ছিল অন্তত নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগকে একটি গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে টিকিয়ে রাখা। কিন্তু খবর বলছে শেখ হাসিনা এই প্রস্তাবে শুধু নাই করেননি বরং প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তার এই ক্রোধের আগুনেই পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে দলটির ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ সুযোগটুকু। 

আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনে যাদের নাম শোনা যাচ্ছিল সে সব নেতারা নাটকীয়ভাবে দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিলেন। হাসিনার অনমনীয় মনোভাব প্রমাণ করে তিনি দল বা দেশের চেয়ে নিজের কর্তৃত্বকে কত বড় করে দেখেন। তিনি হয়ত ভাবেন তিনি ছাড়া আওয়ামী লীগ মানেই শূন্য। অথচ ইতিহাস বলে দলের চেয়ে ব্যক্তি বড় নয়। হাসিনা চেয়েছিলেন তার পরিবারের কাউকে উত্তরাধিকারী হিসেবে বসাতে। কিন্তু সেখানেও বাধে বিপত্তি। নিজের বোন রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববিকে নিয়ে দলের ভেতরে কিছুটা ইতিবাচক আলোচনা থাকলেও হাসিনা নিজেই তাতে সবুজ সংকেত দেননি। কেন? কারণ হয়ত একটাই, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অন্য কাউকে এমনকি নিজের পরিবারের কাউকে দেখাও তার জন্য অসহনীয়। 

দলের নেতাকর্মীরা আজ দিশেহারা। কেউ ভারতে, কেউ অন্যদেশে ফেরারি হয়ে ঘুরছেন। সাধারণ কর্মীরা যারা হামলা মামলার শিকার হচ্ছেন, তাদের কথা ভাবার সময় হাসিনার নেই। তিনি ব্যস্ত নিজের জেদ ধরে রাখতে। ভারতের মনোভাবও এখন বদলে যাচ্ছে। তারা বুঝতে পারছে হাসিনাকে বয়ে বেড়ানো এখন এক বিশাল বোঝা। সাম্প্রতিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলোতে তার প্রসঙ্গের অনুপস্থিতিই বলে দিচ্ছে বন্ধু রাষ্ট্রটিও এখন মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছে। 

একটি রাজনৈতিক দল যখন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে তখন নেতৃত্বের কাজ হয় আত্মশুদ্ধি করা। কিন্তু হাসিনার অভিধানে ক্ষমা বা ভুল স্বীকার শব্দগুলো নেই। তিনি এখনো মনে করছেন, প্রশাসনিক সমর্থন আর বিদেশি শক্তির জোরে হয়ত তিনি আবার ফিরে আসবেন। কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উলটো। মানুষের মন থেকে গণহত্যার স্মৃতি মুছে যায়নি। দলের কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব নেই। আর ভারতও এখন বিকল্প চিন্তা করছে। আওয়ামী লীগের অনেকেই মনে করছেন শেখ হাসিনা শুধু তাকেই ডোবাচ্ছেন না, বরং ১৯৪৯ সালে জন্ম নেওয়া এক ঐতিহাসিক দলকেও ধ্বংসের কিনারায় ঠেলে দিচ্ছেন। তার এই একগুঁয়েমি যদি চলতে থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ বলতে শুধু মুসলিম লীগের মতো হতাশা অবশিষ্ট থাকবে। নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়তে থাকা হতাশা আর ক্ষোভ একদিন হয়ত আগ্নেয়গিরির মত বিস্ফোরিত হবে। সেদিন হয়ত দেখা যাবে শেখ হাসিনা একা পড়ে আছেন, শুধু নিজের জেদ নিয়ে। পেছনে কোন অনুসারী নেই। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই বলছেন, শেখ হাসিনা যদি সত্যিই দলকে ভালোবাসতেন তবে তিনি নিজের নেতৃত্ব বিসর্জন দিয়ে হলেও দলটিকে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিতেন। কিন্তু তার বর্তমান অবস্থান প্রমাণ করে তিনি আসলে আওয়ামী লীগকে নয় বরং আওয়ামী লীগের ওপর নিজের কর্তৃত্বকেই বেশি ভালোবাসেন। এই আত্মঘাতী জেদই হবে তার রাজনীতির শেষ অধ্যায়।

লেখক : তারেক সালমান, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক বছরে বহুতল ভবন থেকে পড়ে ৩ শ্রমিকে…
  • ১৮ জুলাই ২০২৬
কুবি ছাত্রী সুমাইয়া হত্যার ১০ মাস পরও শুরু হয়নি মামলার বিচা…
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
শনিবার কক্সবাজারের ২ এলাকায় বিদ্যুৎ থাকবে না ৭ ঘণ্টা 
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
আমানউল্লাহ আমানের পথে হাঁটতে যাচ্ছেন সাদিক কায়েম!
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
আগামীকাল শুরু হচ্ছে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
এক বছরেও মেলেনি বিচার, সাজিদকে স্মরণ করে ক্ষোভ ইবি শিক্ষার্…
  • ১৭ জুলাই ২০২৬
×
  • Application Deadline
  • JULY 26, 2026
  • Admission Test
  • AUGUST 01, 2026
APPLY
NOW!
UNDERGRADUATE ADMISSION
FALL 2026!
NORTH SOUTH UNIVERSITY
Center of Excellence