কেয়া গ্রুপে ছাঁটাই ৭৩৯ জন
কেয়া গ্রুপের চার প্রতিষ্ঠানে ছাঁটাই ৭৩৯ জন, কান্নায় ভেঙে পড়েন শ্রমিকরা © সংগৃহীত
গাজীপুরের কোনাবাড়ীর জরুন এলাকায় কেয়া গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠান থেকে দ্বিতীয় দফায় ৭৩৯ জন শ্রমিক ও কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। সোমবার রাতে কারখানাগুলোর প্রধান ফটকে এ-সংক্রান্ত নোটিস টানানো হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরেও কেয়া গ্রুপের চারটি কারখানা থেকে ৬২৭ জন শ্রমিক ও কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছিল। দ্বিতীয় দফায় নতুন করে ৭৩৯ জনকে ছাঁটাইয়ের ঘটনায় কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে কাজে যোগ দিতে এসে কারখানার প্রধান ফটকে ছাঁটাইয়ের নোটিস দেখতে পান শ্রমিকরা। হঠাৎ চাকরি হারানোর খবর দেখে দীর্ঘদিন ধরে কারখানায় কর্মরত অনেক শ্রমিক কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ছাঁটাইয়ের আওতায় থাকা কেয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—নিট কম্পোজিট ডিভিশন, স্পিনিং ডিভিশন, কটন ডিভিশন ও কেয়া ইয়ার্ন মিলস লিমিটেড।
কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরিত নোটিসে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং জটিলতা, গ্যাস সংকটসহ বিভিন্ন কারণে গত ৬ জুন থেকে কারখানাগুলো লে-অফে রয়েছে। পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় লে-অফের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এ ছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবল থাকায় উৎপাদন ও প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন বিভাগ ও সেকশনের কিছু পদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
নোটিসে আরও বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে কারখানাগুলোতে পুনরায় কর্মী নিয়োগের প্রয়োজন হলে শ্রম আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী ছাঁটাই হওয়া দক্ষ শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বর্তমানে যেসব শ্রমিকের চাকরি বহাল রয়েছে, তারা লে-অফের আওতায় থাকবেন এবং আইন অনুযায়ী লে-অফের সুবিধা পাবেন।
ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের বিষয়ে নোটিসে বলা হয়েছে, শ্রম আইন অনুযায়ী ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের সব পাওনা এক মাসের মধ্যে পরিশোধ করা হবে।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, কেয়া গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠানে ৭৩৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কারখানাগুলোর প্রধান ফটকে শিল্প পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এদিকে মঙ্গলবার সকাল থেকেই চাকরিহারা শ্রমিকরা কারখানার ফটকে ভিড় করেন। হঠাৎ চাকরি হারানোর নোটিস দেখে তাদের অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েন।
প্রায় ১৯ বছর ধরে কারখানাটিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করছিলেন আবেদা বেগম। ছাঁটাইয়ের তালিকায় নিজের নাম দেখে কারখানার ফটকেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে আবেদা বেগম বলেন, “এত বছর চাকরি করে শেষপর্যন্ত খালি হাতে বিদায় নিতে হচ্ছে।”
সুইং সেকশনের অপারেটর ইয়াসমিন বেগমও ১৮ বছর ধরে ওই কারখানায় কাজ করেছেন। চাকরি হারিয়ে তিনি বলেন, “পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব—সেটাই বুঝতে পারছি না।”
একই সেকশনের অপারেটর স্বপ্না বেগমও পরিবার পরিচালনা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন চাকরি করার পর হঠাৎ করে কর্মহীন হয়ে পড়ায় পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
প্রায় ১০ বছর ধরে কারখানাটিতে কাজ করা নজরুল ইসলাম বলেন, “বর্তমান বাজারে নতুন চাকরি পাওয়া কঠিন। যদি চাকরি না পাই, তবে পরিবার বাঁচাতে অটোরিকশা চালানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।”
এদিকে এক নোটিসে ৭৩৯ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে ছাঁটাইয়ের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।
জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, “পাঁচবার লে-অফের পর এক নোটিসে এত বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং অবিলম্বে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও আইনানুগ ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পরিশোধের জোর দাবি জানাচ্ছি।”